প্রথম শহীদ মিনার © ফাইল ছবি
বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল বাঙালীরা, জানান দিয়েছিল জীবন দিয়ে হলেও মাতৃভাষা এবং মাতৃভূমির সম্মান রক্ষা করবে তারা। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির সেই রক্তাক্ত প্রহরের মাত্র ২দিন পর ২৩ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে শহীদদের স্মরণে দেশের ইতিহাসে প্রথম শহীদ মিনার তৈরি করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
তবে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ একেবারে সহজ ছিলো না। পাকিস্তানিদের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে এক ভোরের আলো ফোটার আগেই গড়ে ওঠে শহীদ মিনার। মাত্র ১ দিনের প্রস্তুতিতে তৈরি করা হয় শহীদ মিনার। প্রথম শহীদ মিনারের স্থাপত্য সহজ-সরল হলেও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ছিল হৃদয়গ্রাহী।
নিম্নাংশের বৃহদায়তন কিউবটা অবশ্যই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বলিষ্ঠ চরিত্রটাকেই প্রকাশ করে। প্রকাশ করে বিপদের সম্মুখীন থেকে ভাষা শহীদদের নির্ভীক সাহসিকতা। ঊর্ধ্বাংশে মিনারে উঁচু চূড়া সবাইকে এই বার্তা দেয় যে শত বাধাবিঘ্ন সত্ত্বেও অন্যায়-অবিচারের সামনে মাথা নোয়ানো যাবে না। কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুর-নৃশংস অত্যাচারের মুখেও অন্যায়-অসংগত আদেশ মেনে নেওয়া যাবে না। শির থাকবে উঁচু-অবিচল।
আরো পড়ুন: ইডেন কলেজে আবারও ছাত্রী নির্যাতন ছাত্রলীগ নেত্রীর
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের উপরে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে অনেকেই শহীদ হন। তাদের স্মরণেই নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার। শহীদ মিনারটি উচ্চতায় ছিল ১০ ফুট এবং চওড়া ছিল ৬ ফুট। নকশা করেছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র বদরুল আলম, সঙ্গে ছিলেন সাঈদ হায়দার। শহীদ মিনার তৈরির কাজ তদারকি করেন জিএস শরফুদ্দিন। দুজন রাজমিস্ত্রির সাহায্যে মিনারটি নির্মাণ করেন তারা।
২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেন ভাষা শহীদ শফিউরের বাবা মৌলভী মাহাবুবুর রহমান। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারটি উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। কিন্তু ওই দিনই পুলিশ শহীদ মিনারটি ভেঙে দেয়। পরে ঢাকা কলেজের সামনে আবার একটি শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছিল কিন্তু সেটিও গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি জান্তা বাহিনী। বর্তমানে আমরা যে শহীদ মিনার দেখছি, তার ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করা হয়েছিল ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এই শহীদ মিনারের স্থপতি হামিদুর রহমান।
শহীদ মিনার ধ্বংসের প্রতিবাদে কবিতা লেখেন কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ। কবিতাটির নাম ছিল ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। ঐতিহাসিক ওই কবিতাটির কয়েকটি চরণ- ‘স্মৃতির মিনার ভেঙ্গেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো/চারকোটি পরিবার/খাড়া রয়েছি তো। যে-ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য/পারেনি ভাঙ্গতে।’
আরো পড়ুন: জয়ের জন্য বিএনপি শিবিরের দিকে তাকিয়ে আওয়ামীপন্থীরা
প্রথম শহীদ মিনার ভাঙার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। পুলিশের এ নির্মমতা তাঁর হৃদয়কে বেদনাহত করে, তাঁকে বিদ্রোহী করে তোলে। পুলিশের হাতে প্রথম শহীদ মিনার ধ্বংসের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ইকবাল হলে বসে সঙ্গে সঙ্গেই ওই কবিতাটি রচনা করেন তিনি।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালের ৩রা এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে ৯ মে অধিবেশনে একুশ দফার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শহীদ মিনার তৈরি ও একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস এবং সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু ওই বছর ৩০ মে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় তা আইনসিদ্ধ করা সম্ভব হয়নি।
১৯৫৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পূর্ববঙ্গ সরকারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং ভাষা শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম। সে সময়ই একুশে ফেব্রুয়ারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
