ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান © সংগৃহীত
দেশে সরকারি পর্যায়ে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ শনিবার (১১ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রাম থেকে অধিক সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসার জন্য যেন ঢাকায় আসতে না হয়, সেজন্য সরকার জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ সময় সিনিয়র চিকিৎসকদের প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে সেবা দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ৫১ বেডের হাসপাতালগুলো ১০০ বেডে উন্নিত করা হবে। সরকারি চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায়।
এর আগে, সকালে ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তার আগমনকে ঘিরে সকাল থেকেই ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জুবাইদা রহমান।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘২০ হোস্টেল প্রকল্প’-এর আওতায় দুটি ছাত্রী হোস্টেলের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, একজন চিকিৎসকের আন্তরিক পরামর্শ ও মানবিক ব্যবহার অনেক সময় ওষুধের মতোই কার্যকর হয়ে ওঠে। সুতরাং একজন চিকিৎসকের জন্য পেশাগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও সমান জরুরি।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসক, নার্স ও সকল স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর বিদ্যমান শূন্যপদ দ্রুত পূরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’— এই নীতিতে সরকার স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ কিংবা ক্যান্সারের মতো বিষয়ে আগেভাগেই স্বাস্থ্যসম্মত পরামর্শ পেলে রোগের নিরাময় অনেক সহজ হয়ে যায়। সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক রোগ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করা সম্ভব।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ হবেন নারী স্বাস্থ্যকর্মী, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন। একটি সুস্থ জাতি শুধু হাসপাতাল দিয়ে গড়ে ওঠে না; বরং পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ, নিরাপদ খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল জীবনাচরণের ওপর শারীরিক সুস্থতার অনেকখানি নির্ভর করে।
প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকার দেশের সব উপজেলায় বর্তমানে বিদ্যমান ৩১ থেকে ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি সব হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার হাসপাতালের ভবন নির্মাণ করে দিতে পারে। সরকার স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে পারে। প্রয়োজনীয় আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামও সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু একটি মানবিক, দক্ষ ও সেবামুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ইতোমধ্যেই বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছেও সহজলভ্য হবে।
এ সময় মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার দিকে আলোকপাত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানসম্মত নিষ্পত্তি ও অপসারণ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আসুন আমরা সবাই মিলে মেডিক্যাল বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে অপসারণ করি এবং হাসপাতালগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করি।
তিনি বলেন, আজকের শিক্ষার্থী ও ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা একদিন বন্ধ হবে—এই প্রত্যাশা রাখি।