ওয়ান হেলথ ট্রাস্ট-আইসিডিডিআর,বির পলিসি ব্রিফ
দেশে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করার হার দিনদিন বাড়ছে © সংগৃহীত
দেশে টিকাদানের ক্রমবর্ধমান ঘাটতির কারণে সাধারণ রোগের সংক্রমণ বাড়ছে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ (এএমআর) বা অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপের (গার্প) উদ্যোগে ওয়ান হেলথ ট্রাস্ট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) যৌথভাবে প্রকাশিত একটি নতুন পলিসি ব্রিফে এই আশঙ্কাজনক তথ্য জানানো হয়েছে।
পলিসি ব্রিফে বলা হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলতি মে মাস পর্যন্ত দেশব্যাপী ৫১ হাজার ৫০০-এরও বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৩৫০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদানে বিঘ্ন ঘটা এবং কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্যাকসিনের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার কারণে যে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তারই ফল এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব।
প্রতিবেদনে বৈশ্বিক ও জাতীয় তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে এএমআরের কারণে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বাংলাদেশে এই নীরব ঘাতকের রূপ আরও ভয়াবহ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২১ সালেই বাংলাদেশে ৯৬ হাজার ৮৭৮ জন মানুষের মৃত্যু এএমআর বা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সাথে সম্পৃক্ত ছিল, যার মধ্যে ২৩ হাজার ৪৫৪টি মৃত্যুর জন্য সরাসরি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্স দায়ী ছিল।
অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী এবং গার্প-বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. ওয়াসিফ আলী খান বলেন, ভ্যাকসিন কেবল রোগ প্রতিরোধের হাতিয়ার নয়, বরং এটি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর অন্যতম শক্তিশালী ও সাশ্রয়ী মাধ্যম। টিকাদানের মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকানো গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমে আসে এবং প্রতিরোধী সুপারবাগ বা জীবাণু তৈরি হতে পারে না। হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও দশকের পর দশক ধরে অর্জিত জনস্বাস্থ্য খাতের সাফল্যকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
ওয়ান হেলথ ট্রাস্টের পার্টনারশিপ ডিরেক্টর ড. এরতা কালানক্সি বলেন, এএমআর মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী এতদিন শুধু নজরদারির (Surveillance) ওপর জোর দেওয়া হলেও, এখন প্রতিরোধব্যবস্থাকে (Prevention) মূল কৌশলে রূপান্তর করতে হবে।
দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে অনুষ্ঠানে তিনটি সুনির্দিষ্ট ভ্যাকসিনের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো— নিউমোকোকাল কনজুগেট ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করে এটিকে আরও উন্নত ও উচ্চ-ভ্যালেন্ট ফর্মুলেশনে রূপান্তর করা, টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিনকে দেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিশুদের ডায়রিয়া ও মারাত্মক সংক্রমণ ঠেকাতে রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন চালুর প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা।
বিশেষজ্ঞরা দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের মানুষের পকেটের চিকিৎসা খরচ (যা বর্তমানে মোট ব্যয়ের ৭০%) কমাতে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ধরে রাখতে জাতীয় স্বাস্থ্য কৌশলে টিকাদান কর্মসূচিকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে।