খুশির ঈদ, সম্প্রীতির ঈদ

৩১ মে ২০১৯, ০৪:৪১ PM

ঈদ মানে প্রীতি-সম্প্রতি, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের অটুট বন্ধন। ঈদের আগমনে মুমিন মুসলমানের অন্তরে বয়ে যায় আনন্দ-উল্লাস আর উচ্ছাসের বাঁধভাঙা জোয়ার। নিভিয়ে ফেলে হিংসা-বিদ্বেষ, দম্ভ-অহঙ্কার, কাম-লোভ ও রাগ-ক্রোধের আগুন। ভুলে যায় উঁচু-নিচু, আমির-ফকির আর ধনী-গরিবের ভেদাভেদ। সবাই হয়ে যায় ভাই ভাই। আপন। মেলায় হাতে হাত। করে কোলাকুলি। একজন আরেকজনকে টেনে নেয় বুকে। কণ্ঠে বাজে শান্তি, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব আর সাম্যের গান। সারামাস রোজা রেখে মুমিন মুসলমান আল্লাহর দরবারে পেশ করে ত্যাগের সর্বোচ্চ নজরানা। এতে তারা হয়ে ওঠে আরও উজ্জীবিত। তারা মহান আল্লাহর অপরসীম গুণ-কীর্তন ও স্তুতি-বন্দনা করে। কিন্তু বছর পেরিয়ে পবিত্র রমজান শেষে আমাদের দোরগোড়ায় মহিমান্বিত সেই ঈদ।

আজ আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, আমরা কি পেরেছি হিংসা-বিদ্বেষ আর রাগ ক্রোধ ঝেড়ে ফেলতে। পাপ-পঙ্কিলতা মুছে ফেলতে। পেরেছি কি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করতে। সবার মাঝে ঈদের অনাবিল আনন্দ-উল্লাস ছড়িয়ে দিতে। এখন বাঙালি মুসলমানের ঘরে-ঘরে জনে-জনে চলছে ঈদের আনন্দ বারতা। সৌহার্দের, ভ্রাতৃত্বের আর সম্প্রীতির এই আনন্দধারায় সবাইকে ঈদ মোবারক। মুসলমানের সবচেয়ে বড় এই আনন্দ-উৎসব সামাজিক সম্প্রীতি আর সাম্যচেতনায় ভাস্বর। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই ঈদের আনন্দে শামিল হবে- এটাই এই ঈদের মর্মবাণী। মাসজুড়ে রোজা পালনের মাধ্যমে সংযম আর ত্যাগের শিক্ষা অর্জন এই আনন্দের জন্য প্রস্তুত করেছে প্রতিটি মুসলমানকে। ঈদ পালনে সবাই মাটির টানে, নাড়ির টানে ছুটে গেছেন স্বজনদের কাছে। তাই চারদিকে এখন স্বজন-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে মিলনের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে মুসলমানরা ঈদের আনন্দে বিভোর হয়ে পড়ে। ভেদাভেদ ভুলে ধনী-গরিব সবাই এক কাতারে শামিল হয় ঈদের জামাতে। ঈদের আনন্দকে ভাগাভাগি করে নেয় সবাই। ঈদ মানে আনন্দ ঈদ মানে খুশি। ঈদে সচ্ছল ব্যক্তিদের দায়িত্ব বঞ্চিতদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের উৎসবকে সফল করে তোলা। রমজান মাস যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার বার্তা দিয়ে যাচ্ছে, তাকে অবলম্বন করে গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানো। সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে যে সৎগুণ অর্জিত হলো, তা ঈদের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।’

