বিশ্বের নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব

১৭ এপ্রিল ২০২০, ০৮:৫৪ PM

© ইন্টারনেট

করোনাভাইরাস মহামারী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় মানব বিপর্যয় ঘটাবে। এটি জাতীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা জীবনের জন্য, পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য, সকল জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হবে। মহামারীটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কটই নয়, ভূ-কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় ও ঘটিয়েছে।

আপাতত কল্পনা করা শক্ত যে, এই বিপর্যয় ব্যক্তি, সম্প্রদায় এবং দেশসমুহকে কীভাবে প্রভাবিত করবে এবং তাতে জাতীয় এবং বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে। যাইহোক, যাই ঘটুক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট: সামাজিক জীবন, অর্থনৈতিক বিকাশ, নিরাপত্তা কাঠামো এবং পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত জনগণ, সমাজ এবং রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি, অভ্যাস, অগ্রাধিকার এবং প্রতিচ্ছবিতে আগামী বছরগুলোতে আমূল পরিবর্তন ঘটবে।

স্বাস্থ্য সমস্যা ছাড়াও মহামারী থেকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত খাতটি হবে সুরক্ষা খাত। আমরা সবাই জানি যে, কোনও দেশের মূল উদ্দেশ্য হল যে কোনও হুমকির বিরুদ্ধে তার জনগণের সুরক্ষা। তবে এটি স্পষ্ট যে, আমরা যখন মানুষের বা রাষ্ট্রের সুরক্ষার কথা বলি তখন আমরা সাধারণত বাহ্যিক হুমকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা বোঝাই, কারণ এটি ‘শক্তি তত্ত্বের’ ভারসাম্যের মূলকথা।

আজ, কেবলমাত্র চিরাচরিত (ট্র্যাডিশনাল) সামরিক হুমকিই নয়, বরং পরিবেশ, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তিতে নানান অপ্রথাগত (নন-ট্র্যাডিশনাল) বিকাশের দ্বারাও মানুষের সুরক্ষা হুমকির সম্মুখীন। মানুষ চিরাচরিত সামরিক হুমকির বিরুদ্ধে তাদের দেশগুলোর রক্ষার জন্য বিশাল সামরিক ব্যয়ের বিরোধিতা করা শুরু করবে, কারণ মহামারী মানুষকে সুরক্ষার ধরণ সম্পর্কে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।

যেহেতু বর্তমান বিপর্যয় সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ বা শত্রু সেনাবাহিনীর দ্বারা সৃষ্ট নয় বরং একটি অদৃশ্য স্বাস্থ্য হুমকির ফলস্বরূপ, মানুষ চিরাচরিত সামরিক হুমকির বিষয়ে প্রশ্ন তুলবে। অর্থাৎ, জনগণ এ ব্যাপারে সচেতন যে সমস্ত দেশ একটি অদৃশ্য এবং অদম্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।

উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকানরা সম্ভবত সুরক্ষার জন্য ব্যয় করা প্রায় ৭৫০ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করতে শুরু করবে। কারণ এটি স্পষ্ট যে, বিশাল প্রাণহানির ঘটনা সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ বা কোন সেনাবাহিনীর দ্বারা নয়, বরং করোনাভাইরাস মহামারী দ্বারা সৃষ্ট। এটি কোনও চিরাচরিত নিরাপত্তা হুমকি নয়, বরং একটি স্বাস্থ্য সমস্যা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নাটকীয়ভাবে আঘাত করেছে অন্যান্য দেশের ন্যায়।

শক্তিশালী আমেরিকান নিরাপত্তা বাহিনী এই মারাত্মক মহামারীটি আটকাতে পারেনি এবং আমেরিকান প্রাণহানি রোধ করতে পারেনি। অন্ততপক্ষে আমেরিকান সরকারের আরও কিছু কর্তাব্যক্তি, যেমন স্বাস্থ্য অধিদফতর, এই মারাত্মক অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শেষ পর্যন্ত, সরকারকে চিরাচরিত নিরাপত্তা ইস্যুগুলির জন্য কম ব্যয় করতে হবে এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মতো অপ্রচলিত নিরাপত্তা বিষয়গুলির জন্য আরও বেশি ব্যয় করতে হবে, যা অন্যান্য জাতির মতো আমেরিকানদের নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রভাবিত খাত হল অর্থনীতি। করোনভাইরাস মহামারীটি সমস্ত দেশের অর্থনীতিতে আঘাত হানবে এবং মানুষের ব্যয়ের ধরণ এবং অভ্যাসকে গভীরভাবে বিন্যাস করবে। মহামারীটির অর্থনৈতিক প্রভাব হবে অসামান্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এটি বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করবে যেটি কেবল মহামন্দার প্রভাবের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

মহামারীর শ্বাসরুদ্ধকর গতি এবং সর্বনাশা প্রভাব নাটকীয়ভাবে সমস্ত বাজার, ব্যবসা, সংস্থা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে নাড়া দেবে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ এর শেষদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক বাজেটের ঘাটতি এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং জাতীয় ঋণ এর পরিমান প্রায় ২২ ট্রিলিয়ন ডলার। মহামারী দ্বারা সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের পরে এই পরিসংখ্যানগুলো আরও খারাপ হবে।

তদুপরি, ছোট ব্যবসা বন্ধ এবং করের রাজস্ব হ্রাসের ফলে বিশ্বজুড়ে বেকারত্বের হার আকাশচুম্বী হবে। অন্য কথায়, একটি গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বের সমস্ত দেশের জন্য অপেক্ষা করছে। কিছু সরকার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলেও অন্যরা বড় ধরণের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হবে।

এই মহামারীর পরে রাষ্ট্রসমূহ স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা শুরু করবে এবং আরেকটি সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সরকারগুলো ভেন্টিলেটর, নিবিড় পর্যবেক্ষণ (intensive care unit), ভ্যাকসিন এবং ডায়াগনস্টিক টেস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন ও মজুদকে অগ্রাধিকার দেবে।

সরকারগুলো সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্কগুলির সম্প্রসারণ এবং নাগরিকদের জন্য সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের বিষয়েও আলোচনা করবে। অন্য কথায়, সরকার অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক উভয় উন্নয়নের দিকে আরও ব্যাপক সুরক্ষা পদ্ধতির বিকাশ করবে। দেশগুলোকে তাদের জাতীয় ও বৈশ্বিক সুরক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে পরবর্তী মহামারীর জন্য প্রস্তুতির জন্য প্রচুর পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।

পরিশেষে, সঙ্কট সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো নিরাময়ে সময় লাগবে। মহামারী এবং পরিবর্তিত রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ফলে যে নতুন বাস্তবতা উদ্ভূত হবে তাতে সরকারগুলোর বিশেষত উন্নত দেশগুলোর প্রতিরক্ষা বাজেট সঙ্কোচনের প্রয়োজন হবে। বর্তমান সঙ্কট বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক নেতাদেরকে বর্তমান বাজার-ভিত্তিক অর্থনীতিতে রাষ্ট্র এবং বাজারের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।

দেশগুলোকে স্বল্প মেয়াদে স্থানীয় এবং জাতীয় রাজনীতিতে মনোনিবেশ করতে হবে; তবে মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদে তাদেরকে একটি নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতির পথ বের করতে হবে। মহামারীটি বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে, যা শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষিতে উত্থিত হয়েছিল এবং এটি অবশ্যই বিশ্বব্যবস্থাকে পুনরায় সাজিয়ে তুলবে।

মূল লেখকঃ মুহিত্তিন আতামান, কলাম লেখক, দি ডেইলি সাবাহ

অনুবাদকঃ এহতেশামুল হক, আঙ্কারা ইলদিরিম বেয়াযিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অধ্যয়নরত

হাসিনা আপার কর্মী-সমর্থকদের জানাতে চাই, আমরা আছি আপনাদের পা…
  • ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
প্রতিষ্ঠার দুই যুগেও মাভাবিপ্রবিতে নেই নিজস্ব মন্দির, খোলা …
  • ২৪ জানুয়ারি ২০২৬
কিছু মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গণভোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে…
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
‘ফ্যাসিস্ট আমলে জাতীয়তাবাদী আদর্শের যারা নিয়োগ পেয়েছে, তারা…
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
নাহিদের আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে পোস্টার সাঁটানোর অভিযোগ বিএ…
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
ঢাবি উপাচার্যের জগন্নাথ হল পূজামণ্ডপ পরিদর্শন
  • ২৩ জানুয়ারি ২০২৬