আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল © সংগৃহীত
রাজধানীর বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠান প্রধানের ‘পলাতক অবস্থা’য় বেতন-ভাতার অনিয়মই ‘নিয়ম’ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। চিকিৎসক ও নার্সরা আন্দোলন করে বেতন আদায় করে নিলেও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের ধুঁকছেন ভুক্তভোগী হিসেবে।
বিশেষ করে সিকিউরিটি গার্ড, অ্যাটেনডেন্ট, ওয়ার্ডবয়সহ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু কর্মচারীর সর্বশেষ গত বছরের অক্টোবর মাসের বেতন ছাড় হলেও সেটি পেয়েছেন গত জানুয়ারি মাসে। একইভাবে সেপ্টেম্বর মাসের বেতন হয়েছে গত ডিসেম্বরে। এই অনিয়মকে ‘নিয়ম’ ধরে ফেব্রুয়ারির ২৩ দিন পরও মেলেনি নভেম্বরের বেতন-ভাতা। তবে কিছু কর্মচারীর ক্ষেত্রে এই অনিয়ম ৫ থেকে ৭ মাসও ছাড়িয়েছে।
আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ার হোসেন খান একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি ‘পলাতক’। যদিও প্রায় প্রকাশ্যেই প্রতিষ্ঠানটিতে অফিস করছেন তিনি। তার মালিকানাধীন বেসরকারি এ হাসপাতালের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) ঋণ রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার। যার প্রায় সবটাই খেলাপি।
কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠানটির বেতন-ভাতার অনিয়ম চরম আকার ধারণ করলে চিকিৎসক ও নার্সরা আন্দোলন শুরু করেন। তাদের আন্দোলনের মুখে এ দুই শ্রেণির কর্মকর্তার বেতন নিয়মিত হয়। যদিও বেতন প্রদানের নির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণ অনুসরণ করা হয় না। প্রতিষ্ঠানটিরতে তৃতীয় শ্রেণির ল্যাব টেকনিশিয়ানসহ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা সংখ্যায় তুলনামূলক কম। ‘আন্দোলনের শক্তি’ না থাকায় বেতন-ভাতা ঠিকঠাক আদায় করতে পারছেন না তারা।
তবে এসব কর্মচারীর কোনো কোনো অংশ নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। ফলে দ্বিধাবিভক্তি রয়েছে কর্মচারীদের মধ্যে। এ ছাড়া চাকরিচ্যুতির ভয়ে আন্দোলনেও নামতে চান না তারা। একই কারণে গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করতে চান না এসব কর্মচারী। মেডিকেলটির ইনডোন ফার্মেসিতে কর্মরত একজন কর্মচারী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গত বছরের অক্টোবর মাসের বেতন পেয়েছি এ বছরের জানুয়ারির ১৫ তারিখে। আর সেপ্টেম্বরের বেতন পেয়েছি ডিসেম্বরের ১১ তারিখ। এ হিসেবে এ মাসে অন্তত নভেম্বর মাসের বেতন পাওয়ার কথা। কিন্তু আজ ২৩ তারিখেও সেটা পাইনি।
তিনি বলেন, শুধু বেতনেই অনিয়ম নয়, গত ঈদের বোনাসটাও পাইনি। এখানে সব কিছু একেবারে হাসপাতাল মালিক পক্ষের মনমর্জি মতো চলছে। যখন ইচ্ছা হয়, তখন দেয়। কোনো রুটিন, রুলস কিছু নেই। অসুস্থতার ছুটি নিলেও সে সময়ের বেতন কেটে রাখা হয়। এ ছাড়া বরাদ্দ বার্ষিক ছুটিও কমিয়ে ফেলা হয়েছে। গত বছরের ২০ দিনের ছুটি কমিয়ে করা হয়েছে ১৫ দিন।
শুধু বেতন-ভাতায় অনিয়মই নয়, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ইনক্রিমেন্টও বন্ধ রয়েছে বলে জানালেন এই কর্মচারী। তিনি বলেন, অনেকে ১৫-২০ বছর ধরে এখানে চাকরিতে রয়েছেন। কিন্তু তাদের ইনক্রিমেন্ট হয় না। গত ২-৩ বছর ধরে এই ইনক্রিমেন্ট বন্ধ আছে। এমনকি নিয়োগের সময়ে কোনো নিয়োগপত্রও দেওয়া হয় না। স্যালারি চাইলে বলে, চাকরি করলে করো না হলে চলে যাও।
ফার্মেসিতে কর্মরত আরেক কর্মচারী বলেন, যারা আন্দোলন করে আদায় করতে পারে, তারা বেতন নিয়ে যায়। যারা আন্দোলন করতে পারে না, তারা আদায় করতে পারে না। বিশেষ করে সিকিউরিটি, অ্যাটেনডেন্ট, ওয়ার্ডবয়দের এ সমস্যা বেশি। গত বছর নার্স এবং চিকিৎসকরা আন্দোলনের পর তাদের মীমাংসরা করে ফেলা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন কর্মচারী বলেন, মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বেতন অনিয়ম হয়ে গেছে। আগে কিছু অনিয়ম থাকলেও অভ্যুত্থানের পর থেকে বিষয়টি একেবারে ‘নিয়মিত’ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সঙ্গেই বৈষম্য করা হয় বেশি। চিকিৎসক-নার্সরা হাই-প্রোফাইল, তাদের বেতন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন আটকিয়ে রাখা হচ্ছে।
অপর এক কর্মচারী বলেন, কোনো কর্মচারীই ভয়ে মুখ খুলতে চায় না, কারণ চাকরি চলে যাবে। চাকরি চলে গেলে অনেকের অন্য জায়গায় আবেদনের সুযোগও নাই। কারণ হাসপাতালটিতে কর্মরতদের মধ্যে তরুণ বয়সী খুব কম, বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষ। বাধ্য হয়ে পরিবার-পরিজনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় এখানে। কিন্তু ন্যায্যতা, নাগরিক অধিকার, শ্রমজীবীর যে ন্যূনতম অধিকার, সেটি পাওয়া যায় না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাবেক এমপি আনোয়ার হোসেন খানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ কর্মকর্তা বেলাল হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা প্রত্যেক মাসেই বেতন দিচ্ছি। কারো যদি নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তারা যেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানায়। তাহলে সমাধান করে দেওয়া যাবে।
একই কথা হাসপাতালের উপ-মহাব্যবস্থাপক মীর মোহাব্বত সুমনেরও। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কেউ বেতন পাচ্ছে না এরকম কিছু আমার জানা নেই। সবাই কমবেশি বেতন পাচ্ছে। ‘কমবেশি’ কী রকম— জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিদিনই স্যালারি যাচ্ছে। নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির বেতন চলে গেছে। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন-বোনাসও আমরা হিসাব করে ফেলছি।