মসজিদে খুতবা দিচ্ছেন খতিব © সংগৃহীত
মুসলমানদের জন্য পবিত্র জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। এ দিনটি ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের কাছে সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবে পরিচিত। এ দিনের ইবাদত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতোই ফজিলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহর কাছে জুমার দিনটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতোই শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনটি আল্লাহর কাছে অতি মর্যাদাসম্পন্ন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর ১০৮৪)।
জুমার খুতবার সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক ড. মিজানুর রহমান আজহারী বলেছেন, খুতবা চলাকালে কথা বলা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি অন্য কাউকে ‘চুপ করো’ বলাও ইসলামের দৃষ্টিতে অনুচিত। এ সময় মুসল্লিদের একাগ্রচিত্তে খুতবা শোনার আহ্বান জানান তিনি।
এক মাহফিলে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, জুমার খুতবা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের ‘জিকরুল্লাহ’র দিকে ধাবিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, আর এই জিকিরের অন্যতম অর্থ হলো জুমার খুতবা। তাই খুতবার সময় মনোযোগ ধরে রাখা এবং সম্পূর্ণ নীরব থাকা প্রত্যেক মুসল্লির দায়িত্ব।
তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায় খুতবার সময় কেউ কথা বললে পাশে থাকা ব্যক্তি তাকে ‘চুপ করো’ বলে সতর্ক করেন। কিন্তু হাদিসে এ বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, খুতবা চলাকালে কেউ কথা বললে তাকে ‘চুপ করো’ বলাও অনুচিত। কারণ এতে খুতবার সময় আরেকটি কথাবার্তা সৃষ্টি হয়।
আজহারী বলেন, জুমার খুতবা এমন একটি সময় যখন মুসল্লিদের পুরো মনোযোগ খতিবের বক্তব্যের দিকে থাকা উচিত। খুতবার মাধ্যমে মানুষকে কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা দেওয়া হয়, সমাজের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, খুতবার সময় অপ্রয়োজনীয় আলাপ, মোবাইল ফোন ব্যবহার কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমনকি কারও ভুল আচরণ চোখে পড়লেও খুতবা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নীরবতা বজায় রাখাই উত্তম।
বক্তব্যে তিনি মুসল্লিদের উদ্দেশে বলেন, জুমার খুতবা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়; এটি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণের একটি মাধ্যম। তাই খুতবার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং এর নির্দেশনা জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
আরও পড়ুন: জুমার নামাজ ছেড়ে দিলে পেতে হবে যে দুই শাস্তি
এছাড়াও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘জুমার দিন ইমাম খুতবা দানকালে আপনি যদি পাশের কাউকে বলেন, ‘চুপ থাকুন’, তাহলে আপনি জুমার সওয়াব নষ্ট করে দিলেন।’ (সহিহ বুখারি: ৮৯২; সহিহ মুসলিম: ৮৫১)
আবু দারদা (রা.) বলেন, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরে বসে জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি একটি আয়াত তিলাওয়াত করলে আমি পাশে থাকা উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-কে জিজ্ঞেস করি, আয়াতটি কখন নাজিল হয়েছে। তিনি কোনো উত্তর দেননি। খুতবা শেষে উবাই (রা.) বলেন, খুতবার সময় কথা বলার কারণে তুমি জুমার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছ। বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হলে তিনি বলেন, “উবাই ঠিক বলেছে। ইমাম খুতবা দেওয়া শুরু করলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুপ থাকবে।” (মুসনাদে আহমাদ: ২০৭৮০; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১১১১)
আল-বুসিরি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। এ হাদিস প্রমাণ করে যে, জুমার দিন ইমামের খুতবাকালে নীরবতা পালন করা ফরজ এবং কথা বলা হারাম।
আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সে সময় একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন মুহূর্তে একজন বেদুইন দাঁড়িয়ে বলল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পরিবার-পরিজন ক্ষুধায় কাতর। আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” তখন তিনি দুই হাত তুললেন। তাঁর দুআর ফলে সেদিন বৃষ্টি নামল। এরপরের দিনও বৃষ্টি হলো, তারপরের দিনও হলো এভাবে পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকল। সেই জুমায় একই বেদুইন অথবা অন্য একজন দাঁড়িয়ে বলল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! ঘরবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে, সম্পদ ডুবে যাচ্ছে। আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” তখন তিনি আবার দুই হাত তুললেন। (সহিহ বুখারি: ৮৯১; সহিহ মুসলিম: ৮৯৭)
এ ছাড়া জুমার খুতবা চলাকালে সালাম দেওয়া হারাম। অতএব, ইমামের খুতবা চলাকালে যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করবে, তার জন্য সালাম দেওয়া জায়েজ নয় এবং অন্যদের জন্য সে সালামের উত্তর দেওয়াও জায়েজ নয়। (বিন উছাইমীনের ফতোয়াসমগ্র: ১৬/১০০)