ঈদে প্রবাসীরা দেশে ফিরতে আকুল হয়, শহরবাসী গ্রামে ফেরায় রোমাঞ্চ পায়, একাকী মানুষ বন্ধুমহলের সঙ্গে মেলার জন্য ব্যাকুল হয়। অনেক ভোগান্তি শেষে নিজ প্রাঙ্গণে প্রিয়জনের আলিঙ্গনের সুখ উপভোগ করে। দেশের মানুষ তখন ‘দেশের’ মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়। এই সুযোগ থেকে কেউই যাতে বঞ্চিত না হয়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে রমজান মাসের শেষে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর উৎসব পালন করা হয়। তবে এই পঞ্জিকা অনুসারে কোনো অবস্থাতে রমজান মাস ৩০ দিনের বেশি দীর্ঘ হবে না। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে রমজানের সমাপ্তিতে শাওয়ালের প্রারম্ভ গণনা করা হয়। ঈদের আগের রাতটিকে ইসলামি পরিভাষায় লাইলাতুল জায়জায় (অর্থ : পুরস্কার রজনী) এবং চলতি ভাষায় ‘চাঁদ রাত’ বলা হয়। শাওয়াল মাসের চাঁদ অর্থাৎ সূর্যাস্তে একফালি নতুন চাঁদ দেখা গেলে পরদিন ঈদ হয়, এই কথা থেকে চাঁদ রাত কথাটির উদ্ভব। ঈদের চাঁদ স্বচক্ষে দেখে তবেই ঈদের ঘোষণা দেওয়া ইসলামি বিধান। আধুনিককালে অনেক দেশে গাণিতিক হিসাবে ঈদের দিন নির্ধারিত হলেও বাংলাদেশে ঈদের দিন নির্ধারিত হয় দেশের কোথাও না-কোথাও চাঁদ দর্শনের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে। দেশের কোনো স্থানে স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখা গেলে যথাযথ প্রমাণসাপেক্ষে ঈদের দিন ঠিক করা হয়। মুসলমানদের জন্য ঈদের পূর্বে পুরো রমজান মাস রোজা রাখা হলেও ঈদের দিনে রোজা রাখা নিষিদ্ধ বা হারাম।

ঈদের দিন ভোরে মুসলমানরা স্রষ্টার ইবাদত বা উপাসনা করে থাকে। ইসলামিক বিধান অনুসারে দুই রাকাত ঈদের নামাজ ছয় তাকবিরের সঙ্গে ময়দান বা বড় মসজিদে পড়া হয়। ফজরের নামাজের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের নামাজের সময় হয়। এই নামাজ আদায় করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। ইমাম কর্তৃক শুক্রবারে জুমার নামাজের পূর্বে খুৎবা (ইসলামিক বক্তব্য) প্রদানের বিধান থাকলেও ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে তা নামাজের পরে প্রদান করার নিয়ম ইসলামে রয়েছে। ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে খুৎবা প্রদান ইমামের জন্য সুন্নত; তা শ্রবণ করা নামাজীর জন্য ওয়াজিব। সাধারণত ঈদের নামাজের পরে মুসলমানরা সমবেতভাবে মোনাজাত করে থাকে এবং একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদের সম্ভাষণ বিনিময় করে থাকে। ঈদের বিশেষ শুভেচ্ছাসূচক সম্ভাষণটি হলো, ‘ঈদ মোবারক’। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া নামক স্থানে।

ফিৎরা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের রমজান মাসের রোজার ভুলত্রুটি দূর করার জন্য ঈদের দিন অভাবী বা দুস্থদের অর্থ প্রদান করা হয়, যেটিকে ফিৎরা বলা হয়ে থাকে। এটি প্রদান করা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিৎরা আদায় করার বিধান রয়েছে। তবে ভুলক্রমে নামাজ পড়া হয়ে গেলেও ফিৎরা আদায় করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে। ফিৎরার ন্যূনতম পরিমাণ ইসলামি বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট। সাধারণত ফিৎরা নির্দিষ্ট পরিমাণ আটা বা অন্য শস্যের (যেমন- যব, কিসমিস) মূল্যের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। সচরাচর আড়াই সের আটার স্থানীয় মূল্যের ভিত্তিতে ন্যূনতম ফিৎরার পরিমাণ নিরূপণ করা হয়। স্বীয় গোলামের ওপর মালিক কর্তৃক ফিৎরা আদায়যোগ্য হলেও বাসার চাকর-চাকরানি অর্থাৎ কাজের লোকের ওপর ফিৎরা আদায়যোগ্য নয়; বরং তাকে ফিৎরা দেওয়া যেতে পারে। ইসলামে নিয়ম অনুযায়ী, জাকাত পাওয়ার যোগ্যরাই ফিৎরা লাভের যোগ্য।

ঈদ ধনী-গরিব সব মানুষের মহামিলনের বার্তা বহন করে। এক কাতারে দাঁড়িয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের একসঙ্গে নামাজ পড়ার সুযোগ এনে দেয় ঈদ। ঈদের খুশির এক অন্যতম উপকরণ হচ্ছে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখার পর ঈদের নামাজ আদায়ের পর ঈদগাহ ময়দানে একে অপরের হাতে হাত, বুকে বুক রেখে আলিঙ্গন করলে মুসলমানরা সারামাসের রোজার কারণে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট ভুলে যায়। সমাজের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা ঈদের নামাজের বার্ষিক জামাতে সানন্দে উপস্থিত হয়। এ যেন একে অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কোলাকুলি ও কুশল বিনিময়ের এক অপূর্ব সুযোগ। তখন ছোট-বড়, ধনী-গরিব, আমির-ফকির, শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মধ্যে কোনো রকম ভেদাভেদ বা বৈষম্য থাকে না।

