পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী © এআই সৃষ্ট ছবি
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলভাবে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) শেষ করেছেন, অথচ পুরো শিক্ষাজীবনে এক দিনের জন্যও কোনো ‘অধ্যাপকের’ সরাসরি ক্লাস করার সুযোগ পাননি— এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। দেশে উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ এমন অনেক বিদ্যাপীঠ থেকে ডিগ্রি নিলেও অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের সান্নিধ্য না পাওয়ার একরাশ আক্ষেপ নিয়ে প্রতি বছর ক্যাম্পাস ছাড়ছেন শত শত শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগেই পদমর্যাদার সর্বোচ্চ স্তরের এমন শিক্ষকের তীব্র সংকটের কারণে অ্যাকাডেমিক গভীরতা ও গবেষণার জায়গাটি অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষার এই সংকটময় চিত্রটি অত্যন্ত প্রকট। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অধ্যাপকই নেই। এছাড়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন করে।
অধ্যাপকহীন ৫টি প্রতিষ্ঠান হলো— চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়), খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আছেন মাত্র দুইজন।
প্রতিষ্ঠার এক দশকেরও বেশি সময় পার হলেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে এখনো কোনো অধ্যাপক নেই। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সদ্য মাস্টার্স শেষ করা শিক্ষার্থী আহাদুল ইসলাম বলেন, ‘পাঁচটি বছর এ ক্যাম্পাসে কাটিয়ে দিলাম। শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছি, কিন্তু একজন অধ্যাপকের অ্যাকাডেমিক নেটওয়ার্ক এবং জীবনদর্শন শিক্ষার্থীদের বড় স্বপ্ন দেখতে শেখায়, যা আমরা পাইনি।’
ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষার এই সংকটময় চিত্রটি অত্যন্ত প্রকট। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অধ্যাপকই নেই। এছাড়া বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন করে।
একই ধরনের আক্ষেপ জানিয়েছেন লোকপ্রশাসন, ইতিহাস এবং মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরাও। মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী প্রিয়া জানান, অন্য বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে কথা বললে বোঝা যায় অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাবে তারা কতটা পিছিয়ে আছেন।
এ সংকট ও শিক্ষার্থীদের আক্ষেপের বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের এ আক্ষেপের কথা আমরা জানি। আমরা অধ্যাপক নিয়োগের জন্য বারবার সার্কুলার দিচ্ছি, কিন্তু বাস্তবতা হলো জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা ঢাকার বাইরে আসতে চান না। পদ খালি থাকা সত্ত্বেও আমরা অভিজ্ঞ শিক্ষক পাচ্ছি না। তবে আমরা অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের পদোন্নতি ও নতুন নিয়োগের মাধ্যমে শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছি।’
ইউজিসির পূর্ণকালীন সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান এ সংকটের জন্য কাঠামোগত ত্রুটি ও বাজেট স্বল্পতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করেই যত্রতত্র নতুন বিভাগ চালু করার ফলে এই শিক্ষক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এছাড়া উচ্চপদস্থ শিক্ষকরা পরিবারের নিরাপত্তা ও সন্তানদের শিক্ষার সুবিধার কারণে ঢাকার বাইরে যেতে আগ্রহী হন না।’ তবে ভবিষ্যতে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দিলে এ সংকট কেটে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আরও পড়ুন: সামনে পরীক্ষা—তুমিও ফেল, ৬ মাস পর আমিও ফেল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম অভিজ্ঞ শিক্ষকদের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে এবং এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের এসব অঞ্চলে আনার জন্য সাধারণ সুযোগ-সুবিধার বাইরে বাড়তি কিছু দেওয়া প্রয়োজন। যদি শিক্ষকদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপ বা উন্নত জীবনযাত্রার বাড়তি সুযোগ নিশ্চিত করা হয়, তবেই হয়ত জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা ঢাকার বাইরে যেতে উৎসাহিত হবেন। একজন প্রভাষক থেকে অধ্যাপক হতে অন্তত ১৫ বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের শূন্যতা কাটাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হচ্ছে।’
ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, কেবল বরিশাল নয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর চিত্রও প্রায় একই রকম। জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের অভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চতর গবেষণায় স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।
মফস্বল শহরে সুযোগ-সুবিধার অভাবে অভিজ্ঞ শিক্ষকরা আসতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায়, শিক্ষার্থীরা এক প্রকার ‘অভিভাবকহীন’ ভাবেই তাদের উচ্চশিক্ষা শেষ করছেন। দ্রুত আকর্ষণীয় প্রণোদনা ও বিশেষ সরকারি সুযোগ নিশ্চিত না করলে, এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় মেধার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।