মানসিক চাপ যেভাবে ব্রণ বা চর্মরোগের সমস্যা বাড়াতে পারে

২৯ মে ২০২৬, ০৩:৪০ PM
মুখে ব্রণ

মুখে ব্রণ © সংগৃহীত

ব্রেক-আপের পর ভগ্ন হৃদয়ের পাশাপাশি একজিমার সমস্যার সঙ্গেও লড়তে হয়েছে? অথবা বাড়ি বদলানোর সময় হঠাৎই মুখে ব্রণ দেখা দিয়েছে? এটা সম্ভবত কাকতালীয় নয়।

মানসিক চাপের প্রভাব যে আমাদের ত্বকের উপর পড়ে তা দীর্ঘদিন ধরেই মনে করা হয়। তবে ত্বকের সঙ্গে মস্তিষ্কের এই যোগ ঠিক কীভাবে কাজ করে সে বিষয়ে গবেষণা হয়েছে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে।

এই গবেষণা বিভিন্ন ধরনের চর্ম রোগের চিকিৎসা এবং সার্বিকভাবে ত্বকের স্বাস্থ্যের বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের ত্বকের উপর মানসিক চাপের বিভিন্ন ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ব্রণের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া, ত্বক শুষ্ক ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার মতো ঘটনা।

একইসঙ্গে মানসিক চাপ একজিমা, সোরিয়াসিস এবং আমবাত বা ছুলির মতো রোগের প্রকোপ বাড়াতে বা এই ধরনের রোগকে আবার সক্রিয় করে তুলতে পারে।

"শারীরিক এবং মানসিক- এই দু'ধরনের চাপই আপনার ত্বকের উপর প্রভাব ফেলতে পারে," বলেছেন লন্ডনের সাইকোডার্মাটোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. আলিয়া আহমেদ।

সাইকোডার্মাটোলজি হলো সাইকোলজি এবং ডার্মাটোলজি-র সংমিশ্রণে তৈরি এক উদীয়মান ক্ষেত্র যেখানে মন ও ত্বককে একত্রে বিবেচনা করা হয়।

ডা. আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি তার রোগীদের শারীরিক লক্ষণগুলোর পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও খোঁজ নেন। যেমন তাদের মন মেজাজ কেমন আছে, উদ্বেগ রয়েছে কি না বা কান্নাকাটি করেছেন কি না, ঘুমের ধরন, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়ামের রুটিন ইত্যাদি।

তার কথায়, "চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই নিজেদের গোয়েন্দা বলে মনে করেন।"

এই বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যা করেছেন ত্বকের অবস্থা একজন ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ভালো সূচক হতে পারে।

মানসিক চাপ ত্বকে কীভাবে প্রভাব ফেলে?

একই কোষগুচ্ছ থেকে আমাদের মস্তিষ্ক এবং ত্বকের বিকাশ ঘটে। এই দুয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আর এই কোষগুচ্ছ থেকেই ব্রণের শুরু।

মানসিক চাপ আমাদের অ্যামিগডালাকে সক্রিয় করে। অ্যামিগডালা আমাদের মস্তিষ্কেরই একটা অংশ এবং মানুষের একেবারে আদিম আবেগের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে।

এটা মস্তিস্কের হাইপোথ্যালামাস নামের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে সংকেত পাঠায় যা কর্টিসল এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো বিভিন্ন হরমোন তৈরি করার জন্য গ্রন্থিগুলোকে উদ্দীপিত করে তোলে।

কর্টিসল এক ধরনের অত্যাব্যশ্যক হরমোন যা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয়। এটা স্ট্রেস হরমোন নামেও পরিচিত।

মানসিক চাপ বাড়লে মস্তিষ্কে নানা রকম প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় যার ফলে রক্তে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনের নিঃসরণ হতে থাকে, যা রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

মানসিক চাপের সঙ্গে ভোগার সময়ে নিসৃত হরমোন এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থগুলো দেহে প্রদাহ বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা ত্বকের প্রদাহজনিত অবস্থার আরো অবনতি ঘটায়।

এগুলো ত্বকের সুরক্ষা স্তরকেও দুর্বল করে দিতে পারে।

ডা. আলিয়া আহমেদ ব্যাখ্যা করেছেন, ত্বকের বাইরের প্রতিরক্ষামূলকর স্তর দুর্বল হয়ে পড়লে ত্বক তার আর্দ্রতা খুইয়ে ফেলে। ফলে পরাগরেণু ও সুগন্ধির মতো উত্তেজক ও অ্যালার্জেনিক পদার্থ (অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান) শরীরে প্রবেশ করতে পারে যা ত্বককে শুষ্ক ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।

একইসঙ্গে মানসিক চাপ আমাদের শরীরে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইডের মাত্রাও কমিয়ে দেয়, যার ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল পেপটাইড এক ধরনের প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ছোট অণু যা সাধারণত জীবাণু ধ্বংস করে। এর ফলে জ্বরঠোসা কিংবা দাদের মতো সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

গবেষণায় এমন প্রমাণও মিলেছে যে মানসিক চাপের কারণে ব্রণের সমস্যা আরো বেশি করে দেখা দিতে পারে। স্ট্রেস বা মানসিক চাপের কারণে নিঃসরণ হওয়া রাসায়নিক পদার্থ ত্বকের গ্রন্থিগুলোকে বেশি পরিমাণে সিবাম তৈরি করতে উদ্দীপনা যোগায়, যার ফলে ব্রণ দেখা দিতে পারে।

সিবাম আমাদের ত্বকের সেবাসিয়াস গ্ল্যান্ড বা তৈলগ্রন্থি থেকে নিঃসরণ হওয়া এক জাতীয় তৈলাক্ত পদার্থ। বেশি পরিমাণে সিবাম উৎপন্ন হলে লোমকূপ বন্ধ হতে পারে যা আবার ব্রণের প্রকোপ বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ডা. আহমেদ উল্লেখ করেছেন যে মানসিক চাপ আমাদের ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এর ফলে ত্বকের নিজেকে সারিয়ে তোলার যে ক্ষমতা, তা-ও ব্যাহত হয়।

দুষ্টচক্র

মানসিক চাপ অনুভব হলে তৈরি হওয়া স্ট্রেস সিগন্যাল ত্বকের কোষগুলোকে হিস্টামিনের মতো রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করতেও উদ্দীপিত করে, যার ফলে ইচিং বা চুলকানির অনুভূতি হয়।

এই পুরোটাই এক ধরনের চক্র বলে উল্লেখ করেছেন চিকিৎসক আলিয়া আহমেদ। এই চক্রকে ইচ-স্ক্র্যাচ সাইকেল বলে। সহজভাবে বলতে গেলে চুলকানির অনুভূতি হওয়া এবং তার প্রতিক্রিয়ায় চুলকানো যা একটা চক্রের মতো চলে।

ডা. আহমেদ ব্যাখ্যা করেন, "ত্বকে চুলকানির অনুভূতি হয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় আপনি চুলকান। এতে ত্বকের আরও ক্ষতি হয় এবং তার ফলে আরো বেশি চুলকাতে থাকে।"

"তারপর আপনি নিজেই নিজের উপর বিরক্ত হতে শুরু করেন এই ভেবে যে, আমি কেন থামাতে পারছি না? আপনার মানসিক চাপের মাত্রা বেড়ে যায়। আর সেটাই আবার চুলকানিকেও বাড়িয়ে তোলে।"

কেউ যদি ইতোমধ্যে ত্বকের কোনো সমস্যার সঙ্গে লড়তে থাকেন, তাহলে মানসিক চাপের কারণে সেই সমস্যা আরো বেড়ে যেতে পারে।

এই প্রসঙ্গে একজিমার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, "আপনি হয়তো ক্রমাগত চুলকাচ্ছেন। এটা আপনার জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করে। হয়তো লোকে এই নিয়ে মন্তব্যও করছে এবং আপনার খারাপ লাগছে। মানসিক চাপও আরো বাড়ছে। আর এভাবেই পুরো সমস্যা আরও বেড়ে যায় এবং আপনি একপ্রকার দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়েন।"

মানসিক চাপ কমলে উপকার হবে?

"মানসিক চাপ তখনই ক্ষতিকর যখন আপনার মনে হতে থাকে যে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না," ব্যাখ্যা করেছেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা, স্নায়ুবিজ্ঞান ও শিশুবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রজিতা সিন্হা।

এই পর্যায়ে, মাথাব্যথা বা পেটের সমস্যার মতো শারীরিক লক্ষণ, অথবা ভুলে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ বা ঘুমের সমস্যার মতো উপসর্গ লক্ষ্য করা যায়।

এই অবস্থায় বিশেষজ্ঞের সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি ব্যায়াম করার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।

গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত ব্যায়াম কর্টিসলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করলে পরবর্তীকালে মানসিক চাপের ফলে কর্টিসলের মাত্রা আকস্মিক বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যার সঙ্গে লড়াও সম্ভব হয়।

অধ্যাপক সিন্হা 'মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন' করারও পরামর্শ দেন।

মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন হলো এক ধরনের মেডিটেশন যার মাধ্যমে কোনো রকম জাজমেন্ট বা বিচার ছাড়াই চিন্তা, আবেগ ও শারীরিক অনুভূতিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, নিয়মিত মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন আমাদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে উন্নত করে তুলতে পারে। প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স হলো মস্তিষ্কের সেই অংশ যা যুক্তিবোধের মতো উচ্চ-স্তরের কাজগুলোর দ্বায়িত্বে থাকে। এটা মস্তিষ্কের পুরুত্ব বাড়ায় এবং মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের সংযোগ উন্নত করে।

মাইন্ডফুলনেস-ভিত্তিক থেরাপি জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং কিছু কিছু চর্ম রোগের উপসর্গ প্রশমনের ক্ষেত্রে আশানুরূপ ফল প্রদান করেছে।

যেমন সোরিয়াসিসে আক্রান্ত রোগীদের উপর এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা তাদের প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি মাইন্ডফুলনেস-ভিত্তিক থেরাপি গ্রহণ করেছিলেন, তারা তুলনামূলকভাবে যারা ওই থেরাপি গ্রহণ করেনি তাদের চেয়ে ভালো ফল পেয়েছেন।

মানসিক চাপ মোকাবিলার উপায়

ডা. আহমেদ জানিয়েছেন, তিনি তার রোগীদের মানসিক চাপ মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন পন্থা ব্যবহার করার পরামর্শ দেন, যাতে এর মধ্যে কোনটা তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করে তা খুঁজে বের করা যায়।

এর মধ্যে রয়েছে ঘুমানোর আগে রিল্যাক্স করার জন্য বিছানায় ব্যায়াম করা, বেশি সক্রিয় ব্যক্তিদের জন্য ওয়াকিং মেডিটেশন, অথবা যারা সহজেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন বা নির্দিষ্ট কিছু বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত ভাবেন- তাদের জন্য এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করা যা এই বিশেষজ্ঞের কথায়, "আপনাকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে পারে"।

ওয়াকিং মেডিটেশন এমন এক ধরনের অনুশীলন যেখানে ধীর ও স্থির গতিতে হাঁটার সময় পা তোলা, নাড়ানো এবং রাখার শারীরিক অনুভূতিগুলোর উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা হয়।

কিন্তু, তার মতে আসলে আরাম করাটা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তার চেয়ে কিন্তু কঠিন হতে পারে।

ডা. আহমেদের কথায়, "আমি আমার ক্লিনিকে অনেক পরিশ্রমী মানুষ দেখি" যাদের মধ্যে অনেকেরই কর্মক্ষেত্রে বা বাড়িতে বিভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে, যেমন—সন্তানদের দেখাশোনা করা বা বয়স্ক বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া।

এদের মধ্যে কেউ কেউ জানিয়েছেন যে তারা রিল্যাক্স করার জন্য জিমে যান বা সুস্থ থাকতে প্রতিদিন হাঁটেন।

ডা. আহমেদ জানিয়েছেন ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে বিশদে কথা বলতে গিয়ে লক্ষ্য করেন তারা নিজেদের দৈনন্দিন কাজের কথা ভাবতে ভাবতেই জিমে ব্যায়াম করেন বা হাঁটাহাঁটি করেন।

তিনি উল্লেখ করেছেন, "এই সময় আপনার মনেরও বিশ্রাম সময় পাওয়া উচিত"।

সামগ্রিক চিত্র

মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি ত্বকের যত্ন নেওয়াও প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন, ডা. আহমেদ। তার কথায়, ত্বকের জন্য "সবকিছুরই অল্প অল্প" করে প্রয়োজন — যার মধ্যে রয়েছে ত্বকের সঠিক যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, সুষম খাবার খাওয়া, ভালো ঘুম এবং জীবনযাত্রার দিকে নজর রাখা।

তিনি জানিয়েছেন, ত্বকের স্বাস্থ্যের সামগ্রিক উন্নতির কথা মাথায় রেখে, এই সমস্ত কিছুই ধারাবাহিকভাবে করতে হবে। তাহলে বোঝা যাবে যে ঠিক কোন বিষয়টা ত্বকের সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে।

ডা. আহমেদ মনে করেন, সাইকোডার্মাটোলজির মাধ্যমে এই সমস্ত ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সম্ভব।

এর ফলও দেখেছেন তিনি। তার কথায়, "এর ফলে রোগীদের যে শুধু ত্বকের উন্নতি দেখেছি তা-ই নয়, তাদের কাছ থেকে এও শুনেছি যে তারা মানসিকভাবে ভালো বোধ করছেন।"

মিয়ানমারে পাচারকালে ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ, আটক ১
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
সারারাত এপাশ-ওপাশ? গভীর রাতে আরামদায়ক ঘুমের জন্য মেনে চলুন …
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
চবিতে ছাত্রদল নেতা মুছাকে স্মরণ, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
গভীর রাতে গুনাহ মাফ ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ আমল 
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
আন্দোলনকে কোনো রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
দুই মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে জামায়াতকর্মী নিহত
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950