ঈদ মানেই পরম আনন্দ ও খুশির উৎসব। ‘ঈদ’ শব্দটি আরবি, শব্দ মূল ‘আউদ’, এর অর্থ এমন উৎসব যা ফিরে ফিরে আসে, পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়, রীতি হিসেবে গণ্য হয় প্রভৃতি। এর অন্য অর্থ খুশি-আনন্দ। উচ্ছল-উচ্ছাসে হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত। ঈদুল ফিতর প্রতিবছর চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী শাওয়াল মাসের ১ তারিখে নির্দিষ্ট রীতিতে এক অনন্য আনন্দ-বৈভব বিলাতে ফিরে আসে। এক মাস কঠোর সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নানা নিয়মকানুন পালনের পর মুসলিম বিশ্বে উদযাপিত হয় ঈদুল ফিতর; অন্য কথায় রোজার ঈদ। ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ ভেঙে দেওয়া। আরেক অর্থে বিজয়। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর যে উৎসব পালন করা হয়, তা-ই ঈদুল ফিতরের উৎসব। বিজয় শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

রমজান মাস রোজা রেখে আল্লাহ-ভীরু মানুষ তার ভেতরের সব ধরনের বদভ্যাস ও খেয়াল-খুশিকে দমন করার মাধ্যমে একরকমের বিজয় অর্জন করে। সব মিলিয়ে ঈদুল ফিতরকে বিজয় উৎসব বলা যেতে পারে।

ঈদুল ফিতরের প্রতিটি অনুশাসনে ইবাদতের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়, তাছাড়া এ দিন প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে সত্যনিষ্ঠ জীবনযাপনের তাগিদ এবং মানবতার বিজয় বার্তা। তবে প্রচলিত নিয়মে দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণীয় করার নাম ঈদ উৎসব। ‘ঈদুল ফিতর’ শব্দ দুটিও আরবি। যার অর্থ হচ্ছে উৎসব, আনন্দ, খুশি ও রোজা ভঙ্গকরণ প্রভৃতি। সুদীর্ঘ একটি মাস কঠোর সিয়াম সাধনা ও ইবাদত-বন্দেগির পর বিশ^ মুসলিম উম্মাহ রোজা ভঙ্গ করে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামতের শুকরিয়াস্বরূপ ধরণীতে যে আনন্দ-উৎসব পালন করেন, সেটিই ঈদুল ফিতর।

সংযমের মাস থেকে আমাদের সংযম শিক্ষা নেওয়া উচিত। ভ্রাতৃত্ব, সাম্য আর মানবতার বার্তা নিয়ে প্রতিবছর আসে ঈদুল ফিতর। ঈদ আসে আনন্দ আর খুশির ডালি নিয়ে; কিন্তু সে আনন্দ একার নয়, সবার। দুস্থ-অভাবী মানুষের প্রতি সহানুভ‚তিশীল হওয়ার প্রেরণা দেয় ঈদ। ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী-পরে-সকলের তরে সকলে আমরা, ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই চিরন্তন সাম্য-চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার শিক্ষা পাই ঈদ থেকে।

সমস্যা সমাধানে জনগনের পাশে দাঁড়াতে নেতা-কর্মীদের নির্দেশ বি…
  • ২৮ মার্চ ২০২৬
স্বাধীনতার ঘোষণা: রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান
  • ২৮ মার্চ ২০২৬
গুচ্ছের ফল নিয়ে সবশেষ যা জানালেন ভর্তি কমিটির সহসভাপতি
  • ২৮ মার্চ ২০২৬
বেরোবি ছাত্রীর সঙ্গে ‘অন্তরঙ্গ অবস্থায়’ আটক ঢাকা বিশ্ববিদ্…
  • ২৮ মার্চ ২০২৬
বগুড়ায় বাস-ট্রাকের ত্রিমুখী সংঘর্ষ, আহত ১৫
  • ২৮ মার্চ ২০২৬
ইরান থেকে ‘দ্রুতই’ বেরিয়ে আসবে যুক্তরাষ্ট্র: জেডি ভ্যান্স
  • ২৮ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence