কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি

২৬ মে ২০২৬, ১০:১৬ AM , আপডেট: ২৬ মে ২০২৬, ১০:৩২ AM
প্রতীকী এআই ছবি, কুরবানির পশু

প্রতীকী এআই ছবি, কুরবানির পশু © সংগৃহীত

পশু কুরবানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী সুস্থ, নিখুঁত ও নির্দিষ্ট বয়সের পশু নির্বাচন করা। সঠিকভাবে কুরবানি সম্পন্ন করতে পশু কেনা থেকে শুরু করে মাংস বণ্টন পর্যন্ত যে সমস্ত বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। আজ আমরা তা নিয়েই আলোচনা করবো।


পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্কতা 

শারীরিক ত্রুটি : অত্যন্ত দুর্বল, ল্যাংড়া, অন্ধ বা কান ও লেজের বেশিরভাগ অংশ কাটা এমন পশু কুরবানির উপযুক্ত নয়। পশু যেন নিজে হেঁটে জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত যেতে পারে এমন পশুই নির্বাচন করতে হবে কুরবানির জন্য। 
বয়স : বয়স পরিমাপের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো দাঁত দেখে বয়স নিশ্চিত হওয়া। আর কুরবানির ক্ষেত্রে গরু বা মহিষের বয়স হতে হবে ন্যূনতম ২ বছর এবং ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার ক্ষেত্রে বয়স হতে হবে কমপক্ষে ১ বছর।
সুস্থতা : সাধারণত পশু সুস্থ কি-না, তা বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় দেখা যেতে পারে। যেমন; সুস্থ পশুর চোখ উজ্জ্বল, পিঠের কুঁজ টানটান এবং চামড়া মসৃণ থাকে। অপরদিকে কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা পশু হয় অতিরিক্ত অলস বা লালা ঝরা। তাই এসব পশু পরিহার করাই ভালো।


যৌথভাবে কুরবানির ক্ষেত্রে অংশীদার নির্বাচনে সতর্কতা 

নিয়ত যাচাই : মনে রাখতে হবে, কুরবানি করতে হয় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কিন্তু বর্তমানে বহু মানুষ কুরবানি দেয় কেবল লোক দেখানোর জন্য। তাই বড় পশু কুরবানি দেওয়ার উদ্দেশ্যও থাকে মানুষের বাহবা পাওয়া। কাজেই অংশীদারদের সবার নিয়ত যেন একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। কারও মনে লোক দেখানো বা শুধু মাংস খাওয়ার ইচ্ছা থাকলে কুরবানি কবুল হবে না। এটা যদিও কারো চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই, তবুও কথোপকথন বা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তার কুরবানির নিয়ত পরিশুদ্ধ আছে কি-না। অন্যথায় এর প্রভাব শরিকদের সবার কুরবানিতে পড়বে।
বৈধ উপার্জন : কুরবানি হলো মুসলমানদের একটি মহৎ ইবাদাত। তাই এই ইবাদাতের পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থ যদি অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ হয়, সেক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তির পাশাপাশি, শরিকদেরও ইবাদাত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অতএব সব শরিকের টাকা অবশ্যই সম্পূর্ণ হালাল ও বৈধ আয়ের হতে হবে। এর জন্য যাচাই-বাছাই করে শরিক নির্বাচন করা জরুরি। 

পশু জবাইয়ে সতর্কতা ও সদয় আচরণ

জবাইয়ের দোয়া : পশু জবাইয়ের সময় অবশ্যই 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বা কমপক্ষে আল্লাহর নাম নেওয়া ওয়াজিব বা আবশ্যক। ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম না নিলে সেই পশুর মাংস খাওয়া সবার জন্য হারাম হয়ে যাবে।
ধারালো ছুরি : জবাইয়ের জন্য প্রস্তুতকৃত ছুরিটি খুব ভালোভাবে ধার দিয়ে নিতে হবে। যেন জবাইয়ের সময় কুরবানির পশুটি অতিরিক্ত কষ্ট না হয়। এছাড়া এক পশুকে দেখিয়ে বা সামনাসামনি অন্য পশু জবাই করাও অনুচিত। এতে করে প্রাণীরা ঘাবড়ে যায়, এবং ছুটোছুটি করতে শুরু করে।
খাবার ও বিশ্রাম : জবাইয়ের অন্তত ১৫ ঘণ্টা আগে পশুকে শক্ত খাবার দেওয়া বন্ধ রেখে পর্যাপ্ত পানি পান করাতে হবে। এতে করে মাংসের গুণমান ভালো থাকে।
পশুর প্রতি সদয় হওয়া : কুরবানি পশু ক্রয়ের পর বাড়িঘরে যে আমেজ শুরু হয়, এতে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ভুলতে বসি। আর তা হলো— পশুর প্রতি সদয় না হওয়া। অনেকে কুরবানির জন্য নির্বাচিত পশুকে পিটিয়ে আনন্দ পান। মনে রাখতে হবে, কুরবানির জন্য নির্বাচিত পশু আল্লাহর পক্ষ থেকে কবুল হওয়া পশুদের অন্তর্ভুক্ত। তাই হাটে বা বাড়িতে পশুকে কোনো ধরনের শারীরিক আঘাত করা থেকে বিরত থাকুন।

অখাদ্য বা হারাম অংশ
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, হালাল পশুর মাংস খাওয়া বৈধ হলেও প্রবাহিত রক্ত খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম এবং হাদিস অনুযায়ী ৭টি অংশ খাওয়া নিষিদ্ধ বা মাকরূহে তাহরিমি (হারামের কাছাকাছি অপছন্দনীয়)। পশুর বর্জনীয় ও পরিহারযোগ্য অংশগুলো হলো—

প্রবাহিত রক্ত : পশু জবাই করার পর শরীর থেকে যে রক্ত বের হয়, তা খাওয়া পুরোপুরি হারাম। তবে মাংসের সাথে লেগে থাকা রক্ত বা কলিজা-তিলের রক্ত-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। 

হাদিস অনুযায়ী অপছন্দনীয় বা নিষিদ্ধ ৭টি অংশ 
রাসুলুল্লাহ (সা.) হালাল পশুর রক্ত ছাড়া বাকি অংশগুলোর মধ্যে ৭টি জিনিস খাওয়া অপছন্দ করতেন : 
পশুর লিঙ্গ, অণ্ডকোশ, মূত্রথলি, পিত্তথলি- কলিজার সাথে থাকা পিত্ত এবং এর ভেতরের তরল।
গ্ল্যান্ড বা চামড়ার ভেতরের শক্ত গাঁট : পশুর শরীরের চর্বির ভেতরে থাকা ছোট ছোট শক্ত মাংসের গ্রন্থি বা টিউমারের মতো অংশ।
হাঁড় বা মেরুদণ্ডের ভেতরের মগজ (সাদা রগ) : মেরুদণ্ডের হাড্ডির ভেতরে থাকা সাদা রঙের লম্বা রগ বা সুষুম্না কাণ্ড। 

স্বাস্থ্যগত কারণে পরিহারযোগ্য অংশ
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে পশুর কিছু অংশ পরিহার করার জরুরি।
অতিরিক্ত চর্বি : পশুর অতিরিক্ত চর্বি খাওয়া হৃদ্‌রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়।
পাকস্থলী ও অন্ত্রের ময়লা : পশুর ভুঁড়ি বা অন্ত্র ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খেলে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও পেটের রোগ হতে পারে। 

হালাল পশু কুরবানি করলেও সবার এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। বিশেষ করে যারা নিজের পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুত করার কাজে নিজে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন না, তাদের অন্তত সামনে দাঁড়িয়ে থেকে এই ত্রুটিগুলো মুক্ত করা প্রয়োজন। রান্না করার আগেই এই নির্দিষ্ট অঙ্গগুলো আলাদা করে ফেলে দিতে হবে। কুরবানির ক্ষেত্রে এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি। অন্যথায় কুরবানি অপূর্ণ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

মাংস বণ্টনের নিয়ম 

রাসুলের (সা.) হাদিস ও সাহাবিদের আমলের ওপর ভিত্তি করে আলেমরা মাংস তিন ভাগে বণ্টন করাকে মুস্তাহাব বা উত্তম বলেছেন।
প্রথম ভাগ: কোরবানিদাতা এবং তার পরিবারের নিজস্ব খাবারের জন্য রাখা।
দ্বিতীয় ভাগ: ধনী ও দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং প্রতিবেশীদের উপহার হিসেবে দেওয়া।
তৃতীয় ভাগ: অভাবী, অসহায় এবং মিসকিনদের মাঝে সদকা বা দান করা।

তিন ভাগ করা কি বাধ্যতামূলক? 
মাংস তিন ভাগ করা উত্তম, তবে এটি কোনো ফরজ বা ওয়াজিব বিধান নয়। কেউ চাইলে নিজের পরিবারের প্রয়োজনের খাতিরে বেশি মাংস রাখতে পারেন, আবার চাইলে সম্পূর্ণ মাংসই দান করে দিতে পারেন।
ওজনে সমান হওয়া: মাংস বণ্টনের সময় ওজনে একদম নিখুঁতভাবে তিন ভাগ হতেই হবে— এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নিয়ম শরিয়তে নেই।
অংশীদারী কোরবানির ক্ষেত্রে: একাধিক ব্যক্তি মিলে (যেমন গরু বা উটে) শরিকে কোরবানি করলে, নিজেদের মধ্যকার মাংস বণ্টনের সময় অবশ্যই পাল্লা দিয়ে মেপে সমান ভাগে ভাগ করতে হবে। কারণ সেখানে হকের বিষয় জড়িত থাকে। শুধু অনুমান করে ভাগ করা জায়েজ নয়।

মাংস সংরক্ষণের সময়সীমা: ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী কোরবানির মাংস তিন দিনের বেশি সময় ধরে সংরক্ষণ করে রাখাও জায়েজ। ইসলামে মাংস জমিয়ে রাখার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
কসাই বা পারিশ্রমিক হিসেবে মাংস দেওয়া: পশু জবাইকারী বা মাংস প্রস্তুতকারী কসাইকে তার কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির মাংস, চামড়া বা হাড্ডি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাকে পারিশ্রমিক হিসেবে নগদ টাকা দিতে হবে, তবে পারিশ্রমিক দেওয়ার পর চাইলে তাকে উপহার বা সদকা হিসেবে মাংস দেওয়া যাবে।
পশুর চামড়ার বিধান: কোরবানির পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করা যায়। তবে তা বিক্রি করলে, বিক্রয়লব্ধ সম্পূর্ণ টাকা দরিদ্রদের দান করে দিতে হবে, নিজের কোনো কাজে তা ব্যয় করা যাবে না।
অমুসলিমদের দেওয়া: মানবিক কারণে এবং ইসলামের সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট করতে কোনো অভাবী বা প্রতিবেশী অমুসলিমকেও কোরবানির মাংস দেওয়া শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ।

এছাড়া পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত সতর্কতাও জরুরি। যত্রতত্র পশু জবাই না করে সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের নির্ধারিত স্থানে কুরবানি করাই ভালো। এতে করে জবাইয়ের পর পশুর বর্জ্য অপসারণে নির্দিষ্ট লোকবল কাজ করবে এবং পরিবেশ সুন্দর থাকবে। জবাইয়ের পর পশুর রক্ত, গোবর ও অপ্রয়োজনীয় অংশ দ্রুত মাটির নিচে পুঁতে ফেলাই শ্রেয়। এক্ষেত্রে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। অন্যথায় দুর্গন্ধে অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন অনেকে।

খুলনাসহ যে ১৩ জেলায় ৪টার মধ্যে হতে পারে ঝড় ও বজ্রবৃষ্টি
  • ২৬ মে ২০২৬
বিএনপির তরুণ প্রতিনিধিদলে চীন যাচ্ছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে…
  • ২৬ মে ২০২৬
গরুর মাংস কতটুকু খাওয়া নিরাপদ, কী বলছেন পুষ্টিবিদরা
  • ২৬ মে ২০২৬
আলভারেজের রূপকথার উত্থান, এক সিদ্ধান্তেই বদলে যায় ক্যারিয়ার
  • ২৬ মে ২০২৬
বড় নোট লেনদেনে সতর্ক থাকতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আহ্বান
  • ২৬ মে ২০২৬
মাঠে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ গেল কৃষকের
  • ২৬ মে ২০২৬