সোহেল রানা © টিডিসি সম্পাদিত
একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, দেশের একজন পরিচিত রাজনৈতিক নেতা জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে এমন একটি বক্তব্য দিচ্ছেন, যা মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষ ভিডিওটি শেয়ার করছেন, কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, কেউ প্রতিবাদ করছেন, আবার কেউ সেই বক্তব্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক অবস্থানও পরিবর্তন করছেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর জানা গেল, ভিডিওটি আসল নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে পুরো দৃশ্যটি। অথচ এর মধ্যে ততক্ষণে তৈরি হয়ে গেছে বিভ্রান্তি, অবিশ্বাস ও উত্তেজনা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভিডিওটি যারা শেয়ার করেছিলেন, তাদের অনেকেই জানতেন না যে তাঁরা একটি মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এটি এখন আর কল্পকাহিনি নয়। এআইয়ের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এমন ঘটনা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘটছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আগে একটি মিথ্যা খবর ছড়াতে সংবাদপত্রের মতো দেখতে ভুয়া কাগজ, সম্পাদিত ছবি কিংবা মুখে মুখে প্রচারের প্রয়োজন হতো। এখন কয়েকটি ক্লিকেই তৈরি করা যাচ্ছে বিশ্বাসযোগ্য দেখতে ভুয়া ছবি, ভিডিও, কণ্ঠস্বর ও সংবাদ। ফলে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় আমাদের সামনে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি বিষয়—মিডিয়া ও ইনফরমেশন লিটারেসি বা গণমাধ্যম ও তথ্যসাক্ষরতা।
মিডিয়া লিটারেসি আসলে কী?
সহজ ভাষায়, মিডিয়া লিটারেসি হলো গণমাধ্যমে প্রচারিত কোনো তথ্য, সংবাদ, ছবি, ভিডিও কিংবা বক্তব্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে তার সত্যতা, উদ্দেশ্য, উৎস ও প্রেক্ষাপট যাচাই করার সক্ষমতা। অন্যদিকে ইনফরমেশন লিটারেসি মানুষকে শেখায় কীভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজতে হয়, নির্ভরযোগ্য উৎস নির্বাচন করতে হয় এবং তথ্যের যথাযথ ব্যবহার করতে হয়।
ইউনেস্কোর ঘোষণা অনুযায়ী, মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি কেবল সংবাদ পড়ার দক্ষতা নয়; বরং তথ্য খুঁজে বের করা, বিশ্লেষণ করা, সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করা, ব্যবহার করা এবং দায়িত্বশীলভাবে তথ্য তৈরি ও প্রচার করার সম্মিলিত সক্ষমতা।
অর্থাৎ, ফেসবুকে কোনো সংবাদ দেখলেই শেয়ার না করা, কোনো ছবি দেখে উত্তেজিত হওয়ার আগে তার উৎস খোঁজা, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট শনাক্ত করার চেষ্টা করা এবং কোনো তথ্যের পেছনে কার স্বার্থ কাজ করছে, তা বোঝার ক্ষমতাই মিডিয়া লিটারেসির অংশ।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি। মিস ইনফরমেশন হলো এমন অসত্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা কেউ সত্য মনে করে অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে ডিসইনফরমেশন হলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি বা প্রচার করা মিথ্যা তথ্য, যার লক্ষ্য মানুষকে বিভ্রান্ত করা, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভাবমূর্তি নষ্ট করা কিংবা জনমতকে প্রভাবিত করা। এআইয়ের কারণে এই দুই ধরনের তথ্যের বিস্তার আরও সহজ হয়েছে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক?
বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে সংবাদ জানার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু তথ্যের সহজলভ্যতা বাড়লেও সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের সক্ষমতা সে তুলনায় বাড়েনি। ইউনেস্কোর ২০২৪–২৫ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অনলাইনে পাওয়া তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে সক্ষম বাংলাদেশের তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হার ৫ শতাংশেরও কম।
একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে ২০২০ সালে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের সহযোগিতায় পরিচালিত ‘নিউজ লিটারেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় জরিপে। ১ হাজার ২০৯ জনের ওপর পরিচালিত ওই জরিপে দেখা যায়, ৭৬ শতাংশ মানুষের সংবাদ-সাক্ষরতার হার কম। বিপরীতে, মাত্র ২৪ শতাংশের সংবাদ-সাক্ষরতার হার বেশি। জরিপে অংশ নেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ভুয়া সংবাদ বা ফেক নিউজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। পুরুষদের ৭৬ শতাংশ এবং নারীদের ৫১ শতাংশ ভুয়া সংবাদ দেখেছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রায় অর্ধেক মানুষ তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কেই সচেতন নন। এসব পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সংবাদ গ্রহণের প্রবণতা থাকলেও সংবাদ যাচাই, বিশ্লেষণ ও ভুয়া তথ্য শনাক্ত করার সক্ষমতায় বড় ঘাটতি রয়েছে। ফলে ডিজিটাল পরিসরে অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
ফেক ইনফরমেশনের বিস্তার: পরিসংখ্যান কী বলছে?
বাংলাদেশে ভুল তথ্যের বিস্তার কতটা ভয়াবহ, তা বোঝার জন্য ডিসমিসল্যাবের গবেষণার দিকে তাকানো যেতে পারে। ডিসমিসল্যাবের ২০২৪ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করা আটটি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ওই বছর মোট ৪,৬৯৯টি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একই তথ্য নিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন বাদ দিয়ে তারা ৩,১৬৭টি স্বতন্ত্র ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করে। ২০২৩ সালের তুলনায় ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশের সংখ্যা বেড়েছিল ৫৮ শতাংশ।
২০২৪ সালে শনাক্ত ভুল তথ্যের ৩৯ শতাংশ ছড়িয়েছিল ভিডিওর মাধ্যমে, ২৮ শতাংশ ছবি এবং ১৪ শতাংশ গ্রাফিক কার্ডের মাধ্যমে। অর্থাৎ, শুধু লিখিত খবর নয়, দৃশ্যমান কনটেন্টও বিভ্রান্তি ছড়ানোর বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ডিসমিসল্যাবের ২৯ জানুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত বার্ষিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, নয়টি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ৫,৭০৬টি ফ্যাক্টচেক পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪,১৩১টি ছিল স্বতন্ত্র ভুল তথ্য। আগের বছরের তুলনায় স্বতন্ত্র ভুল তথ্যের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। শনাক্ত ভুল তথ্যের প্রায় ৫৮ শতাংশ ছিল রাজনীতিসংশ্লিষ্ট এবং প্রায় ৫২ শতাংশ ছড়িয়েছে ভিডিওর মাধ্যমে। প্রায় প্রতি দশটির একটিতে এআই ব্যবহারের বিষয়ও উঠে এসেছে।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ হলো, বাংলাদেশের তথ্যজগতে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ক্রমবর্ধমান একটি সমস্যা। তবে মনে রাখতে হবে, এসব সংখ্যা ফ্যাক্টচেকারদের শনাক্ত ও যাচাই করা তথ্যের হিসাব, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া সব মিথ্যা তথ্যের মোট সংখ্যা নয়।
এআইয়ের যুগে ঝুঁকি আরও বেশি
আগে কোনো ছবি বা ভিডিও সম্পাদনা করতে প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হতো। এখন এআইয়ের সাহায্যে সাধারণ ব্যবহারকারীও বাস্তব মানুষের মতো দেখতে ছবি, কৃত্রিম কণ্ঠস্বর এবং বিশ্বাসযোগ্য ভিডিও তৈরি করতে পারেন। ফলে কোনো পরিচিত ব্যক্তির নামে ভুয়া বক্তব্য প্রচার, পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপন কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য সম্পাদিত কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া অনেক সহজ হয়েছে।
ইউনেস্কোর ২০২৪ সালের ‘বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিন’ গবেষণায় ৪৫টি দেশের ৫০০ জন ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতার ওপর জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, ৬২ শতাংশ কনটেন্ট নির্মাতা তথ্য শেয়ার করার আগে নিয়মিত ও পদ্ধতিগতভাবে তার সত্যতা যাচাই করেন না। আবার ৪২ শতাংশ অনলাইন কনটেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণে লাইক ও ভিউয়ের সংখ্যাকে গুরুত্ব দেন। তবে আশার বিষয় হলো, ৭৩ শতাংশ নির্মাতা মিডিয়া লিটারেসি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের আরেকটি বৈশ্বিক জরিপে দেখা যায়, ৮৫ শতাংশ নাগরিক অনলাইন ডিসইনফরমেশনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮৭ শতাংশ মনে করেন, ডিসইনফরমেশন তাঁদের দেশের রাজনৈতিক জীবনে ইতোমধ্যে বড় প্রভাব ফেলেছে।
এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের কী বার্তা দেয়?
প্রতি বছর ২৪ থেকে ৩১ অক্টোবর পালিত হয় ‘গ্লোবাল মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি উইক’। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য হলো—‘We All Play a Part – Media and Information Literacy for the People’।
প্রতিপাদ্যটির মূল বক্তব্য খুবই সহজ: একটি দায়িত্বশীল ও তথ্যসমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু সাংবাদিক, সরকার কিংবা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নয়; প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
একজন শিক্ষার্থী কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে যাচাই করবেন, একজন সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের উৎস নিশ্চিত করবেন, একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ভিউ বাড়ানোর জন্য মিথ্যা তথ্য প্রচার করবেন না, আর একজন নীতিনির্ধারক মানুষের তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন। এভাবেই সম্মিলিতভাবে তৈরি হতে পারে একটি সুস্থ তথ্যপরিবেশ।
বাংলাদেশে মিডিয়া লিটারেসি বাড়াতে কী করা প্রয়োজন?
প্রথমত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে মিডিয়া ও তথ্যসাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার শেখানো যথেষ্ট নয়; শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে একটি সংবাদ যাচাই করতে হয়, ছবি ও ভিডিওর উৎস খুঁজতে হয় এবং এআই-তৈরি কনটেন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হয়।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মিডিয়া লিটারেসি বিষয়ে আলাদা কোর্স, কর্মশালা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সাংবাদিকতা, শিক্ষা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, শিক্ষক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ তাঁদের বক্তব্য ও প্রচারিত তথ্যের ওপর অনেক মানুষ নির্ভর করেন।
চতুর্থত, বাংলাদেশে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। রিউমর স্ক্যানার, ডিসমিসল্যাব ও ফ্যাক্টওয়াচের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে বেসরকারিভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের গবেষণা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ আর বিস্তৃত পরিসরে করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, বাংলা ভাষায় সহজবোধ্য ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করতে হবে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চল, প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে কম দক্ষ মানুষের কাছে এসব প্রশিক্ষণ পৌঁছে দিতে হবে।
প্রয়োজন কার্যকর সরকারি নীতিমালা
মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানোর জন্য সরকারের একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ডিজিটাল রূপান্তর, তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যম-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ থাকলেও মিডিয়া ও তথ্যসাক্ষরতা নিয়ে সমন্বিত, পরিমাপযোগ্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর ‘মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি পলিসি অ্যান্ড স্ট্রাটেজি গাইডলাইন’ অনুসরণ করে একটি জাতীয় কৌশল তৈরি করা যেতে পারে। এতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, আইসিটি বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
সরকারের উচিত নিয়মিত জাতীয় মিডিয়া লিটারেসি জরিপ পরিচালনা করা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, বাংলা ভাষায় এআই ও তথ্য যাচাইয়ের উপকরণ তৈরি করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সহযোগিতা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে ভুল তথ্য মোকাবিলার নামে যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কিংবা ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকায় ইউএনডিপি আয়োজিত ‘ইনফরমেশন ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড সোশ্যাল কহেশন ডায়ালগে’ নীতিগত সমন্বয়, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, মিডিয়া লিটারেসি এবং সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টির গুরুত্ব বাড়ার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
প্রযুক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সচেতনতা
এআই আমাদের জীবনকে সহজ করছে, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াচ্ছে এবং নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেদিচ্ছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেউ যদি মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র।
মনে রাখতে হবে, একটি মিথ্যা খবর তৈরি করতে হয়তো কয়েক মিনিট লাগে, কিন্তু সেই খবরের কারণে তৈরি হওয়া সামাজিক বিভেদ, অবিশ্বাস কিংবা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় প্রয়োজন হয়। তাই শুধু প্রযুক্তিতে দক্ষ হলেই চলবে না, তথ্য ব্যবহারে দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে।
একটি সমাজ কত দ্রুত ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সমাজ কতটা ভালোভাবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে তথ্যের অভাব হবে না; বরং সত্য তথ্যের ভিড়ে মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাই এখন সময় এসেছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে যাত্রার পাশাপাশি একটি সচেতন, দায়িত্বশীল ও মিডিয়া লিটারেট বাংলাদেশ গড়ে তোলার। মনে রাখতে হবে, একটি মিথ্যা তথ্য শেয়ার না করাও হতে পারে দেশ ও সমাজের প্রতি একজন নাগরিকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
লেখক: গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী