ঈদের চাঁদ © সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এই আনন্দঘন উৎসব দুটি উদযাপনের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয় পবিত্র আকাশে নতুন চাঁদের আবির্ভাবের ওপর ভিত্তি করে। মূলত ইসলামের সকল ধর্মীয় আচার ও উৎসব হিজরি বা চান্দ্র বর্ষপঞ্জির ওপর নির্ভরশীল। রবিবার সৌদি এবং মধ্যপাচ্যের দেশগুলোসহ বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশে চাঁদ দেখা গিয়েছে। সেই হিসেবে আগামী ২৭ মে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশে সম্ভাব্য ঈদের তারিখ ২৮ মে হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. জুবায়ের মোহাম্মদ এহসানুল হক।
রবিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী বলা যায়, মুসলিম বিশ্বের সকল দেশে ২৭ মে ঈদুল আযহা উদযাপিত হবে। বাংলাদেশের পূর্বে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় ২৭ মে ঈদুল আযহা। সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল দেশে ২৭মে ঈদুল আযহা। এমনকি পাকিস্তানেও ২৭ মে ঈদুল আযহা।
ড. জুবায়ের মোহাম্মদ এহসানুল হক লেখেন, ‘বাংলাদেশ খুব সম্ভবত এ বছর এক বিরাট গৌরবের অধিকারী হতে যাচ্ছে। পৃথিবীর একমাত্র দেশ হিসেবে ২৮ মে ঈদুল আযহা উদযাপন করবে। এমন রেকর্ড নিশ্চয় গৌরবের!’
আরও পড়ুন: একই দিনে সারাবিশ্বে ঈদ পালন প্রসঙ্গে যা জানালেন বায়তুল মোকাররমের খতিব
চাঁদ দেখার প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘মুরব্বিদের মুখে শুনেছি, এককালে পাকিস্তানের চাঁদ দেখার খবরে এখানে ঈদ পালন করা হত। এখন আমরা স্বাধীন, আরেক দেশের চাঁদ দেখার ওপর আমরা কি নির্ভর করতে পারি? এমন প্রশ্নে সম্মানিতগণ নেতিবাচক উত্তর দিয়ে বলবেন, আমাদের এমনটি করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে ঢাকার ধানমন্ডি মসজিদ-উত তাকওয়ার খতিব ও ‘মিডিয়া ব্যক্তিত্ব’ শাইখ মুফতি সাইফুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘চাঁদ দেখা নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন— কোনো জায়গায় চাঁদ দেখা গেল, কোনো জায়গায় দেখা গেল না, এর সমাধান কী হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখো, চাঁদ দেখে রোজা ভাঙো বা ঈদ করো। এখন এই ‘তোমরা’ শব্দের মধ্যে কেউ আঞ্চলিকতাকে বুঝেছেন, আবার কেউ সার্বজনীন বিষয়কে বুঝেছেন। এখানেই মূলত মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
শাইখ মুফতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সেই আলোকে আমরা দেখি, আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে হয়তো চাঁদ দেখা গেছে, কিন্তু আমরা চাঁদ দেখতে পারিনি বলে পালন করতে পারছি না। আসলে দুইটি মতেরই ভালো দিক আছে। তবে আমি মনে করি, বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এর মাধ্যমে চাঁদ দেখা ইত্যাদি বিষয়ে আমরা একটি চমৎকার সিদ্ধান্তে আসতে পারি। কারণ এখন পৃথিবী একটি ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হয়ে গেছে। একসময় কমিউনিকেশন গ্যাপ থাকার কারণে আমরা এটা করতে পারতাম না। এখন যেহেতু সেই গ্যাপ নেই, তাই এটি সম্ভব।’
আরও পড়ুন: ঈদুল আযহার তারিখ ঘোষণা করল সৌদি আরব
তিনি বলেন, ‘তবুও আমি বলব, এটি একটি ফিকহি সমাধান হওয়া উচিত। ব্যক্তিভেদে যেন ভিন্নতা না থাকে। একই ঘরে দেখা গেল একজন মক্কা শরিফের চাঁদ দেখে সবকিছু পালন করছেন, আরেক ভাই বাংলাদেশের চাঁদ দেখে পালন করছেন— এটা আমরা চাই না। এতে সমস্যা তৈরি হয়। আমাদের কথা হলো, রাষ্ট্র এক্ষেত্রে আলেমদের ডেকে একটি ফতোয়া বোর্ড গঠন করুক। সেখান থেকে যদি একটি সার্বজনীন ফতোয়া আসে, তাহলে সেটা ভালো হবে বলে আমি মনে করি।’
এটি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, এটাকে সাংঘর্ষিক বলা যাবে না। কারণ একটা সময় রাওয়ালপিন্ডির চাঁদ দেখে আমরা রোজা রাখতাম, রোজা ভাঙতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্যে ‘তোমরা’ শব্দটিকে কেউ রাষ্ট্রীয় সীমানার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার কেউ বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবাইকে উদ্দেশ্য করেই বলেছেন। সুতরাং যদি সম্ভব হয়, তাহলে যতটা সম্ভব একসঙ্গে চলা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা নিয়ে ওআইসিরও সম্ভবত আশির দশকের একটি রেজুলেশন আছে, গোটা পৃথিবী একটি চাঁদের ভিত্তিতে চলবে। আবার কোরআনে কারিমে নতুন চাঁদ সম্পর্কে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। সে কারণে কেউ কেউ বলেছেন, রাষ্ট্রীয় সীমারেখার ভিত্তিতে চাঁদ আলাদা হতে পারে। তবে আমরা চাই, এ বিষয়ে একটি সুন্দর সমাধান হোক। প্রযুক্তির সঙ্গে যদি আমরা দ্বীনের জ্ঞানকে সমন্বয় করতে পারি, তাহলে আমার মনে হয় একটি সুন্দর সুরাহা বের হয়ে আসবে।’
প্রসঙ্গত, আরবী চান্দ্র বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী প্রতিটি মাস ২৯ বা ৩০ দিনে সম্পন্ন হয়। ফলে সৌর ক্যালেন্ডারের তুলনায় একটি চান্দ্র বছর সাধারণত ১০ থেকে ১১ দিন কম হয়। এই গাণিতিক পার্থক্যের কারণেই প্রতি বছর ঈদ এবং রমজানের তারিখগুলো সৌর ক্যালেন্ডারের হিসেবে ১১ দিন করে এগিয়ে আসে। উদাহরণস্বরূপ, এই বছর সৌর ক্যালেন্ডারের যে তারিখে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে, আগামী বছর তা অন্তত ১১ দিন আগে পালিত হবে।
চান্দ্র বছর অনুসরণের একটি চমৎকার বৈচিত্র্য হলো ঋতু পরিবর্তন। এর ফলে একজন মুমিন তার জীবনে ভিন্ন ভিন্ন মৌসুমে রোজা রাখা এবং হজ পালনের বিরল অভিজ্ঞতা লাভ করেন। হিসাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি একনাগাড়ে ৩৩ বছর রমজানের রোজা পালন করেন, তবে সৌর ক্যালেন্ডারের চক্র অনুসারে তিনি বছরের প্রতিটি মাস এবং প্রতিটি ঋতুতে রোজা রাখার পুণ্য অর্জনের সুযোগ পান। প্রকৃতির এই পালাবদল ইবাদতে যেমন নতুনত্ব আনে, তেমনি মুমিনের ধৈর্য ও নিষ্ঠারও এক অনন্য পরীক্ষা নেয়।