কেন এমন হয়?
মানবিক, দায়িত্বশীল ও ভালো কাজের প্রতিফল কেন এমন হয়?
এসবের শেষ কোথায়?
এখনই সময় রুখে দেবার
“আমি সরকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। উপজেলাবাসীকে নিরাপদ রাখতে যা যা করা প্রয়োজন তা আমরা করছি। তবে, সবার প্রতি অনুরোধ, এ মহামারিতে প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হবেন না”- ওয়াহিদা খানম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলাবাসীকে করোনামুক্ত রাখতে রাতদিন কাজ করে যাচ্ছিলেন ইউএনও ওয়াহিদা খানম। করোনা মহামারীর সংকটে তিনি ফ্রন্টলাইনার যোদ্ধা হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন।
শুধুই কি করোনা মোকাবেলা? কী না করতেন এই তীব্র মানবিক ও অসম্ভব দায়িত্বশীল এ ব্যক্তিটি। মানুষ, পশু, প্রকৃতি, সামাজিক সুরক্ষা, সংস্কার ও উন্নয়ন সব কিছুর প্রতিই ছিল তার সমান নজর।
ওয়াহিদা খানম অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেনি। সোচ্চার ছিলেন মাদকের বিরুদ্ধে, কেবল মাদক সেবন বা বিক্রি বন্ধ নয় উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত যাতে মাদক চোরাচালানের নিরাপদ রুট না হয় সে জন্যও ছিলেন তৎপর। করোনা মহামারিতে ত্রাণ আত্মসাত প্রতিহত করে সঠিক বিতরণ ব্যবস্থার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন। জমি দখল, বাড়িঘর ভাঙচুর, চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে বালু তোলা, ইত্যাদি বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছেন ওয়াহিদা খানম।
করোনাকালে এলাকা পরিদর্শণ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ছাড়াও উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কাজে সমন্বয় (আইন-শৃঙ্খলা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, প্রকৌশল ও যোগাযোগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, বহুমুখী উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি, মানব সম্পদ উন্নয়ন, সমাজসেবা, পল্লী উন্নয়ন, যুব উন্নয়ন, সমবায়, পল্লী দারিদ্র বিমোচন, কৃষি ও খাদ্য, প্রাণী সম্পদ, মৎস্য, স্বাস্থ্য বিষয়ক, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরিবার পরিকল্পনা, ইত্যাদি), বেসরকারি সংস্থা, জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয়, সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষামূলক কাজ, সার্বিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, উন্নয়ন, এডিপি বাস্তবায়ন, এলজিএসপি, ইনোভেশন এরকম শত ধরণের কাজ করতে হয় উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহীকে। আমার জানা মতে সার্বিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সরাসরি জন ও বিভিন্ন সংস্থা সম্পৃক্ত উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বটা অনেক বেশি যা সম্ভবত অন্য কোন স্থানীয় সরকার কাঠামোতে নেই।
কিছু পরিসংখ্যান:
পানছড়িতে সরকারি দুই কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা (২০১৬), সিলেটে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে শিক্ষিকা (এপ্রিল, ২০২০), পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তাসহ অন্তত ১০ জন হামলার শিকার (মে, ২০২০), সাভারের আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর ওপর হামলা (জুন, ২০২০), সরকারি বনভূমি রক্ষা করতে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলার শিকার ৫ কর্মকর্তা (জুলাই, ২০২০), জাফরাবাদে সাংবাদিকের ওপর হামলা, চাঁদপুরে ভবন নির্মাণের কাজ পরিদর্শনে যেয়ে মারধরের শিকার প্রকৌশলী (জুলাই, ২০২০), অফিসে প্রবেশ করে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে এলজিইডি অফিসের হিসাবরক্ষককে মারধর (জুলাই, ২০২০), রাজশাহী গণপূর্ত কার্যালয়ে প্রকৌশলীকে নিজ কার্যালয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত (আগস্ট, ২০২০), আশুলিয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাজস্ব সার্কেল হাটবাজার পরিদর্শনে গেলে একজনকে মাস্ক না পরার কারণ জানতে চাওয়ায় ওই ব্যক্তি আরও কয়েকজনকে ডেকে এনে হামলা চালায় (মে, ২০২০), সিলেট নগরীর টিলাগড়ে ছাগল উন্নয়ন খামার থেকে ফ্রি ‘পাঠা’ না পাওয়ায় জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার ওপর হামলা (মে, ২০২০), ভালুকা গুদাম কর্মকর্তা আবুল বাশারকে মারধর (আগস্ট, ২০২০) (সূত্র: বিভিন্ন পত্রিকার খবর)।
ত্রাণ বিতরণ
সরকারি কর্মচারীদের মনিসিক ও শারিরীক লাঞ্ছনা এবং হামলার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় না। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারি কর্মকর্তারা এ ধরনের হামলার শিকার হয়েছেন। পদাধিকারী হিসেবে সরকার কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা ও আইন অনুযায়ী পালন করতে গিয়ে কেন এমন হবে? ভবিষ্যতে এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় তার জন্য এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
লিগ্যাল অডিট (জবাবদিহিতা ঘটনা ঘটার পরে নয় পূর্বেই)
সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত এবং গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি ক্ষেত্রের পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্যেককে তার প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতা করতে হতে পারে বা হবে বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি কাজ আইন অনুযায়ী ও স্বাধীনভাবে করার সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়। যার যা কাজ সে আইন অনুযায়ী তা করছে কিনা সেটা দেখার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে পরামর্শ, পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহিতা (লিগ্যাল অডিট) থাকা প্রয়োজন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মত, এ ধরনের হামলার কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে যায় এবং আতঙ্কিত হয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। আইন ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা ও কার্যকরভাবে কার্যকর করা উচিত। প্রচলিত আইনের মধ্যে থেকে দ্রুততম সময়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত হামলাকারী এবং ইন্ধন বা মদদদাতা বা নেপথ্যের কুশীলবদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা কমিয়ে ফেলা সম্ভব। রাজনৈতিক ও অর্থেনৈতিক প্রভাবের বিষয় কেন্দ্রীয়ভাবে সচেতনতা, প্রতিকার ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি কর্মকর্তারা যেহেতু জনগণের কাজই করেন, কমিউনিটি লেভেলে তাদের নিরাপত্তার জন্য জনগণকেও সচেতন থাকতে হবে।
সমব্যথি ও প্রতিবাদ করি
গভীর রাতে সরকারি বাসভবনে ভেন্টিলেটর ভেঙে নৈশপ্রহরীকে আটকে রেখে ঘুমন্ত অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা পিতা (৭২)সহ গুরুতর জখমের মত ঘটনা যেন আর না ঘটে। তাৎক্ষনিক ব্যবস্থায় এ মুহুর্তে উন্নত চিকিৎসার (সফল অস্ত্রেপচার) মাধ্যমে সহকর্মী ছোট বোনটি প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এ ঘটনার মাধ্যমে তার নিজের, ছোট সন্তানের, পিতা-মাতার ও অন্যান্য সকল স্তরের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সৃষ্ঠ ক্ষতটি দ্রুত ও কার্যকরভাবে উপশম হবে এমন প্রত্যাশা করি।
রাতে এলাকার খোঁজ নিচ্ছে ইউএনও ওয়াহিদা
মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে এ ছোট বোনটির দ্রুত আরোগ্য এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সফল জীবনের জন্য অনি:শেষ দোয়া রইলো।
বি: দ্র: একান্ত অনুভূতি, উপলব্ধি ও আত্মসমালোচনামূলক এ লেখাটি একাডেমিক দৃষ্টি থেকে বিবেচনা করার অনুরোধ রইলো।
জাকেরুল আবেদিন (আপেল), যুগ্ম-সচিব, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ; আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়-এর ফেসবুক থেকে