শহীদ কুরমান শেখ © সংগৃহীত
‘আমার বাবার স্বপ্ন ছিল ভাইয়াকে বিসিএস ক্যাডার আর আমাকে ব্যাংকার বানাবেন। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমার বাবা অসুস্থ থেকেও হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আমাদের পড়ালেখা করাচ্ছিলেন। আমার বাবা শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন, তিনি হাঁটতে পারতেন না। তিনি কোনো আন্দেলনেও যায়নি। তাকে দেখে যে কোন মানুষের মায়া হওয়ার কথা। তারা কীভাবে পারল আমার অসুস্থ বাবাকে গুলি করে মারতে। আমার বাবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। এখন বাবা শুধুই স্মৃতি। সরকারের কাছে আমার বাবার এই নির্মমভাবে হত্যার বিচার চাই। আর আমার ও ভাইয়ার কর্মসংস্থান চাই।’
এভাবই কথাগুলো বলছিলেন ২০২৪ সালের ২০ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কারফিউ চলাকালে ঢাকার সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে মাছবাজার এলাকায় বুকে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ কুরমান শেখের মেয়ে মিতু আক্তার।
গুলিতে প্রাণ হারানো শারীরিক প্রতিবন্ধী সেই কুরমান শেখের দ্বিতীয় শাহাদাত বার্ষিকী আজ ২০ জুলাই। কুরমান শেখ রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব রতনদিয়া গ্রামের মৃত মেহের শেখের ছেলে।
স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সংসার। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও অদম্য পরিশ্রমী কুরবান শেখ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছেলে রমজান শেখ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া মেয়ে মিতু আক্তারের সব স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের ভরসাকেন্দ্র ছিলেন এই বাবা কুরমান শেখকে ঘিরেই।
তার আকস্মিক মৃত্যুর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তার শোকে স্তব্ধ পরিবারটি এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।
২০২৪ সালের ২০ জুলাই। দেশজুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে চলছে অস্থিরতা, চারদিকে কারফিউ। জীবিকার তাগিদে দোকান খুলেছিলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী মুরগি ব্যবসায়ী কুরমান শেখ (৪৯)। কিন্তু সেই দিনটিই যে তার জীবনের শেষ দিন হয়ে থাকবে, তা হয়তো পরিবারের কেউ ভাবেননি। ঠিক দুই বছর আগে ২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কারফিউ চলাকালে ঢাকার সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে মাছ বাজার এলাকায় বুকে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো শারীরিক প্রতিবন্ধী সেই কুরমান শেখের দ্বিতীয় শাহাদাত বার্ষিকী আজ ২০ জুলাই। ঘটনা ওই দিনই রাত ৯টার দিকে কুরবান শেখের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে এনে রাত ১১টায় স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ঘটনার দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ছেলে রমজান শেখ বলেন, ‘২০ জুলাই সকালে কারফিউর মধ্যেই অনেক দোকানির দোকান খোলা দেখে আমার আব্বুও সকাল ৯টার দিকে দোকান খোলেন। বাসা থেকে আব্বুর দোকানে হেঁটে যেতে ৫ থেকে ৭ মিনিটে সময় লাগে। দুপুর ১টার দিকে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। তখন আমার বোন মিতু আব্বুকে ফোন করে বাসায় চলে আসতে বলে। দুপুরে প্রায় ২টার দিকে বাজারের দোকানি আমার এক চাচা ফোন করে আমাকে জানান, আমার আব্বুর গুলি লেগেছে। আমি দৌড়ে বাজারে গিয়ে দেখি আমার চাচাসহ কয়েকজন দোকানি আমার আব্বুকে কোলে করে নিয়ে আসছেন। আমরা দ্রুত তাকে পাশের একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে আব্বুকে ভর্তি করেনি। পরে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক আব্বুকে মৃত ঘোষণা করেন।’
তিনি বলেন, ‘পরে আমি জানতে পারি দুপুরে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ শুনে আব্বু দোকান বন্ধ করে হেঁটে বাসার উদ্দেশে রওনা হন। সামনে সংঘর্ষ হতে দেখে আব্বুসহ কয়েকজন দোকানি মাছ বাজারে বরফকলের গেট আটকে ভেতরে আশ্রয় নেন। দুর্বৃত্তরা বরফকলের গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে আব্বুসহ সকলেই আহত হন। আব্বুর বুকে ও পায়ে দুটি বুলেট বিদ্ধ হয়। এ ছাড়া বুকে ও মুখে অসংখ্য ছররা গুলি লাগে। পরে আমার আব্বু মারা যান।’
কুরবান শেখের স্ত্রী শিল্পী খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী কোনো রাজনীতি করতো না। তিনি কোনো আন্দোলনে যাযননি। তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন, অসুস্থ ছিলেন। তিনি দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন। পুলিশের কাছে তিনি হাতজোড় করে কাকুতি-মিনতি করে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছিলেন। তারপরও তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। আমার স্বামীর স্বপ্ন ছিল ছেলেকে বিসিএস ক্যাডার আর মেয়েকে ব্যাংকার বানাবেন। তার স্বপ্ন এখন শুধুই স্মৃতি। আমার ছেলেমেয়েকে এখন কে দেখবে।’
বাবার নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং ভাই-বোনের জন্য কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন শোকসন্তপ্ত পরিবারটি। কুরমান শেখের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নই চুরমার করেনি, বরং রেখে গেছে বিচার পাওয়ার এক অন্তহীন প্রতীক্ষা।