আরো পড়ুন: অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে সর্বস্ব হারালো ঢাবি শিক্ষার্থী
পরে ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার আমলে শিল্পী হামিদুর রহমানের পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণের একাংশে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু হয়। শিল্পীর পরিকল্পনা ছিল অনেকখানি জায়গা নিয়ে বেশ বড় আয়তনের শহীদ মিনার কমপ্লেক্স নির্মাণ করা। নকশায় মিনারের মূল অংশে ছিল মঞ্চের ওপর দাঁড়ানো মা ও তাঁর শহীদ সন্তানের প্রতীক হিসেবে অর্ধবৃত্তাকার স্তম্ভের পরিকল্পনা। স্তম্ভের গায়ে হলুদ ও গাঢ় নীল কাচের অসংখ্য চোখের প্রতীক খোদাই করে বসানোর কথা ছিল, যেগুলি থেকে প্রতিফলিত সূর্যের আলো মিনার-চত্বরে বর্ণালির এফেক্ট তৈরি করবে।
এছাড়া মিনার-স্থাপত্যের সামনে বাংলা বর্ণমালায় গাঁথা একটি পূর্ণাঙ্গ রেলিং তৈরি ও মিনার চত্বরে দুই বিপরীত শক্তির প্রতীক হিসেবে রক্তমাখা পায়ের ও কালো রঙের পায়ের ছাপ আঁকাও মূল পরিকল্পনায় ছিল। পাশে তৈরি হওয়ার কথা ছিল জাদুঘর, পাঠাগার ও সংগ্রাম-বিষয়ক দীর্ঘ দেয়ালচিত্র (ম্যুরাল)। আশপাশের জায়গা নিয়ে চোখের আকৃতিবিশিষ্ট ঝর্ণা নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল, যার প্রান্তে থাকবে ঢেউ খেলানো উঁচু বেদী।
উক্ত পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী ১৯৫৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে কাজ শুরু হয়। হামিদুর রহমানের সহকর্মী হিসেবে ছিলেন ভাস্কর নভেরা আহমদ। এ সময়ে মিনারের ভিত, মঞ্চ ও কয়েকটি স্তম্ভ তৈরির কাজ শেষ হয়। সেই সঙ্গে রেলিং, পায়ের ছাপ, ম্যুরালের কিছু কাজ এবং নভেরা আহমদের তিনটি ভাস্কর্যের কাজ সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে সামরিক আইন জারি হওয়ার পর শহীদ মিনার তৈরির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও ১৯৫৯ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত চার বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে মানুষ এই অসম্পূর্ণ শহীদ মিনারেই ফুল দিয়েছে, সভা করেছে ও শপথ নিয়েছে।
আরো পড়ুন: র্যাগিংয়ের দায়ে শাবিপ্রবির ৫ শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিক বহিষ্কার
১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী মূল নকশা বহুলাংশে পরিবর্তন করে এবং পরিকল্পিত স্থাপত্যের বিস্তর অঙ্গহানি ঘটিয়ে একটি নকশা দাঁড় করানো হয়। এ নকশা অনুযায়ী দ্রুত শহীদ মিনারের কাজ শেষ করা হয় এবং ১৯৬৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এ মিনার উদ্বোধন করেন শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম। এই সংক্ষিপ্ত এবং খণ্ডিত শহীদ মিনারই একুশের চেতনার প্রতীকরূপে জনমানসে পরিচিত হয়ে ওঠে।
৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকবাহিনী মিনারটি আবার ভেঙ্গে দেয় এবং সেখানে ‘মসজিদ’ কথাটি লিখে রাখে। কিন্তু এদেশের মানুষ তা গ্রহণ করেনি। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে শহীদ মিনার নতুন করে তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবারও মূল নকশা পরিহার করে ১৯৬৩ সালের সংক্ষিপ্ত নকশার ভিত্তিতেই দ্রুত কাজ শেষ করা হয়। ১৯৭৬ সালে নতুন নকশা অনুমোদিত হলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
পরে ১৯৮৩ সালে মিনার চত্বরের কিছুটা বিস্তার ঘটিয়ে শহীদ মিনারটিকে বর্তমান অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। বর্তমানের শহীদ মিনার তার স্থাপত্য-ভাস্কর্যগত অসম্পূর্ণতা নিয়েই সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
আরো পড়ুন: ইবির ফুলপরীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ছাত্রলীগের অভিযুক্তরা
স্বাধীনতার পর থেকেই প্রবাসীদের উদ্যোগে বিদেশের মাটিতে শহীদ মিনার নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলে শহীদ মিনার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার প্রতীকস্বরূপ হয়ে ওঠে। বহির্বিশ্বে ১৯৯৭ সালে প্রথম যুক্তরাজ্যের এডিনবার্গের ওল্ডহ্যামে এবং ১৯৯৯ সালে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে শহীদ মিনার নির্মিত হয়।
তাছাড়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০০৫ সালে জাপানের টোকিওতে শহীদ মিনার নির্মিত হয়। জাপান বাংলাদেশ সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার সূত্র ধরে বাংলাদেশ সরকার এই শহীদ মিনারটি নির্মাণ করে।