কুরআন ও হাদিসে বদনজর © সংগৃহীত
মানুষের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই অসুস্থতা অনুভব করে, মন ভারী হয়ে ওঠে কিংবা হঠাৎ বিপর্যয় নেমে আসে। তখন অনেকেই প্রশ্ন করেন এগুলো কি কেবল কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে কোনো অদৃশ্য বাস্তবতা রয়েছে? ইসলামি দৃষ্টিতে এই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর হলো বদনজর।
এটি শুধু লোকাচার নয়; বরং কুরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত একটি বাস্তবতা। ইসলামি স্কলারদের মতে, বদনজর একটি সত্য বিষয়, যার প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য শরিয়তে নির্দিষ্ট দোয়া, আমল ও চিকিৎসা পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে।
কুরআন ও হাদিসে বদনজর
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে (আশ্রয় চাই) যখন সে হিংসা করে” (সূরা ফালাক: ৫)। আলেমদের ব্যাখ্যায়, এখানে হিংসার অন্যতম প্রকাশ হচ্ছে বদনজর। হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে বলেছেন, বদনজর সত্য। যদি কোনো কিছু তাকদীরকে অতিক্রম করত, তবে
বদনজরই তা করত। (সহিহ মুসলিম)।
ইসলামি ঐতিহ্যে বর্ণিত রয়েছে, বদনজর মানুষের সৌন্দর্য, সম্পদ কিংবা সুস্থতার প্রতি অতিরিক্ত মুগ্ধতা ও অন্তরের হিংসা থেকে সৃষ্টি হয়, যা আল্লাহর ইচ্ছায় আক্রান্ত ব্যক্তির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বদনজরের প্রভাব ও বাস্তব উদাহরণ
সহিহ হাদিসে সাহল ইবনে হানীফ (রা.)-এর ঘটনার মাধ্যমে বদনজরের বাস্তব প্রভাবের বর্ণনা পাওয়া যায়। এক সাহাবির প্রশংসাসূচক দৃষ্টির পর তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদনজর প্রদানকারী ব্যক্তিকে গোসল করিয়ে সেই পানি আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ঢালার নির্দেশ দেন। এতে সাহল (রা.) সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
চিকিৎসা কী?
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বদনজরের চিকিৎসা দু’ভাবে করা যায়-
১. কুরআনি ঝাড়ফুঁক (রুকাইয়া):
সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করা এবং নবী (সা.)-এর শেখানো দোয়াসমূহ পড়ে বদনজর থেকে বাঁচা যায়।
২. বদনজর প্রদানকারীর গোসলের পানি:
যদি নির্দিষ্টভাবে জানা যায় কে বদনজর দিয়েছে, তবে তার অযু বা গোসলের পানি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ঢেলে দেওয়া এটি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
আলেমরা স্পষ্ট করে বলেন, বদনজরের চিকিৎসায় কুসংস্কার, তাবিজ বা শরিয়তবিরোধী পদ্ধতির কোনো ভিত্তি নেই।
বদনজর থেকে সুরক্ষার উপায়
অনেকে মনে করেন বদনজর থেকে আগাম সতর্কতা নেওয়া তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী। অথচ আলেমদের মতে, এটি তাওয়াক্কুলেরই অংশ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তাঁর নাতি হাসান ও হোসাইন (রা.)-এর জন্য নিয়মিত বদনজর থেকে আশ্রয়ের দোয়া পড়তেন। এতে প্রমাণ হয় দোয়া, যিকির ও আল্লাহর স্মরণই বদনজর থেকে বাঁচার সর্বোত্তম সুরক্ষা।
আলেমদের অভিমত
বিশিষ্ট ফকিহ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে উছাইমীন (রহ.) বলেন, শরিয়ত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা উভয় দিক থেকেই বদনজর প্রমাণিত সত্য। একে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এর সমাধানও আল্লাহ তাআলাই কুরআন ও সুন্নাহতে বলে দিয়েছেন।
ইসলাম বদনজরকে বাস্তব বলে স্বীকার করলেও ভয় বা কুসংস্কারে আক্রান্ত হওয়ার নির্দেশ দেয়নি। বরং ঈমান, দোয়া ও সুন্নাহসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়াকেই একমাত্র নিরাপদ পথ হিসেবে দেখিয়েছে।[ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব]