চাকরির নামে প্রতারণা এবং প্রতিকার

০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৫:৫৩ PM

© ফাইল ফটো

দেশে যে হারে শিক্ষিত বাড়ছে, সে হারে কর্মক্ষেত্র বাড়ছে না। ফলে অনেকেই বেকার থেকে যাচ্ছে। চাকরি যেন ‘সোনার হরিণ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে পড়ালেখা শেষ হলেও জুটছে না কাঙ্ক্ষিত চাকরি। মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী বেকার বসে থাকায় দিশাহারা। ফলে যখন চাকরির সন্ধান পাচ্ছেন তখনই বুঝে-না বুঝে আবেদন করছেন।

শিক্ষিত বেকাররা নিজ জেলায় ব্যর্থ হয়ে চাকরির সন্ধানে ভিড় জমাচ্ছেন দেশের প্রাণকেন্দ্রে। এ সুযোগে এক শ্রেণীর প্রতারক চাকরি নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসে আছে। এই ফাঁদে পড়ে অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন। এতে অনেকে চাকরি পাওয়ার আসায় উপরি দিতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। কিন্তু মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সোনার হরিণটি।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তার পাশে, দেয়ালে, বাসে লোভনীয় চাকরির বিজ্ঞপ্তির পোস্টার সেঁটে অথবা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতারকচক্র আকৃষ্ট করছে বেকার তরুণ-তরুণীদের। প্রতারকচক্রের প্রধান টার্গেট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম চাকরির কথা বলে তাদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এরপর নানা কৌশলে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংক, বীমা, এমএলএম কোম্পানি, বিপণন কোম্পানি, মার্কেটিং কোম্পানির নামে বেশি প্রতারণা করা হচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বাসে, জনসমাগম হয় এমন স্থানে চাকরির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। এতে পার্ট টাইম এবং ফুল টাইম চাকরির নামে ছাত্রছাত্রীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়। নিয়োগের নামে তাদের কাছ থেকে জামানত বা অন্যান্য খাতের অর্থ নিয়ে সড়ে পড়ে। এসব বিষয়কে বেকারদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ভুয়া এমএলএম কোম্পানির নামে প্রতারণার ঘটনায় গত বছরের (২০১৮ইং) এপ্রিলে ২৩ জনকে গ্রেফতার করেছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব-১১। তখন প্রতারকদের অবৈধ মালামালসহ উদ্ধার করা হয়েছিল ৩১ জন ভিকটিমকেও। একটি ভুয়া এমএলএম কোম্পানি মাসিক ১৬ হাজার ও এর বেশি টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনটি ভিন্ন প্যাকেজে চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে যথাক্রমে ২৭ হাজার ১০০, ৩৭ হাজার ১০০ ও ৪৭ হাজার ১০০ টাকা গ্রহণ করে। এই নিয়ে অনেক নিউজ করা হয়েছে গণমাধ্যমগুলোতে।

পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষণের নামে সপ্তাহখানেক কালক্ষেপণ করে প্রত্যেককে নতুন দুজন সদস্য সংগ্রহের শর্ত দেয়। নতুন সদস্য সংগ্রহ করে দিলে সংগৃহীত টাকার সামান্য কমিশন প্রদান করে। নতুন সদস্য দিতে না পারলে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে খালি স্ট্যাম্প ও আপসনামায় জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে তাড়িয়ে দেয়। প্রতিবাদ করলে ভাড়াটিয়া লোকজন দিয়ে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতনও করে।

অন্যদিকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিরীহ লোকদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে এক সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। এ চক্রের একটি অংশ রাজধানীতে উইনেক্স ট্রেড কর্পোরেশন লিমিটেড ও এলএস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং স্ট্যান্ডার্ড বায়ো নিউট্রিশনসহ অসংখ্য নামে অফিস খুলে চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা করছে। বিভিন্ন জেলার শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের চাকরি দেয়ার প্রলোভন দিয়ে ও চাকরির জামানত বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা রেখে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয় প্রতারকরা।

তাদের ফাঁদে ফেলার পর নিজেদের আত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে কীভাবে এই কোম্পানিতে আনতে হবে সেই সম্পর্কে ট্রেনিং দেয়া হতো। পরবর্তী সময় অসহায় যুবকরা কোম্পানির উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ওই সকল প্রতিষ্ঠানে চাকরি করবে না মর্মে টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করে। পরে কোম্পানিগুলো তাদেরকে ঘোরাতে থাকে। আর যারা নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে না পারত তাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিদায় করে দেয়া হয়।

এদিকে প্রতারকরা চোখের সামনেই এসব চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছে। কখনও প্রতিষ্ঠিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়। আবার কখনও গণপরিবহনে এ সব বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। সেখানে লেখা আছে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পার্ট টাইম জব। দিনে তিন ঘণ্টা। আর সপ্তাহে চারদিন। বেতন সাত থেকে দশ হাজার টাকা। এমন বিজ্ঞাপন দেখে অনেক শিক্ষার্থী পা বাড়িয়ে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েছেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. জসিম উদ্দিন এর সাথে আলাপকালে বলেন, ২০১৪ সালে ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্ট হওয়ার পর গ্রাম থেকে রাজধানীতে আসি অনার্স পড়ার জন্য। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন একটা সচ্ছল ছিল না। তাই ঢাকায় থাকতে ও পড়তে নিজে খরচের ব্যবস্থা করতে একটি পার্ট টাইম চাকরি খুঁজতে লাগলাম। একদিন বাসে করে এক বন্ধুর বাসায় যাচ্ছিলাম।

সেখানে দেখি সপ্তাহে তিন দিন ও দিনে চার ঘণ্টা কাজে ১২ হাজার টাকা দেবে বলে একটি বিজ্ঞাপন দেয়। সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জামানত দেয়ার কথাও বলা হয়। তিনি বলেন, অফিসটি ছিল মালিবাগে। বিজ্ঞাপনে থাকা ঠিকানায় যোগাযোগ করলে চাকরিটা কনফার্ম করে।

কিন্তু কি কাজ করতে হবে জানতে চাইলে তা বলে না। তবে আমি চিন্তা করলাম মাসে ১২ হাজার টাকা পাব, থাকা-খাওয়া ও পড়ালেখা ভালো চালিয়ে নিতে পারব বলে পাঁচ হাজার টাকা ম্যানেজ করে তাদের দেই। এমন আমার মতো আরও ৩০-৪০ জন টাকা দেন। আমাদের ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসের এক তারিখে অফিসে জয়েন্ট করার কথা বলে। আমরা সেভাবে যাই। কিন্তু অফিসে গিয়ে দেখি তালা ঝুলানো। আর বাইরেও কেউ নেই। ততক্ষণে সবাই বুঝতে পারলাম আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। এইভাবেই প্রতারিত হচ্ছে হাজার হাজার যুবক আর এই প্রতারণার শিকার হয়ে নিজের ক্যারিয়ার ও ধ্বংস করছে অনেকে।

এমন সমস্যার সম্মুখীন হলে আইনের আশ্রয় নেবেন যেভাবে: চাকরির নামে কোনো প্রতারণার শিকার হলে প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। আপনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলা করতে পারেন। ক্ষেত্রবিশেষে দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মোকদ্দমা করতে পারেন। বর্তমান আইন অনুযায়ী প্রতারণার মামলা করতে হয় দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদকে। তবে আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে আপনাকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণাদি থাকা লাগবে। এ জন্য কোনো প্রমাণাদি যেমন কোনো লিখিত নিয়োগপত্র, চুক্তি এসব চাকরিতে যোগদানের আগেই নিজের হেফাজতে রাখুন। বিদেশে চাকরির নাম করে টাকা দেওয়ার সময় টাকা লেনদেন-সংক্রান্ত লিখিত চুক্তি করে নিন। চুক্তি করা থাকলে আপনার আইনি প্রতিকার পাওয়াটা সহজ হয়ে যাবে। সর্বোপরি সবসময় এই সকল দালাল চক্রের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করুন। ভালো থাকুন। এবং একই সাথে নিজের ক্যারিয়ারের প্রতি মনযোগ দিন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

সাফজয়ী বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল দলকে প্রধানমন্ত্রী তারেক …
  • ০৪ এপ্রিল ২০২৬
রাজনীতির ইচ্ছা থাকলে শিক্ষকতা থেকে ইস্তফা দিয়ে আসুন: ডেপুটি…
  • ০৪ এপ্রিল ২০২৬
টাইব্রেকারে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ
  • ০৪ এপ্রিল ২০২৬
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নয়, মেয়েকে নিয়ে ইংরেজি সায়েন্স ফিকশন সিনে…
  • ০৪ এপ্রিল ২০২৬
শিক্ষকের রোষানলে এক বিষয়ে ৫ বার ফেইল, অভিমানে জীবনটাই দিয়ে …
  • ০৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম পশ্চিমা জাহাজ হিসেবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করল ফরাসি …
  • ০৩ এপ্রিল ২০২৬