বিএমএসএসের জাতীয় সায়েন্টিফিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ © সংগৃহীত
বাংলাদেশে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (এসআরএইচআর) নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রথম ‘ন্যাশনাল সায়েন্টিফিক কনফারেন্স অন পপুলেশন ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এসআরএইচআর’। গত ১৯ জুন বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস সোসাইটির (বিএমএসএস) উদ্যোগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে এই ব্যতিক্রমী সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই সম্মেলনে মেডিকেল শিক্ষার্থী, গবেষক, চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক ও জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ তিন শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলনের প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল ‘অ্যাডভান্সিং এসআরএইচআর পলিসি থ্রু এভিডেন্স বেজড অ্যাকশন’।
দিনটির সূচনা হয় তিনটি সমান্তরাল (প্যারালেল) ক্লিনিকাল সেশনের মাধ্যমে, যা দেশের এসআরএইচ সেবা প্রদানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতাগুলো পূরণের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ‘মাসিক নিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাত-পরবর্তী সেবার ক্লিনিকাল ব্যবস্থাপনা’ সেশনটি পরিচালনা করেন আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. সায়েদ রুবায়েত। এছাড়া ইউএআরআইবির পরিচালনায় ‘এসআরএইচ সেবায় আল্ট্রাসাউন্ডের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ’ এবং ডা. আহসান আহমেদের পরিচালনায় ‘কার্যকর সাহিত্য পর্যালোচনা ও গবেষণার বিষয় নির্বাচন’ বিষয়ক সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যা তরুণ চিকিৎসকদের একাডেমিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রজনন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নেতৃত্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. ফারিহা হাসীন বাংলাদেশে এসআরএইচআরের বর্তমান প্রেক্ষাপটের ওপর একটি তথ্যবহুল উপস্থাপনা করেন। বিএমইউর গাইনোকোলজিকাল অনকোলজির অধ্যাপক এবং আরসিওজি, আইআরসি বাংলাদেশের চেয়ার প্রফেসর ড. ফাওজিয়া হোসেন ‘দ্য ইভলভিং ল্যান্ডস্কেপ অব এসআরএইচআর ইন সাউথইস্ট এশিয়া: ব্রিজিং গ্যাপস, ব্রেকিং ব্যারিয়ার’ শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবেও বক্তব্য রাখেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আইপাস বাংলাদেশের প্রজেক্ট ডিরেক্টর ড. রাহাত আরা নূর, ডিজিএফপির অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (এমসিএইচ) ড. মো. মনজুর হোসেন এবং ইউএনএইডস বাংলাদেশের সাবেক কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. সায়মা খান। উদ্বোধনী সেশনটিতে সভাপতিত্ব করেন এন্ডোমেট্রিওসিস অ্যান্ড অ্যাডেনোমায়োসিস সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর সভাপতি ড. সামিনা চৌধুরী।
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত প্যানেল ডিসকাশন। এগুলো হলো— ‘জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স অ্যান্ড মেডিকোলিগাল কেয়ার’, ‘ম্যাটার্নাল চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি প্ল্যানিং’ এবং ‘ইউথ এনগেজমেন্ট ফর ট্রান্সফর্মেটিভ অ্যাকশন ইন এসআরএইচআর’
সম্মেলন-পূর্ব প্রস্তুতিমূলক সেশন থেকে প্রাপ্ত সমাধানগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সেশনগুলো পরিচালনা করেন বিএমএসএস সভাপতি ও বিএমএসএস অ্যালামনাইরা। বিশেষজ্ঞ প্যানেলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, নারীপক্ষ, আইপাস বাংলাদেশ এবং শেয়ার-নেট বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এই সেশনগুলো থেকে তৈরি হওয়া ‘আউটপুট পেপার’ পরবর্তীতে নীতিনির্ধারক ও অংশীদারদের কাছে পাঠানো হবে।
মেডিকেল শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকদের জন্য ছিল একটি নিবেদিত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট, রিসার্চ প্রপোজাল ও কেস প্রেজেন্টেশন সেশন। সেখানে মাসিক নিয়ন্ত্রণ, প্রজনন স্বায়ত্তশাসন, বাল্যবিবাহ, কিশোরী গর্ভধারণ, পরিবার পরিকল্পনা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মতো সমসাময়িক বিষয়ে তরুণদের মৌলিক গবেষণা ও কাজ প্রদর্শিত হয়।
দিনব্যাপী সফল এই আয়োজনের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের গাইনোকোলজি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আফরোজা কুতুবী, আইপাস বাংলাদেশের ডিরেক্টর হেলথ ড. ওয়াহিদা সিরাজ এবং পিএইচএবির প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ড. আবু জামিল ফয়সাল। সমাপনী সেশনে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউর প্রজনন ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ড. হালিদা হানুম আখতার।
সম্মেলনের কনভেনর আতিকা তাবাস্সুম ফারিহা জানান, এই সম্মেলনের প্রভাব শুধু একটি দিনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এখানকার অর্জিত ক্লিনিকাল দক্ষতা দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়বে এবং এই যুব সমাজ ভবিষ্যতে প্রজনন স্বাস্থ্যকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চিকিৎসকের পাশাপাশি দক্ষ অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ করবে।