জলাতঙ্ক রোগ © সংগৃহীত
ভারতের উত্তর প্রদেশের মির্জাপুরের ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের শরীরে জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও সুস্থ হয়ে উঠেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বিরল এই ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, জলাতঙ্কের স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও কি কেউ বেঁচে ফিরতে পারে? চিকিৎসকেরা বলছেন, এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। তবে এই ঘটনাকে কোনোভাবেই জলাতঙ্কের নতুন বা কার্যকর চিকিৎসা আবিষ্কারের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মির্জাপুরের ওই কিশোরের নাম করণ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি পথকুকুর তাকে কামড় দেয়। এরপর সে জলাতঙ্কের টিকার দুটি ডোজ নিয়েছিল বলে জানা গেছে। কিন্তু পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে তার শরীরে জলাতঙ্কের গুরুতর কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। পানির প্রতি ভয় বা পান করতে না পারা, অতিরিক্ত লালা পড়া এবং অস্বাভাবিক শব্দ করার মতো লক্ষণ দেখা যায় তার মধ্যে। এরপর পরিবার তাকে বারাণসীর একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়।
সেখানে ২২ দিন ধরে তার চিকিৎসা চলে বলে জানা গেছে। তাকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। নিয়মিত পাঁচটি টিকার পাশাপাশি আরও দুটি বিশেষ ডোজ দেওয়া হয়েছিল। সব মিলিয়ে তাকে সাতটি ইনজেকশন দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসার পর তার সংক্রমণ কমে আসে এবং সে পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে পায়। ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়। পরে সে আবার স্কুলে ফিরেছে বলেও জানা গেছে।
এই ঘটনা সামনে আসার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও কি কেউ জলাতঙ্ক থেকে বেঁচে ফিরতে পারে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, জলাতঙ্কের ক্লিনিক্যাল বা স্পষ্ট উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর রোগটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী। তবে বিশ্বজুড়ে খুব অল্পসংখ্যক রোগী এই অবস্থার পরও বেঁচে ফিরেছেন। তাদের অনেকেই আবার গুরুতর স্নায়বিক জটিলতায় ভুগেছেন।
এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শারদাকেয়ার-হেলথসিটির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের পরিচালক চিকিৎসক চিরাগ ট্যান্ডন বলেন, এমন সুস্থ হয়ে ওঠার ঘটনা ‘একটি অসাধারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ঘটনা’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে এটিকে জলাতঙ্ক সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণা বদলে যাওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর জলাতঙ্ক কেন সাধারণত প্রাণঘাতী?
জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা মূলত স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। শরীরে প্রবেশের পর ভাইরাসটি স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডে পৌঁছাতে পারে। একবার এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে ক্লিনিক্যাল উপসর্গ তৈরি করলে মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের অন্যান্য অংশে গুরুতর প্রদাহ ও ক্ষতি হতে পারে।
জলাতঙ্কের শুরুর দিকে জ্বর, দুর্বলতা, ব্যথা কিংবা যে জায়গায় প্রাণী কামড়েছে সেখানে অস্বাভাবিক ঝিনঝিন বা জ্বালাপোড়া হতে পারে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির প্রতি ভয়, অস্থিরতা, বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন, অস্বাভাবিক নড়াচড়া, গিলতে সমস্যা, পক্ষাঘাত এবং শ্বাসকষ্টের মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসক ট্যান্ডন জানান, পানির প্রতি ভয়, বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, দুর্বলতা, পক্ষাঘাত, অস্বাভাবিক নড়াচড়া বা শ্বাসকষ্টের মতো গুরুতর স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর জলাতঙ্কের জন্য নির্ভরযোগ্যভাবে কার্যকর কোনো নিরাময়মূলক চিকিৎসা নেই।
এ অবস্থায় রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রেখে শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তসঞ্চালন এবং শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করা যায়। তবে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তখনও অত্যন্ত কম থাকে।
তাহলে কি উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও কেউ জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে পারে?
হ্যাঁ, পারে। তবে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। বিশ্বজুড়ে জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর বেঁচে যাওয়া অল্পসংখ্যক রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কেউ কেউ নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ হয়েছেন।
তবে কোন রোগী বেঁচে যাবেন আর কে বাঁচবেন না, চিকিৎসকেরা তা নির্ভরযোগ্যভাবে আগে থেকে বলতে পারেন না। একইভাবে একজন রোগী কেন বেঁচে যান, অথচ অন্য একজন মারা যান—সেটিও এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।
চিকিৎসক ট্যান্ডন জলাতঙ্ক থেকে বেঁচে যাওয়া সবচেয়ে পরিচিত ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে ২০০৪ সালের জিনা গিজের কথা উল্লেখ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ বছর বয়সী এই কিশোরী জলাতঙ্কের ক্লিনিক্যাল উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও বেঁচে গিয়েছিলেন।
তাঁর চিকিৎসায় যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি পরে ‘মিলওয়াকি প্রোটোকল’ নামে পরিচিত হয়। এই পদ্ধতিতে নিবিড় সহায়ক চিকিৎসার পাশাপাশি এমন কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যেগুলো সংক্রমণের সময় মস্তিষ্ক ও শরীরকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল।
তবে মিলওয়াকি প্রোটোকলকে ক্লিনিক্যাল জলাতঙ্কের নির্ভরযোগ্য কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে এখনো প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসকেরা এখন নিশ্চিতভাবে রোগ সারিয়ে তুলতে পারেন—এমন অর্থও এই পদ্ধতির ব্যবহার থেকে পাওয়া যায় না।
মির্জাপুরের কিশোরের ঘটনা কেন অস্বাভাবিক?
মির্জাপুরের কিশোরের সুস্থ হয়ে ওঠার ঘটনাটি অস্বাভাবিক। কারণ, তার শরীরে ক্লিনিক্যাল জলাতঙ্কের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু উপসর্গ দেখা দিয়েছিল বলে জানানো হয়েছে।
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পথকুকুরের কামড়ের পর তার পানির প্রতি ভয়, অতিরিক্ত লালা পড়া এবং অস্বাভাবিকভাবে শব্দ করার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কোনো ঘটনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা-তথ্য খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে রোগের শুরুর দিকে জলাতঙ্ক নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
ওই কিশোরের টিকা নেওয়ার ইতিহাস, পরীক্ষাগারের রিপোর্ট, শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রা, চিকিৎসার নথি এবং ঠিক কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল—সবকিছুই বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এই কারণেই একটি ব্যতিক্রমী সুস্থ হয়ে ওঠার ঘটনা থেকে জলাতঙ্কের নতুন কোনো চিকিৎসা আবিষ্কারের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। চিকিৎসক ট্যান্ডনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঘটনাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অবশ্যই অসাধারণ। কিন্তু এর মাধ্যমে উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর জলাতঙ্কের ভয়াবহতার প্রচলিত ধারণা বদলে যায় না। ক্লিনিক্যাল উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও জলাতঙ্ক প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী।
জলাতঙ্ক প্রতিরোধই কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণী কামড় বা আঁচড় দেওয়ার পর কখনোই উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়।
অন্যান্য অনেক সংক্রমণের তুলনায় জলাতঙ্কের একটি বড় পার্থক্য হলো, আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে এটি খুব কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়। এই চিকিৎসাকে পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা পিইপি বলা হয়।
পিইপির মধ্যে ক্ষত পরিষ্কার করা, জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি দেওয়ার মতো চিকিৎসা থাকতে পারে।
কোনো প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে, বিশেষ করে প্রাণীটির জলাতঙ্ক থাকার সম্ভাবনা থাকলে, সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থানে সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।
ক্ষত ছোট হলেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা নিতে হবে। কামড়ের ধরন ও ঝুঁকি অনুযায়ী র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিরও প্রয়োজন হতে পারে।
প্রাণীটির মধ্যে পরে জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দেয় কি না, সেটি দেখার জন্য চিকিৎসা নিতে দেরি করা উচিত নয়। একইভাবে ক্ষতস্থানে ঘরোয়া কোনো উপাদান বা এমন কোনো পদার্থ ব্যবহার করা উচিত নয়, যা ক্ষতকে আরও জ্বালাপোড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কুকুরকে টিকা দিলেও ঠেকানো যায় জলাতঙ্ক
জলাতঙ্ক প্রতিরোধের কাজ শুধু মানুষের চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাণীদের মধ্যে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসক ট্যান্ডন বলেন, ‘প্রতিরোধের জন্য কুকুরকে টিকা দেওয়ার ওপরও অনেকটাই নির্ভর করতে হয়, কারণ বিশ্বজুড়ে মানুষের জলাতঙ্কের অধিকাংশ সংক্রমণের জন্য কুকুরই দায়ী।’
তাই কুকুরকে নিয়মিত টিকা দেওয়া মানুষের মধ্যে জলাতঙ্কের সংক্রমণ ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি।
চিকিৎসক ট্যান্ডন আরও বলেন, ‘উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর জলাতঙ্ক থেকে বিরলভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অসাধারণ। তবে এই ঘটনা যেন মানুষকে মিথ্যা আশ্বস্ত না করে। জলাতঙ্ক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি, যেখানে সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্পূর্ণ সুরক্ষা এবং প্রায় নিশ্চিত প্রাণঘাতী রোগের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে।’
তাই কোনো প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই জলাতঙ্ক থেকে বাঁচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।