চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ, গ ও ঘ ইউনিটেও সাফল্য
নিরাপত্তা প্রহরী বাবা ও গৃহিনী মায়ের সঙ্গে ইসরাত। © পরিবারের সৌজন্যে
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার মামুরখাইন গ্রামের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ইসরাতের নীরব সংগ্রাম। ঘরের আলো নিভে আসে, রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। তখন নিরাপত্তাপ্রহরী বাবা আবু বক্কর বেরিয়ে পড়েন রাতভর দায়িত্ব পালনের জন্য। আর তাঁর মেয়ে ইসরাত জাহান তুহিন বসে পড়েন বইয়ের সামনে, নীরবে, খুব সতর্কভাবে।
একদিকে বাবার রাতজাগা পাহারা, অন্যদিকে মেয়ের স্বপ্ন গড়ার প্রস্তুতি। এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হয়েছে এক অনন্য সাফল্যের গল্প। রাত ও দিনের এই পালাবদল, ত্যাগ আর স্বপ্নের মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে তার অর্জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ‘খ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৩৩৪তম স্থান অর্জন করেছেন ইসরাত। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ, গ ও ঘ তিনটি ইউনিটেই সুযোগ পেয়েছেন তিনি। অভাবের সংসার থেকে উঠে আসা এই সাফল্য এখন গর্বের গল্প পুরো এলাকায়।
তিন সন্তানের জনক আবু বক্কর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) পটিয়া শাখার একটি এটিএম বুথে নিরাপত্তাপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ব্যাংকের নিরাপত্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাঁকে। মাসিক বেতন মাত্র ১০ হাজার টাকা।
এই সীমিত আয়ে দুই মেয়ে ও এক ছেলেসহ পাঁচ সদস্যের সংসার চালানো এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
আবু বক্কর বলেন, ‘রাত জেগে আমি ব্যাংকের বুথ পাহারা দিই। মেয়ের মা মেয়ের পড়ালেখার জন্য কত রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছে। যেদিন মেয়ে এসে বলল, ‘বাবা, আমি চান্স পেয়েছি’, সেদিন আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।’
ইসরাত জানালেন, বাবার কষ্টের কথা ভেবেই তিনি পড়াশোনায় ছিলেন খুব সতর্ক। ভোরে ডিউটি শেষে বাবা ঘরে ফেরেন। সারারাত দাঁড়িয়ে পাহারা দেওয়ার পর শরীর থাকে ভীষণ ক্লান্ত। আমি খুব আস্তে আস্তে পড়তাম। বড় করে পড়লে বাবার ঘুম নষ্ট হতে পারে, এই ভয় কাজ করত। কারণ বাবা তো আমার জন্য সারা রাত জেগে থাকেন।
পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ইসরাত ভর্তি হন পটিয়া বাসস্টেশন মোড়ের সিনার্জি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে। তবে কোচিং ফি ও পড়াশোনার খরচ জোগাড় করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এই সময় পাশে দাঁড়ান কোচিং শিক্ষক তানভীর আহমেদ। তিনি আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ইসরাতকে দেন মানসিক প্রেরণাও।
ইসরাত বলেন, ‘তানভীর স্যার আমাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। শুধু তা-ই নয়, যখনই মনে হয়েছে আমি হয়তো পারব না, তখন স্যার আমাকে সাহস দিয়েছেন। তার সহযোগিতা ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না।’
আবু বক্কর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের হেড অফিসের ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেনের কথা। ‘স্যার আমার কষ্ট বুঝেছেন। বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করেছেন। এমন সহানুভূতিশীল মানুষ পাশে না থাকলে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতো’ বলেন আবু বক্কর।
আর্থিক সংকট ইসরাতকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কোচিংয়ে যাতায়াতের খরচ বাঁচাতে কখনো অর্ধেক পথ হেঁটে যেতে হয়েছে, কখনো বান্ধবীদের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে। তবু লক্ষ্য ছিল একটাই, ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করা।
ইসরাত বলেন, ‘আমি জানতাম বাবা কত কষ্ট করছেন। তাই ঠিক করেছিলাম, যেভাবেই হোক বাবার স্বপ্ন পূরণ করব। আমার জীবনের লক্ষ্য শিক্ষকতা করা। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, এর মাধ্যমে মানুষের সেবা করা যায়।’
ইসরাতের শিক্ষক তানভীর আহমেদ বলেন, ‘ইসরাত অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। তার পারিবারিক অবস্থা বিবেচনায় আমরা চেয়েছি, অর্থ যেন তার পথে বাধা না হয়। সে শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো পরিবারের জন্য লড়াই করেছে।’
ইউসিবিএল ব্যাংকের প্রধান শাখার ম্যানেজার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ’আবু বক্কর আমাদের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। তার মেয়ের এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। আমি চাই, সে জীবনে আরও বড় হোক।’
উল্লেখ্য, ইসরাত জাহান তুহিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় 'খ' ইউনিটে ৬৩৩ তম, ‘গ’ ইউনিটে ৩৭১ ও 'ঘ' ইউনিটে ৬৮২ তম স্থান অর্জন করেছে।