বেসরকারি হাসপাতাল
প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ বা হাসপাতালে এন্ট্রি লেভেলে চিকিৎসকদের বেতন ৯ম গ্রেডের মূল বেতনের ৯০ ভাগ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে বেতন কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ক্ষেত্রে বিকল্প আরও দুটি প্রস্তাবনা রয়েছে। প্রস্তাবনা রয়েছে বাড়িভাড়া, উৎসব ও চিকিৎসা ভাতা এবং চিকিৎসকদের ছুটি, কর্মঘণ্টা ও প্রণোদনা নিয়েও।
আজ বুধবার (১৫ জুলাই) স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর কাছে এই সুপারিশ প্রেরণ করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ এবং হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এন্ট্রি লেভেলে চিকিৎসকদের বেতন কাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে তিনটি পদ্ধতি প্রস্তাব করেছে কমিটি। এর মধ্যে প্রথমটি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের প্রভাষক নিয়োগের উপযুক্ত নিয়মিত বা পূর্ণকালীন পদ্ধতি। অপর দুটি পদ্ধতি প্রভাষকদের ক্ষেত্রে কার্যকর করা যাবে না। এর একটি সাকূল্য বা ফিক্সড বেতন পদ্ধতি এবং অপরটি ঘণ্টাভিত্তিক বা রোস্টার ডিউটি পদ্ধতি।
কমিটি বলছে, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন, ২০২২-এর অনুচ্ছেদ-১৭তে প্রত্যেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ বা ডেন্টাল কলেজে সরকারের অনুমোদনক্রমে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য উপযুক্ত বেতন কাঠামো প্রণয়ণের বিধান রয়েছে। এটিকে স্ট্যান্ডার্ড কাঠামো ধরে নিয়মিত বা পূর্ণকালীন মেডিকেল অফিসার অথবা প্রভাষকদের মূল বেতন ২০১৫ সালের পে-স্কেল বা নবম বেতন কাঠামোর নবম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতনের ন্যূনতম ৯০ শতাংশ নির্ধারণ করা যেতে পারে। আর নতুন বেতন স্কেল ঘোষিত হলে সে অনুযায়ী এই বেতন-ভাতা আনুপাতিক হারে সমন্বয় করতে হবে।
এই পদ্ধতিতে বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের জন্য নবম গ্রেডের মূল বেতনের ৫৫ শতাংশ; চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ, বগুড়া, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এবং সাভার পৌর এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের জন্য নবম গ্রেডের মূল বেতনের ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য স্থানের জন্য নবম গ্রেডের মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। আর চিকিৎসা ভাতার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে এক হাজার টাকা।
এর বাইরে বাৎসরিক দুটি উৎসব ভাতা নবম গ্রেডের মূল বেতনের সমপরিমাণ, বৈশাখী ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এক বছর অতিক্রমের পর প্রতি অর্থবছরে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দিতে হবে বলেও সুপারিশে বলা হয়েছে।
কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি অনেক প্রতিষ্ঠানেই এগুলো কার্যকর করা হয় না। আমরা এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছি। তবে সবক্ষেত্রে আমাদের সকল স্টেকহোল্ডারের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়েছে। একদিকে যেমন চিকিৎসকদের দিকটি দেখতে হয়েছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থও দেখতে হয়েছে, কারণ এগুলো তো কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়— অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন, কমিটির আহ্বায়ক ও মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর
দ্বিতীয় পদ্ধতির ক্ষেত্রে কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, চিকিৎসকদের সুবিধার্থে মূল বেতন, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার যোগফল সাকুল্যবেতন হিসেবে প্রদান করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩৫ হাজার, অন্যান্য জেলা শহরে ৩৩ হাজার এবং উপজেলায় ৩০ হাজার টাকা সাকুল্য বেতন হিসাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে উৎসব ভাতা হিসাবে বছরে দুটি উৎসবে মোট বেতনের দুই তৃতীয়াংশ উৎসব ভাতা হিসেবে প্রদান করতে হবে এবং বৈশাখী ভাতা হিসেবে মূল বেতনের ২০ শতাংশ প্রদান করতে হবে।
তৃতীয় পদ্ধতিতে অনিয়মিত ও খণ্ডকালীণ চিকিৎসকদের জন্য প্রস্তাবিত সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা হিসেবে ডিউটি রোস্টার গণ্য করে প্রতি ডিউটির জন্য দিবাকালীন সময়ে ১ হাজার ২৫০ এবং নৈশকালীন সময়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করতে হবে।
বেতন-ভাতা ছাড়াও বেতনকাঠামো প্রণয়ন কমিটির সুপারিশে চিকিৎসকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়েও বলা হয়েছে। সুপারিশ অনুযায়ী, হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেডিকেল কলেজ বা ডেন্টাল কলেজে এন্ট্রি লেভেলে কর্মরত চিকিৎসকদের চাকরির শুরুতে নিয়োগপত্র প্রদান করা বাধ্যতামূলক হবে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সকল এন্ট্রি লেভেলের চিকিৎসকদের জন্য চাকরিকালীন ডিউটির সময় সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা নির্ধারিত হবে।
কমিটির সুপারিশমালায় সকল চিকিৎসকের সরকারি ছুটি নিশ্চিত করার প্রস্তাবনা রয়েছে। যদি কোন কারণে সরকারি ছুটির দিনে ছুটি প্রদান না করা যায়, তবে পরবর্তীতে তা সমন্বয় করতে হবে বলেও সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সকল ধরনের বেতন-ভাতা ব্যাংকিং চ্যানেল অথবা ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে।
অংশীজনদের কিছু কনসার্ন ছিল। এই বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা হলে কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে তাদের সংশয় রয়েছে। মাঠপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু মানবে তা বলা মন্ত্রণালয়ের জন্যও মুশকিল। তবে এই কাঠামো একবার নির্ধারণ হয়ে গেলে চিকিৎসকরা নিজেরাও সচেতন হতে পারবে যে কোন কোন সুযোগ-সুবিধা না পেলে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাওয়া ঠিক হবে না— কমিটির একজন সদস্য
নন-প্র্যাকটিসিং বিষয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রণোদনা এবং প্রসূতি চিকিৎসকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে প্রস্তাবনা রয়েছে কমিটির সুপারিশে। প্রণোদনার ক্ষেত্রে বেসিক সাবজেক্টের শিক্ষকদের আগ্রহী করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্নকারীদের প্রণোদনা হিসেবে বেসিকের ৫০% নন-প্র্যাকটিসিং ভাতা দেওয়া যেতে পারে বলে মত দেওয়া হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে আগ্রহী শিক্ষককে ৩০০ টাকা মূল্যমানের ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে কলেজের শিক্ষকতা ব্যতীত অন্য কোন পেশায় নিয়োজিত হবেন না মর্মে অঙ্গীকারনামা প্রদান করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে যদি কোনো চিকিৎসকের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চাকরি এক বছরের বেশি এবং নিয়মিত হয়, তবে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এন্ট্রি লেভেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের বেতন কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে গঠিত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সুপারিশে তিনটি পদ্ধতির কথা বলা হলেও পূর্ণকালীন নিয়োগের ক্ষেত্রে দুটি বিকল্পের কথা বলা হয়েছে। আর একটি খণ্ডকালীন চিকিৎসকদের জন্য। অংশীজনদের মতামত নিয়েই আমরা চেষ্টা করেছি ভালো একটি কাঠামো প্রস্তুত করতে।
তিনি বলেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের আইন অনুযায়ী তাদেরকে বেতন নির্ধারণের এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা যে সুপারিশ করেছি, এর মাধ্যমে বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলো এই বেতন-কাঠামোর নিচে কোনো বেতন নির্ধারণ করতে পারবে না।
কমিটির এই সদস্য আরও বলেন, অংশীজনদের কিছু কনসার্ন ছিল। এই বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা হলে কতটুকু বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে তাদের সংশয় রয়েছে। মাঠপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু মানবে তা বলা মন্ত্রণালয়ের জন্যও মুশকিল। তবে এই কাঠামো একবার নির্ধারণ হয়ে গেলে চিকিৎসকরা নিজেরাও সচেতন হতে পারবে যে কোন কোন সুযোগ-সুবিধা না পেলে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাওয়া ঠিক হবে না।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক ও কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বর্তমানে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এন্ট্রি লেভেলে চিকিৎসকদের কোনো সুস্পষ্ট বেতন কাঠামো নেই। আমরা একটি সুপারিশ করেছি। এখন মন্ত্রণালয় কতটুকু চূড়ান্ত করবে সেটি তাদের বিষয়।
তিনি বলেন, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি অনেক প্রতিষ্ঠানেই এগুলো কার্যকর করা হয় না। আমরা এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছি। তবে সবক্ষেত্রে আমাদের সকল স্টেকহোল্ডারের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়েছে। একদিকে যেমন চিকিৎসকদের দিকটি দেখতে হয়েছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বার্থও দেখতে হয়েছে, কারণ এগুলো তো কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। তবুও আমরা যে সুপারিশ করেছি, তা উভয় পক্ষকে সুযোগ দেবে বলে আমরা আশা রাখি।
উল্লেখ্য, ইন্টার্ন ও পোস্টগ্রাজুয়েশন ট্রেইনি চিকিৎসকদের আন্দোলনের মুখে গত ৮ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সভাকক্ষে তাদের সঙ্গে বসেন স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেন ছিলেন। ওই মতবিনিময় সভায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে চিকিৎসকদের বেতন কাঠামো প্রণয়নে এই কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে ৯ জুন এই কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
কমিটিতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল হোসেনকে আহ্বায়ক এবং পরিচালক (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) ডা. মো. মাছুদুর রহমানকে সদস্যসচিব করা হয়। সদস্যদের মধ্যে আরও রয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্মসচিব (বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা) মো. মহসীন, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্মসচিব (চিকিৎসা শিক্ষা) মল্লিকা খাতুন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. এএইচএম মঈনুল আহসান।
সূত্রমতে, বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে এই কমিটি গত ১৪ জুন, ১৭ জুন ও ৭ জুলাই তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ, অংশীজনদের মতামত গ্রহণ এবং পর্যালোচনা ও মতামত বিশ্লেষণ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছে।