মো. আব্দুল্লাহ আলিফ © টিডিসি ফটো
তিস্তা বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী যা তা হিমালয়ের ছো-লামো হ্রদ থেকে উৎপত্তি হয়ে ভারতের সিকিম হয়ে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা দিয়ে বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের পাঁচটি জেলার (নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা) মিটার প্রবাহিত এই তিস্তা নদীর দুইধারে অববাহিকায় প্রায় ৩ কোটি লোকের বাস যার প্রায় ৭০% লোক নির্ভরশীল বা প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে তিস্তার উপর নির্ভরশীল।তাই তিস্তাকে উত্তরবঙ্গের প্রাণরেখা বলা হয়।
তিস্তার অর্থনৈতিক গুরুত্ব এতোটাই যে এই নদীর কারণে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ-ভারত বিরোধ পর্যন্ত দেখা গেছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের চাষাবাদ,সেচকাজসহ যাবতীয় কাজের প্রধান মাধ্যম হলো তিস্তার পানি। এই পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্যে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার তিস্তা বাঁধ নির্মাণ করে। ঠিক একইকাজে ১৯৯৬ সালে ভারত সরকার তিস্তার উজানের দিকে গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে পানির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেয়।
ফলে তারা শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রত্যাহার করে ও বর্ষাকালে বাঁধ খুলে দেয় যা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে খরা ও বন্যার প্রধান কারণ। একই সাথে পানির এই একক পানি প্রত্যাহার ১৯৮৩ সালের যৌথ নদী কমিশনের চুক্তিকে অকার্যকর করে যেখানে ভারত ৩৯%, বাংলাদেশ ৩৬% ও ২৫% নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক থাকার কথা সেটা সম্ভব হচ্ছে না।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তার এই পানি সংকটের কারণে তিস্তাচরের প্রায় ৩০০০ একর আবাদি জমি অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে। আন্তজাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (JFPRI) এর তথ্য অনুযায়ী, তিস্তার পানি সংকটের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদন ব্যহত হয় যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০০০-৬৫০০ কোটি যা দিয়ে সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদনে (GDP) প্রায় ৯% বেশি শুধু উত্তরাঞ্চলের জীবনযাত্রা বা ভাগ্যোন্নয়ন অবদান রাখা যেত।
শুধু তাই নয়, তিস্তার পানি এখন আমাদের ন্যায্য অধিকার। বিভিন্ন সময় আলোচনা করেও বাংলাদেশ-ভারত পানিবণ্টন চুক্তির কার্যকারিতা ফলপ্রসূ না হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে।এর মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারতের তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতার পাশাপাশি বাংলাদেশের কাছে ও পর্যাপ্ত তথ্য সত্যিই এই সংক্রান্ত উপাত্ত, গবেষণা বা দক্ষ কূটনীতিকের অভাব ছিলো।তাই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন ১৯৭২ সালে গঠিত হলে ও এতোদিনে ৫২ বছরে সমঝোতায় কোনো উন্নতি করতে পারেনি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বিরোধিতা ও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে তিস্তা সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব দেয় যেটি ২০১০ সালে গ্রহণ করা হয়। ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আসেন দিল্লি-ঢাকা বৈঠকের ঢাকা সফরে মাধ্যমে “তিস্তা চুক্তি” স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এই চুক্তির বিরোধীতা করলে স্বাক্ষর করেই মনমোহন সিং দিল্লি ফেরত যান। এরপর থেকে তিস্তাচুক্তির ব্যাপারে ঢাকা-দিল্লির অগ্রগতির প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।ফলে একযুগের বেশি সময় ধরে তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন চুক্তি অমীমাংসিত থাকে।
অন্যদিকে বছরের পর বছর বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের হয় জনগণের গ্রীষ্মের খরা ও বর্ষার বন্যার মতো কোটি লোকের দুর্ভোগের সমাধান খুঁজতে, কৃষিজ ও মৎস্য কার্যক্রম সচল রাখতে এক মহাপরিকল্পনা নেয় বাংলাদেশ সরকার। পরিকল্পনার সমীক্ষাটি শুরু হয় ২০১৬ সালে ও প্রতিবেদন মূল্যায়ন শেষ হয় ২০২৩ সালে। পরিকল্পনাটির নাম কম্প্রিহেন্সিত ম্যানেজমেন্ট এন্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট(TRCMR)।
পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ অংশের উজানে বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণ।এছাড়া ও নদী খনন,নদীর দুইধারে বাঁধ নির্মাণ,ভূমি পুণরুদ্ধার সহ নদীর দুইধারে স্যাটেলাইট শহর, হোটেল রেঁস্তোরা এবং বৈদ্যুতিক প্লান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার কোটি টাকা।বিগত আওয়ামী লীগের সময় থেকেই তিস্তা প্রকলে চীন যখন আগ্রহ দেখিয়ে আসছিল। সমীক্ষা শেষে চীন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রস্তুতি দেওয়া শুরু করে তখন থেকে ভারত ও প্রকল্পটি নিয়ে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিনয় কোয়াত্রা ঢাকায় এসে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনা করেন।পরবর্তীতে হাসিনা জুন মাসে দিল্লি সফরে গিয়ে তিস্তা পরিকলানা নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনা করেন ও একইসাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনও করেন।দেশে ফিরে ঢাকায় শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের জানান, " তিস্তা প্রকল্প দাবিটা অনেকদিনের। তো ভারত যদি প্রকল্পটা করে দেয় তবে আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। তো সেটাই আমার জন্য বেশি সহজ হয়ে গেলো না? বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন এখন হয়ত তিস্তা প্রকল্প ভারতই পাবে।
কারণ, তিস্তা প্রকল্প ভারতের হাতে রাখা ভারতের কৌশলগত রাজনীতি। কারণ তিস্তা প্রজেক্ট চীনের কাছে গেলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১০০ কি.মি. এর মধ্যে চীনের জোরালো উপস্থিতি থাকবে যা ভারতের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। এরপর জুলাই মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়ন সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীতে অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস চারদিনের চীন সফরে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে চীনের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনার প্রশংসা করে চীনকে পানি ব্যবস্থাপনার মাস্টার অভিহিত করে শত শত বিস্তৃত নদী ও পানি ব্যবস্থাপনায় চীনের কাছে ৫০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান দাবি করেন। আলোচনায় তিনি মূলত তিস্তা ব্যবস্থাপনা ও ঢাকার দূষিত পানি পরিস্কারের প্রয়োজনীয় সহায়তা চান। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গুওইংকে চীনের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সাথে ভাগাভাগির ব্যাপারেও সহায়তা চান।
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বিএনপিও পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে দাবি তুলে এসেছে।২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিস্তা নদীরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলুর নেতৃত্বে তিস্তাপাড়ের ৫টি জেলার (নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা) লাখ লাখ মানুষ তিস্তাপাড়ের ১১টি পয়েন্টে ১০৫ কি.মি. ব্যাপী একযোগে মশাল জ্বালিয়ে কর্মসূচি পালন করেন। এর মূল বক্তব্য হচ্ছে জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই। প্রধান নেতৃত্বদানকারী আসাদুল হাবিব দুলু কাউনিয়া পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন এবং অন্তবর্তী সরকারকে দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করার আল্টিমেটাম দেন। এর ফলে পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে জনসচেতনতা তৈরি হয় এবং দাবি জোরালো হয়।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে চায় তারেক রহমানের সরকার। এজন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে বিএনপি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় বসার তিনমাসের মাথায় ২০২৬ মে মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীন যাওয়ার পূর্বে এটা আমাদের ওই অঞ্চলের মানুষের মরণ-বাঁচনের বিষয়। এটা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার সেই অঞ্চলের সমস্যা সুরাহা করার এবং এটা আমাদের সরকারের অঙ্গীকার।
এ অঙ্গীকার আমরা পূরণ করবো এবং চীন সফরে এই বিষয়টা আমরা নিশ্চয়ই আলোচনা করবো। চীন সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, 'তাদের (ভারত) মাইন্ড রিড করা আমার কাজ না। তবে প্রত্যাশা থাকবে, যাতে এ চুক্তিটা, যেটা করার কথা ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা আমরা কনসিডার করতে পারি কি না। কিন্তু সেজন্য তো বসে থাকা চলবে না, আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে।
১৯ জুন, ২০২৬ তিস্তা ব্যারেজ পরিদর্শন করতে গিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, প্রতিবেদন পেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত একনেকে পাস করা হবে। এ সময় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবীব দুলু বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। এ থেকে বুঝা যায় বর্তমান সরকার হয়ত দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দৃশ্যমান কাজ শুরু করবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফর করে চীনের সাথে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। এতে করে চীনের সাথে চুক্তি নিয়ে দিল্লির গভীর উদ্বেগ দেখা যায়। ভারতের উদ্বেগ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সাংবাদিকদের বলেন, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটি তৃতীয় পক্ষের প্রভাবমুক্ত থাকা উচিত।'
চীন সফর থেকে ফিরে সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমি দেশের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা ও স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছি। যদি কোনো অর্জন হয়, সেটা শুধুমাত্র দেশের অর্জন। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী তার সবার আগে বাংলাদেশ নীতিকেই সর্বাধিকার অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় ২ কোটি মানুষের ভাগ্যের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ ভারতের জন্য অপেক্ষা না করে চীনের সহায়তা নিয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে উন্নতির অন্যতম শর্ত হচ্ছে দক্ষতা ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার। কারিগরিক্ষেত্রে চীন তুলনামূলকভাবে অনেক উন্নত হওয়ায় পানি ব্যবস্থাপনা ও স্যাটেলাইট শহর নির্মাণের এই প্রজেক্টে অবশ্যই চীন সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হবে। কারণ দ্রুত ও সহজলভ্যভাবে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীন ভারতের চেয়ে ভালো বিকল্প হতে পারে।
পাশাপাশি, এই এশিয়াতে আঞ্চলিক বাণিজ্যে এগিয়ে যেতে এই মুহূর্তে চীনের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তির সহায়তা অবশ্যই দরকার। তবে একইসাথে দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থের কথা চিন্তা করে একইসাথে কৌশলগত সুরক্ষানীতি ও সুসমচুক্তি অবলম্বন করতে হবে। কারণ, তৃতীয়বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের একক কোনো পরাশক্তির প্রতি না ঝুঁকে নিজের স্বার্থে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখা উচিত।
লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।