চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট এখন আর কেবল একটি পদে নিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ নয়; এটি দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজনৈতিক প্রভাব, জবাবদিহি এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২৪ দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে ক্লাস-পরীক্ষা। অনিশ্চয়তায় পড়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অচলাবস্থার দায় আসলে কার?
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ সম্পূর্ণ সরকারের এখতিয়ারভুক্ত একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। সরকার প্রশাসনিক পরিচালনার জন্য যাকে সুবিধাজনক মনে করবে, তাকে নিয়োগ দেবে। তবে চুয়েটের ঘটনা নতুন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। নিয়োগের বিষয়টি সরকারের এখতিয়ারভুক্ত হলেও প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন শিক্ষার্থীদের মাঝেও এর ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক অভিঘাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, নিয়োগের প্রভাব পড়ছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর।
তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কোন প্রেক্ষাপটে কার স্থলাভিষিক্তে কাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সেই বিষয়েও জনমত যাচাই এখন জরুরি মনে হচ্ছে। কারণ ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পর তরুণ প্রজন্মের মনোভাবকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইতিবাচক হিসেবে দেখা গিয়েছে। চুয়েটে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, নিয়োগের সিদ্ধান্তটি বিশ্ববিদ্যালয় অংশীজনদের বড় একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। এই অসন্তোষের কারণ কী, তা খতিয়ে দেখা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজাই ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রথম দায়িত্ব।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। উপাচার্য নিয়োগে শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকের সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক নয়। আবার সরকার নিয়োগ দিয়েছে বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবার উদ্বেগ উপেক্ষাও করা যায় না। একটি নিয়োগ আইনসম্মত হতে পারে, কিন্তু সেটি ঘিরে গ্রহণযোগ্যতার সংকট তৈরি হলে তা মোকাবিলার জন্য সংলাপ, ব্যাখ্যা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হয়। শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা যায়, কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতিকে সরকারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখার অবকাশও রয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নানাজনের নানান মত গণমাধ্যমে পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো পক্ষকে দায়ী করা সমীচীন হবে না। প্রশ্নটি হলো, নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে যদি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থেকে থাকে, তার বোঝা কেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বহন করতে হবে? সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে যে বিরোধই থাকুক, তার সমাধান হওয়া উচিত আলোচনার টেবিলে—শ্রেণিকক্ষ বন্ধ রেখে নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক শক্তির পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত করা হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিক্ষার্থীদের।
তবে আন্দোলনকারীদের দায়ও একেবারে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই আন্দোলনের কারণে দীর্ঘ সময় ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়ে হাজারো শিক্ষার্থীর ওপর। যারা আন্দোলনে যুক্ত নন, তারাও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। শিক্ষার্থীদের দাবি যৌক্তিক হলেও তা আদায়ের পদ্ধতি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে না যায়। উপাচার্যের কার্যালয় অবরুদ্ধ করা কিংবা প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ সংকট সমাধানের পথ আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। ফলে সংকটটি আর শুধু উপাচার্য নিয়োগের বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এটি প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল দ্রুত আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু সংকট যত দীর্ঘ হয়েছে, শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা তত বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্ব যাদের হাতে, তাদের কাছে প্রশ্ন থাকবেই—সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নিতে এত সময় লাগছে কেন?
আমার কাছে বিষয়টি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নয়; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থারও একটি প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ভবন, পদ-পদবি কিংবা প্রশাসনিক আদেশের সমষ্টি নয়। এর মূল শক্তি হলো শিক্ষা, গবেষণা, যুক্তিবোধ এবং পারস্পরিক আস্থা। সেই আস্থায় ফাটল ধরলে প্রশাসনিক কাঠামো সচল থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
চুয়েটের সংকট নিরসনে এখন প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ উদ্যোগ। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনা, নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট প্রশ্নের জবাব দেওয়া এবং সব পক্ষকে নিয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ বের করা জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত ক্লাস-পরীক্ষা শুরুর একটি বাস্তবসম্মত সময়সূচি ঘোষণা করতে হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন ফিরে পান।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয়—উপাচার্য পদে কে থাকবেন? আরও বড় প্রশ্ন হলো, একটি বিশ্ববিদ্যালয় তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অচল থাকার পরও কেন সংকটের সমাধান হবে না? এর দায় সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও নয়, আন্দোলনকারীদেরও নিজেদের কর্মসূচির প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। কারণ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের লড়াইয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন জিম্মি না হয়—এটাই হওয়া উচিত সবার প্রথম অগ্রাধিকার।
লেখক:
সাবেক শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।