প্রতিকী ছবি © সংগৃহীত
রান্নাঘরের তাকে থাকা সব খাবার দীর্ঘদিন পরও নিরাপদ থাকে এমনটা ভাবার কারণ নেই। কোনো খাবারের প্যাকেটে লেখা মেয়াদ শেষের তারিখ পার না হলেও দীর্ঘদিন সংরক্ষণে এর স্বাদ, গন্ধ ও গুণমান নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে তাপ, বাতাস, আর্দ্রতা ও আলো অনেক খাবারের সংরক্ষণকাল কমিয়ে দেয়।
তাই রান্নাঘরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কিছু খাবার ও উপকরণ একবার দেখে নেওয়া জরুরি।
১. কিনোয়া
কিনোয়া ও ফারোর মতো গোটা শস্যের সংরক্ষণকাল অনেকটাই নির্ভর করে এতে থাকা চর্বির পরিমাণের ওপর। তাপ, বাতাস ও আর্দ্রতা এসব শস্যের প্রধান শত্রু। এসব উপাদানের প্রভাবে শস্যের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। গোটা শস্যে সাধারণত হালকা মিষ্টি গন্ধ বা কোনো গন্ধ থাকে না। যদি ভ্যাপসা বা তৈলাক্ত গন্ধ পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে শস্যটি আর ভালো অবস্থায় নেই।
২. হলুদ
হলুদ, প্যাপরিকা ও জয়ফলের মতো গুঁড়া মসলা সাধারণত দুই থেকে তিন বছর পর তাদের কার্যকারিতা ও স্বাদ হারাতে শুরু করে। পুরোনো মসলা খেলে সাধারণত বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় না, তবে রান্নায় আগের মতো স্বাদ ও ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। মসলা ব্যবহারের আগে এর গন্ধ ও স্বাদ পরীক্ষা করে নেওয়া যেতে পারে।
৩. বেকিং পাউডার
সময় গড়ানোর সঙ্গে বেকিং পাউডার ও বেকিং সোডার ফোলানোর ক্ষমতা কমে যায়। ফলে এগুলো ব্যবহার করে তৈরি কেক বা অন্যান্য খাবার ঠিকমতো ফুলতে নাও পারে।
বেকিং সোডার কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে এর সঙ্গে ভিনেগার এবং বেকিং পাউডারের সঙ্গে গরম পানি মিশিয়ে দেখা যায়। ফেনা বা বুদবুদ তৈরি হলে উপকরণটি এখনো কার্যকর রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
৪. বিস্কিট
খোলা গ্রাহাম ক্র্যাকার্স আর্দ্রতা থেকে রক্ষা করতে বায়ুরোধী পাত্রে রাখা উচিত। আর্দ্রতা ঢুকে গেলে এগুলো দ্রুত বাসি হয়ে যায়। তবে না খোলা প্যাকেটও দীর্ঘদিন রেখে দিলে বাসি হয়ে যেতে পারে। সাধারণত গ্রাহাম ক্র্যাকার্স প্যান্ট্রিতে প্রায় নয় মাস পর্যন্ত ভালো থাকে।
৫. বাদাম ও বীজ
কাঠবাদাম, চিনাবাদামসহ বিভিন্ন বাদাম ও বীজে প্রচুর তেল থাকে। প্যান্ট্রিতে কয়েক মাস রাখার পর সেই তেল নষ্ট হয়ে বাদাম ও বীজে দুর্গন্ধ তৈরি করতে পারে।
ঘাসের মতো বা রংয়ের মতো গন্ধ এবং অস্বাভাবিক কালচে বা তৈলাক্ত ভাব নষ্ট হওয়ার লক্ষণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ভালো রাখতে বাদাম ও বীজ ফ্রিজারে বায়ুরোধী ব্যাগে রাখা যেতে পারে। এভাবে প্রায় এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।
৬. সিরিয়াল
খোলা সিরিয়ালের প্যাকেট বাতাসের সংস্পর্শে এসে প্রায় তিন মাস পর মান হারাতে শুরু করতে পারে। তবে সিল করা বাক্সের সিরিয়াল এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকতে পারে।
সিরিয়ালে বাদাম থাকলে সেটি আরও দ্রুত নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দুর্গন্ধযুক্ত বাদাম বা তেলতেলে সিরিয়াল খেলে সাধারণত বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয় না, তবে স্বাদ অত্যন্ত খারাপ হতে পারে।
৭. ক্যান্ডি
ক্যান্ডির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন সংরক্ষণে সাধারণত নিরাপত্তার চেয়ে গুণগত মানের সমস্যা বেশি দেখা যায়। এতে আর্দ্রতার পরিমাণ কম থাকায় সহজে নষ্ট হয় না। তবে ক্যান্ডির ধরন অনুযায়ী সংরক্ষণকাল ভিন্ন হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন পড়ে থাকা ক্যান্ডি খাওয়ার আগে এর গন্ধ, রং, গঠন ও স্বাভাবিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে কি না দেখে নেওয়া ভালো।
৮. চা
টি-ব্যাগ সাধারণত এক বছরের মধ্যে ব্যবহার করে ফেলা ভালো। দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে চায়ের তেল ও স্বাদ নষ্ট হয়ে সকালের চায়ে অস্বাভাবিক বা বাসি স্বাদ আসতে পারে।
কফি বিন ও গ্রাউন্ড কফির ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। সাধারণত কফি বিন ও গ্রাউন্ড দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে ব্যবহার করা ভালো। তবে ইনস্ট্যান্ট কফি প্রায় দুই মাস পর্যন্ত রাখা যায়।
৯. বাদামী চিনি
খোলা ব্রাউন সুগার বা বাদামী চিনি প্যান্ট্রিতে প্রায় চার মাস রাখার পর বাতাসের সংস্পর্শে শুকিয়ে শক্ত হয়ে যেতে পারে। এতে ব্যবহারে সমস্যা হতে পারে। বাদামী চিনি নরম ও ভালো রাখতে এটি মুখবন্ধ করা যায় এমন প্লাস্টিকের ব্যাগ বা বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত।
১০. টিনজাত সবজি
টিনজাত সবজি দীর্ঘদিন ভালো থাকতে পারে, তবে সময়ের সঙ্গে টিনের গঠন নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি খাবারে ধাতব বা টিনের মতো স্বাদ তৈরি হতে পারে। আচার বা অন্যান্য উচ্চ অ্যাসিডযুক্ত টিনজাত খাবার সাধারণত ১২ থেকে ১৮ মাস ভালো থাকতে পারে। অন্যদিকে ভুট্টার মতো কম অ্যাসিডযুক্ত টিনজাত সবজি পাঁচ বছর পর্যন্ত ভালো থাকতে পারে।
তবে টিনে মরিচা, ফুলে যাওয়া বা বড় ধরনের ডেন্ট থাকলে খাবারটি না খাওয়াই ভালো। প্যান্ট্রিতে পুরোনো খাবার আগে ব্যবহার করতে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
১১. জলপাই তেল
আলো ও তাপ জলপাই তেলের মান দ্রুত নষ্ট করে। খোলা বোতলের পুরোনো জলপাই তেল খেলে সাধারণত অসুস্থ হওয়ার কথা নয়, তবে প্রায় ছয় মাস পর এর স্বাদ ও গুণমানে পরিবর্তন আসতে পারে।
যারা নিয়মিত জলপাই তেল ব্যবহার করেন না, তাদের জন্য ছোট বোতল কেনা ভালো। এতে তেল দীর্ঘদিন পড়ে থেকে স্বাদ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
আরও দেখুন: ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিক্ষোভ, যান চলাচল ব্যাহত
১২. গোটা শস্যের আটা
সাধারণত আটা প্যান্ট্রিতে রাখা হলেও গোটা শস্যের আটা দীর্ঘদিন ভালো রাখতে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজারে রাখা ভালো। ফ্রিজে এটি প্রায় আট মাস এবং ফ্রিজারে এক বছর পর্যন্ত ভালো থাকতে পারে। সাদা ময়দার তুলনায় গোটা শস্যের আটা দ্রুত নষ্ট হয়। এতে খাবারের নিরাপত্তার চেয়ে মূলত স্বাদ ও গুণমানের ওপর প্রভাব পড়ে।
১৩. আলু
আলু সাধারণত ফ্রিজে প্রায় দুই সপ্তাহ এবং প্যান্ট্রিতে প্রায় দুই মাস ভালো থাকতে পারে। আলুতে অঙ্কুর গজাতে শুরু করলে এবং খোসায় নরম কালো দাগ দেখা দিলে বুঝতে হবে এর মান কমে আসছে। তাই দীর্ঘদিন সংরক্ষিত আলু রান্নার আগে ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।
১৪. বাদামী চাল
সাদা চালের তুলনায় বাদামী চাল তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর হলেও এটি বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। বাদামী চালের তুষের স্তরে থাকা তেল সময়ের সঙ্গে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সাধারণত এর সংরক্ষণকাল প্রায় ছয় মাস। তবে ফ্রিজারে রাখলে বাদামী চাল প্রায় এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
১৫. রসুন
রসুন জালের ব্যাগে করে অন্ধকার, শীতল ও শুকনো জায়গায় রাখলে প্রায় তিন থেকে পাঁচ মাস ভালো থাকতে পারে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলে রসুনের কোয়া শুকিয়ে যেতে পারে অথবা অঙ্কুর গজাতে পারে। এগুলো সাধারণত ক্ষতিকর নয়, তবে রসুনের সর্বোচ্চ মান ও স্বাদ আর থাকে না। তাই দীর্ঘদিন পড়ে থাকা রসুন ব্যবহারের আগে এর অবস্থা পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।
রান্নাঘরের খাবার দীর্ঘদিন ভালো রাখতে শুধু প্যাকেটের তারিখের দিকে তাকালেই হবে না। খাবারের গন্ধ, রং, গঠন ও সংরক্ষণের পরিবেশও বিবেচনায় নিতে হবে। বিশেষ করে তাপ, আর্দ্রতা, আলো ও বাতাস থেকে খাবারকে যতটা সম্ভব দূরে রাখলে অনেক খাবারই তুলনামূলক বেশি দিন ভালো থাকে। তথ্যসূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট।