জেলার মো. দেলোয়ার জাহান © সংগৃহীত
কক্সবাজার জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার মো. দেলোয়ার জাহান বিরুদ্ধে ঘুষ নিয়ে প্রতারণার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এক হাজতি আসামিকে ডিটেনশন মামলা থেকে সাধারণ বন্দি করার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেওয়ার পরও কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কারাগারের ভেতরে দুর্নীতি ও অনিয়মের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্যও সামনে আসছে। এমন একটি কল রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত রয়েছে।
নানা অভিযোগে বারবার জর্জরিত কক্সবাজার কারাগারের দায়িত্বরত জেলাররা। অভিযোগে উঠে কারাগারের ভেতরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে। বন্দিদের প্রতি অসাধাচরণ, জিম্মি করে টাকা আত্মসাৎ ও নির্যাতনের মতো কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ অভিযোগ তুলেন হাজতি এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য এবার জেলার দেলোয়ারের বিরুদ্ধে উঠে আসছে। কয়েক মাস যেতে না যেতেই জেলার আবু মুসার বদলির পর এবং বছর না পেরোতেই জেলার দেলোয়ারের বিরুদ্ধে লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন অনেকেই।
এর মধ্যে বন্দিদের প্রতি অসাধাচরণ, নানা সুবিধে দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। আলোচিত রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেয়াসহ নানা অভিযোগ। এ ছাড়া চাহিদা পরিমাণ টাকা দিতে না পারলেই আইনের ফাঁকফোকর তৈরি করে বন্দিদের কারাগার কর্তৃক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখা, মাসের পর মাস সেলে বন্দি করে রাখা। এ ছাড়া খাবারের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রেখে অনাহারে তিলেতিলে বন্দিদের প্রতি জুলুম নির্যাতন নিপিড়নের মতো ঘটনা ঘটান দায়িত্বরত জেলা কারাগারের এই কর্মকর্তা।
জেলার দেলোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে জামিন হওয়া এক হাজতি আসামি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, ‘আমাকে ডিটেনশন আসামি দেখিয়ে সেলে বন্দি করে রাখা হয়। পরবর্তী তা বাতিল করে সাধারণ আসামিদের মতো করে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। কয়েক দিন পর ৪ লাখ টাকা দেওয়ার পরও কোনো সুরাহা পাওয়া যায়নি। এক মাসের বেশি সময় সেলে সব সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে বন্দি করে রাখা হয়, যা শারীরিক মানসিক এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’
অভিযোগ রয়েছে, কারারক্ষী থেকে শুরু করে সুবেদার, জমাদার সিনিয়র কারারক্ষীরাও জেলার দেলোয়ারের চত্রচ্ছায়ায় অবৈধভাবে বন্দিদের কাছ থেকে নানা ফন্দিতে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার। রোহিঙ্গা মাদক কারবারি থেকেও মাসিক টাকা তুলেন জেলার। এ ছাড়া নিজের পছন্দের হাজতিদের স্পেশাল রান্নার ব্যবস্থা করে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। কিছু কিছু মাফিয়া আসামিদের অদৃশ্যভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের সুবিধা দিয়েও টাকা নেন জেলার দেলোয়ার ও তার নিজস্ব কারারক্ষীরা।
কারা হাসপাতালে সাধারণ আসামিদের রোগী বানিয়ে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে প্রভেট হিসেবে ভাড়া দিয়েছেন এই কারাগারে দায়িত্বরত জেলার দেলোয়ার।
বন্দিদের প্রতি সপ্তাহে ওয়ার্ড ভেঙে দিয়ে নাড়াচাড়া করে দেয়, যার জন্য ভোগান্তিতে পড়তে হয় কয়েদি এবং হাজতি আসামিদের। এতে নির্দিষ্ট একটা মাসিক ফি দিয়ে নিজেদের সুবিধে মতো করেও রাখতে টাকা নেয় জেলার দেলোয়ারের সিন্ডিকেট। কৌশলে কারা অভ্যন্তরে গাঁজা, ইয়াবা ও নানা নিষিদ্ধ জিনিস পাচারেও সহযোগিতা করারও তথ্য রয়েছে। আলাদা গাঁজা ওয়ার্ড নামেও ওয়ার্ড রয়েছে এই কারাগারে।
দেশের অন্যান্য কারাগারের তুলনায় কক্সবাজার জেলা কারাগার অন্যতন একটি কারাগার, যেখানে রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে নিয়মিত তিন হাজারেরও অধিক বন্দিরা রয়েছেন। অধিকাংশ আসামি ইয়াবা মাফিয়া ও বড় বড় মাদক সম্রাট। রাজনৈতিক বড় বড় নেতা থেকে শুরু করে সবই এই কারাগারে হজম হয়েছেন, তবে কিছু কিছু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত আসামিদের গিন্জি করে রেখে অসুবিধে দেখিয়ে হয়রানিতে ফেলারও অভিযোগ রয়েছে। শুধু যারা চাহিদা মতো টাকা দিতে পারবে তাদের ওয়ার্ড পরিবর্তন করে কারাগারে স্ সুবিধা দিতে বাধ্য থাকেন। তবে পরিমাণ মতো টাকা দিতে না পারলে হয়রানি অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।
নুরুল আবছার জামিন হয়ে বের হলে দেখা হয় কারাফটকে। কথা হয় কারাভ্যন্তরের বিষয়ে। তিনি অকপটে বলেন, ‘কারাগারে টাকা দিলেই সব মেলে, এমনকি গাঁজা, ইয়াবাসহ নানা অবৈধ সুবিধা। ক্যান্টিনে অতিরিক্ত দাম হলেও এক্সট্রা রান্নার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। রান্না করা এক কেজি গরুর মাংসের মূল্য সাড়ে তিন হাজার, শুঁটকি আর এক কেজি আলুর দাম দুই হাজার টাকা, মোবাইলে গোপনে টাকা দিলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথাও বলা যায়, সবকিছুই এখন একাই নিয়ন্ত্রণ করেন জেলার দেলোয়ার। তবে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললেই অসুবিধে পড়তে হয়, ঢুকিয়ে দেওয়া হয় সেলে।’
এসব অভিযোগের বিষয়ে দেলোয়ারের কাছে জানতে চাইলে জেলার দেলোয়ার বলেন, ‘আপনি যার কথা বলছেন, তিনি একমাত্র ডিটেনশন আসামি ছিলেন কক্সবাজারে। এটি ওপরের অর্ডার ছিল। যার জন্য ওইভাবে করা হয়েছে।’
চার লাখ টাকা নেওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি এবং এসব টাকার বিষয়ে টেক্সট করে ওয়াটসআপে জানতে চাইলেও কোনো রিপ্লাই দেননি।