দাসত্ব শেখাচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, তৈরি হচ্ছে মেরুদণ্ডহীন জাতি

২২ জুন ২০২৬, ০৫:২৬ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড—এ কথা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি সত্যিই একজন মানুষকে চিন্তাশীল, সৃজনশীল ও স্বাধীনচেতা নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলছে, নাকি তাকে কেবল পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার যন্ত্রে পরিণত করছে?

বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে জ্ঞানের চেয়ে মুখস্থবিদ্যার মূল্য অনেক বেশি। একজন শিক্ষার্থীকে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় নির্দিষ্ট উত্তর মুখস্থ করতে, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে চিন্তা না করতে। আর এ ব্যবস্থায় যে যত মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শী সে তত বেশি বাহবা বা সুনাম অর্জন করে থাকেন। ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য—জ্ঞানার্জন, আত্মউন্নয়ন এবং একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে পরিপূর্ণ করে তোলা—ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে।

আজ এ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার প্রকৃত অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল কিছু অযাচিত তথ্য মুখস্থ করে একটি চাকরি পাওয়ার মধ্যে। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সব জায়গা থেকেই আমরা প্রায় একই বার্তা শুনে থাকি, ‘ভালো করে পড়ো, একটা ভালো চাকরি পাবে।’ কিন্তু খুব কমই বলা হয়, ‘ভালো করে শিখো, একজন ভালো মানুষ হতে হবে, দেশ ও জাতির কাজে আসতে হবে।’ ফলে শিক্ষা আর আত্ম-আবিষ্কারের পথ আর খোলা থাকে না; এটি ধীরে ধীরে চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। আর তা না পাওয়া পর্যন্ত চলতেই থাকে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং একপর্যায়ে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীদের জীবনে এই জন্য নেমে আসে এক চরম হতাশা।

একজন শিক্ষার্থী যখন বিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন, তখন তার কৌতূহল থাকে অসীম। সে জানতে চায়, প্রশ্ন করতে চায়, নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চায়। কিন্তু শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন স্তর পার হতে হতে সেই কৌতূহল অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যায়। কারণ তাকে শেখানো হয় প্রশ্ন করার চেয়ে উত্তর মুখস্থ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষায় ভালো ফল করাই হয়ে ওঠে শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড।

এই নিয়ে সবচেয়ে ভালো একটি উদাহরণ সম্ভবত ইংরেজি শিক্ষা। একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে ইংরেজি পড়ে। অসংখ্য গ্রামার রুল, প্যারাগ্রাফ, এসে এবং ট্রান্সলেশন শিখে। কিন্তু চাকরির ইন্টারভিউ কিংবা বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ কথোপকথনে অনেকেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না। কারণ ভাষা শেখার পরিবর্তে আমরা পরীক্ষার জন্য ভাষা মুখস্থ করেছি। আমরা ভাষাকে ব্যবহার করতে শিখিনি, শুধু উত্তর লিখতে শিখেছি।

মূলত প্রশ্ন না করতে শেখানোই এ শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় ব্যর্থতা। আমি কি করছি? কেন করছি? কেন শিখছি? এটি আমার কী কী কাজে আসবে? কোন বিষয় সম্পর্কে জানার আগে আমরা নিজেদের তা কখনোই জিজ্ঞেস করি না। আমরা উত্তর ঠিকই খুঁজতে শিখি, কিন্তু প্রশ্ন করতে শিখি না। তাই আজকে নতুন কিছু শিখব বা নতুন কিছু শেখার মজা কিংবা সেটিকে জীবনে কাজে লাগানোর ইচ্ছা আমাদের মধ্যে মরে গেছে। সৃজনশীলতার কদর কমে যাওয়ায় আমরা আমাদের মধ্যকার সেই সৃজনীশক্তিকে  বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। অথচ ইতিহাসের প্রায় সব বড় আবিষ্কার, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের শুরু হয়েছিল একটি প্রশ্ন থেকে। যে জাতি প্রশ্ন করতে শেখে না, সে জাতি নতুন কোন পথও তৈরি করতে পারে না। আমাদের শ্রেণিকক্ষে অনেক সময় শিক্ষার্থীর কৌতূহলের চেয়ে তার নীরবতাকে বেশি মূল্য দেওয়া হয়। ফলে স্বাধীন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হতে থাকে।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, আমাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ১২ থেকে ১৬ বছর পড়াশোনা শেষ করার পরও জীবনের মৌলিক দক্ষতাগুলো অর্জন করতে পারেন না। অনেকেই কর্মক্ষেত্রে গিয়ে বুঝতে পারেন যে বাস্তব সমস্যার সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব, সৃজনশীল চিন্তা কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয়গুলো তাদের শিক্ষাজীবনে তেমন গুরুত্ব পায়নি। অথচ আধুনিক বিশ্বে এগুলোই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা।

পরীক্ষার খাতায় একজন শিক্ষার্থী নিউটনের সূত্র, অর্থনীতির তত্ত্ব বা ব্যবসায় প্রশাসনের সংজ্ঞা নিখুঁতভাবে লিখতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনের একটি সাধারণ সমস্যা বিশ্লেষণ করে সমাধান দিতে গেলে অনেকেরই গায়ের ঘাম ছুটে যায়। কারণ আমরা জ্ঞানকে প্রয়োগ করার চেয়ে জ্ঞানকে পুনরাবৃত্তি করার অনুশীলন বেশি করি। ফলাফল হিসেবে ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু দক্ষ মানুষের ঘাটতি দেশে থেকেই যায়।

এ বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের একটি বড় অংশ উপযুক্ত কর্মসংস্থান পায় না। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় নয় (৯) লাখ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক পাস শিক্ষার্থী বেকার অবস্থায় রয়েছেন। এটি শুধু চাকরির সংকট নয়, এটি শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান গভীর অসামঞ্জস্যেরও প্রতিচ্ছবি।

শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার অবমূল্যায়ন। আজ আমরা অনেক শিক্ষিত মানুষ পাচ্ছি, কিন্তু সব সময় মানবিক মানুষ পাচ্ছি না। সততা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ এবং সামাজিক জবাবদিহিতার মতো মূল্যবোধগুলো ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ফলে দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা তোষামোদের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সমাজ হিসেবে আমাদের অবস্থান যতটা দৃঢ় হওয়ার কথা, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। 

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই শিকল ভাঙার চেষ্টা করার বদলে আমরা অনেকেই এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। ধীরে ধীরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার পরিবর্তে অন্যায়ের সঙ্গে সহাবস্থান করাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক মূল্যবোধকে ক্ষয় করছে প্রতিনিয়ত।

একজন শিশু যখন সততার চেয়ে অসৎ শর্টকাট পথগুলো অনেক বেশি ফলপ্রসূ দেখে, শুনে বড় হয়, তখন তার মূল্যবোধও সেই বাস্তবতার দ্বারা প্রভাবিত হবে- এটাই স্বাভাবিক। যখন সে দেখে যোগ্যতার চেয়ে সম্পর্ক, নীতির চেয়ে সুবিধাবাদ, পরিশ্রমের চেয়ে তোষামোদ বেশি পুরস্কৃত হচ্ছে, তখন সে ভুল বার্তাই গ্রহণ করে। ফলে যা ভুল, সেটিই ধীরে ধীরে সমাজে সঠিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে।

এ ক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষার ভূমিকাও কোনো অংশে কম নয়। অনেক পরিবারে সন্তানের চরিত্র, নৈতিকতা কিংবা মানবিকতার চেয়ে ফলাফল, চাকরি এবং সামাজিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কখনো কখনো সন্তানদের ওপর এমন চাপ তৈরি করা হয় যে তারা লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতির চেয়ে ফলাফলকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শেখেন। এর ফলে সততা, ন্যায়বোধ, আত্মমর্যাদা ও সহমর্মিতার মতো মূল্যবোধগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশ এখনো এমনভাবে পরিচালিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মত প্রকাশ বা সমালোচনামূলক চিন্তাকে খুব বেশি উৎসাহ দেওয়া হয় না। ফলে তারা ধীরে ধীরে এমন একটি মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যেখানে নির্দেশ পালন করাই প্রধান কাজ। নিজের মতো করে ভাবা, প্রশ্ন তোলা, ভুল করা, ভুলকে মেনে নিয়ে তা থেকে শেখা বা ভিন্নমত প্রকাশ করা অনেক সময় নিরুৎসাহিত হয়। 

এ কারণেই অনেক সমালোচক বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষ কর্মচারী তৈরি করতে পারলেও স্বাধীন চিন্তার মানুষ তৈরিতে পিছিয়ে রয়েছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় গবেষণা, উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধান এবং ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেখানে একজন শিক্ষার্থীকে শেখানো হয় কীভাবে চিন্তা করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শেখানো হয় কী চিন্তা করতে হবে। এই পার্থক্যই ভবিষ্যতে উদ্ভাবক ও অনুসারীর মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি করে।

আমরা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে বড় হচ্ছি, যেখানে ভুল উত্তর দেওয়ার ভয় আছে, কিন্তু প্রশ্ন না করার কোনো জবাবদিহিতা নেই। যে যা হচ্ছে তাই মেনে নিচ্ছে, মাঝে মাঝে অন্যায়কেও প্রশ্রয় দিচ্ছে, ঠিক বিদ্যালয় থেকেই আওয়াজ না তোলার চর্চা দিনশেষে তাকে একজন অথর্ব মানুষ হিসেবে পরিণত করছে, যার ডিগ্রি আছে কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা নেই। ফলে সেও বড় হয়ে ঠিক একই বিষয়গুলো চর্চার পুনরাবৃত্তি দেখতে উরগ্রীব হচ্ছেন। আর দিন শেষে তৈরি হচ্ছে একটি মেরুদণ্ডহীন জাতি।

এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা যা শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু ভাবার ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদ উত্তরের পেছনে ছুটে চলা শেখায়, তা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ এতে করে একটি জাতি ধীরে ধীরে সৃজনশীল মানুষ নয়, বরং নির্দেশনা অনুসরণে অভ্যস্ত মানুষে পরিণত হয়।

একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার মানুষ শুধু নির্দেশ পালন করতে শেখে না, বরং নতুন পথও তৈরি করতে শেখে। তাই সময়ের দাবি হলো এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে নম্বরের চেয়ে জ্ঞান, মুখস্থের চেয়ে বিশ্লেষণ, আর আনুগত্যের চেয়ে নৈতিকতা, সৃজনশীলতাকে বেশি মূল্য দেওয়া হবে।

কারণ শিক্ষা যদি মানুষকে শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করে, তবে সে হয়তো একজন কর্মচারী হবে। কিন্তু শিক্ষা যদি মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, নৈতিকতার চর্চা করায় এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেয়, তবে সে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হয়ে উঠবে।
হয়তো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট জ্ঞানের অভাব নয়, বরং মানুষ গড়ার লক্ষ্য থেকে সরে আসা। আর সেই লক্ষ্যকে পুনরুদ্ধার করতে না পারলে আমরা ডিগ্রিধারী মানুষের সংখ্যা বাড়াতে পারব, কিন্তু প্রকৃত অর্থে আলোকিত মানুষ তৈরি করতে পারব না, যেটি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

লেখক: শিক্ষার্থী, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

মাদক মামলায় আটক ব্যক্তিই হলেন আর্জেন্টিনা-স্পেন ম্যাচের রেফ…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপে এক টুর্নামেন্টেই বদলে গেল ভোজিনহার জীবন
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
জুলাই শহীদ পরিবারকে কোটি টাকা প্রদানসহ তিন দাবি এনসিপির
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
শহীদ জিয়ার খুনি পলাতক অবসরপ্রাপ্ত মেজরকে যেভাবে গ্রেপ্তার ক…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের ভর…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
দুপুরের মধ্যে ৮ জেলায় ঝড়ের আভাস
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence