প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
আরবি ভাষায় ফিতরাকে ‘সদকাতুল ফিতর’ বলা হয়, যার অর্থ ‘ঈদুল ফিতরের সদকা’। এটি ঈদুল ফিতরের দিন আদায় করার জন্য প্রবর্তিত, এজন্য একে সদকাতুল ফিতর বলা হয়। ফিতরাকে জাকাতুল ফিতরও বলা হয়। ইসলামে সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব; রাসুল (সা.) ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকল মুসলমানের ওপর এটি আবশ্যক করেছেন।
পবিত্র রমজানের পুরো এক মাস রোজা পালন এবং সংশ্লিষ্ট ইবাদত ও বিধিনিষেধের পর শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে মুসলমানরা ঈদ উদযাপন করেন। এ উৎসবের মধ্যে জামাতে ঈদের নামাজ আদায়, দরিদ্র ও অসচ্ছলদের মধ্যে ফিতরা বিতরণ এবং ভোজ ও আনন্দ আয়োজন অন্তর্ভুক্ত। বিশেষত, ফিতরা বিতরণ ঈদুল ফিতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রমজানের সময়ে কোনো ত্রুটি বা সংযমবিচ্যুতি ঘটলে তা সংশোধন এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষ যাতে উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য দরিদ্র ও অসচ্ছলদের মধ্যে নির্দিষ্ট হারে ফিতরা বিতরণ করা হয়।
প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের জন্য ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব। ফিতরার পরিমাণ আগেই রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ দ্বারা নির্ধারিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী, ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিতরা পরিশোধ করতে হবে। এরপর ঈদগাহ বা বড় মসজিদে জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। ২০২৬ সালে ফিতরার হার নির্ধারিত হয়েছে সর্বোচ্চ ২,৮০৫ টাকা এবং সর্বনিম্ন ১১০ টাকা।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, “রাসুল (সা.) স্বাধীন বা দাস, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সকল মুসলমানের জন্য গম বা খেজুরের এক সা (৩ কেজি ২৭০ গ্রাম) ফিতরা আবশ্যক করেছেন এবং এটি ঈদুল ফিতরের নামাজে যাওয়ার পূর্বে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।” (বুখারি, হাদিস: ১৫০৩)
রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে তারা টানা ৩০ দিন রোজা পালন করেন। প্রতিদিন ভোরের আগে সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে রোজা শুরু হয় এবং সূর্যাস্তের পর ইফতার গ্রহণের মাধ্যমে শেষ হয়। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার থেকে বিরত থাকেন রোজাদাররা।
রোজা কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার নাম নয়; এটি আত্মসংযমের এক অনন্য শিক্ষা। এ সময় মুসলমানরা অশ্লীলতা, মিথ্যা ও অন্যায় কাজ থেকেও দূরে থাকার চেষ্টা করেন। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনই থাকে তাদের মূল লক্ষ্য। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, রোজার এই ইবাদতের প্রতিদান মহান আল্লাহ নিজেই প্রদান করবেন।
রোজার ফজিলত সম্পর্কিত সাতটি হাদিস তুলে ধরা হলো এখানে—
রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ
রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মৃগনাভির সুগন্ধ অপেক্ষা বেশী উৎকৃষ্ট। (বুখারি, হাদিস : ১৯০৪, মুসলিম, হাদিস : ১১৫১, তিরমিজি, হাদিস : ৭৬৪)
ইফতারের আনন্দ
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ। একটি আনন্দ হচ্ছে যখন সে ইফতার করে। আরেকটি হচ্ছে যখন সে প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৭৬৬)
রমজানে জাহান্নাম থেকে মুক্তি
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি ইফতারের সময় এবং রমজানের প্রতি রাতে লোকদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।’ (ইবনে মাজাহ হাদিস : ১৬৪৩)
রোজাদারকে ইফতার করানোর সওয়াব
রোজাদারকে ইফতার করানো অনেক বড় নেক কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার জন্য রোজাদারের প্রতিদান সমান প্রতিদান দেওয়া হবে এবং রোজাদারের প্রতিদান থেকেও কোনো প্রতিদান কমানো হবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)
খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নত
যেকোনো খাবার ইফতারে থাকতে পারে। তবে খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নত। হজরত আনাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) নামাজের পূর্বে তাজা পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না থাকলে যেকোনো খেজুর দিয়ে, আর তাও যদি না থাকত তা হলে কয়েক ঢোক পানি পান করে নিতেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৬৯৬)
রমজানের রোজার প্রতিদান
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানসহ পুণ্যের আশায় রমজানের রোজা পালন করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারি, হাদিস : ৩৮)
ইচ্ছা করে রোজা কাজা করার ক্ষতি
নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো কারণ বা অসুস্থতা ছাড়া রমজানের একটি রোজা পরিত্যাগ করবে— সে যদি ওই রোজার পরিবর্তে আজীবন রোজা রাখে তবু ওই এক রোজার ক্ষতিপূরণ হবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৭২৩)