কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল করতে কৃষক কার্ড: প্রধানমন্ত্রী © সৌজন্যে প্রাপ্ত
দেশের কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল করতেই সরকার কৃষক কার্ড চালু করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে টাঙ্গাইলে শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে কৃষক কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের লক্ষ্যই হচ্ছে, কৃষককে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলা, কৃষককে সচ্ছল হিসেবে গড়ে তোলা। সেইজন্যই এই কৃষক কার্ড আমরা দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন যে, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আমরা কৃষকের কাছে চেষ্টা করব ইনশা-আলল্লাহ সরাসরি ১০টি সুবিধা পৌছে দিতে, ১০ টি সুবিধার মাধ্যমে কৃষক তার অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের কথা উল্লেখ করে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, এই মঞ্চে যত মানুষ উপস্থিত আছেন আমি হয়তো সরাসরিভাবে কৃষক কৃষির সাথে সম্পর্কিত নই । কিন্তু আমাদের পরিবারের কেউ না কেউ আছে যেই মানুষটি কৃষির সাথে সম্পর্কিত, সরাসরিভাবে এখনো সম্পর্কিত আমাদের আত্মীয়স্বজন পরিবার পরিজনেরা অর্থাৎ বাংলাদেশে আমরা যত মানুষ আছি প্রত্যেকটি পরিবার চার কোটি পরিবার আছে প্রত্যেকটি পরিবারের কেউ না কেউ কৃষির সাথে সম্পর্কিত অর্থাৎ এই দেশের প্রধান পেশায় হচ্ছে কৃষি।
তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিশ্বাস করে, বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের নির্বাচিত বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে যে, এই দেশের কৃষক যদি সচ্ছল থাকে, এই দেশের কৃষক যদি বেঁচে থাকে, এই দেশের কৃষক যদি ভালো থাকে তাহলে সমগ্র বাংলাদেশ ভালো থাকতে পারবে। সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরকার পর্যায়ক্রমে ২ কোটি ৭৫ লক্ষ কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড পৌঁছিয়ে দেবে।
ঢাকা থেকে সড়ক পথে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি টাঙ্গাইলে শহীদ মারুফ স্টেডিয়াম আসেন। বেলা ১২টা ২২ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী কৃষক কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপে বাটন প্ল্যাসের সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গাইলসহ সারাদেশে ১১টি উপজেলার ২২ হাজার ৬৭ জন কৃষকের প্রত্যেকের মোবাইলের মাধ্যমে ব্যাংক একাউন্টে আড়াই হাজার টাকার নগদ অর্থ চলে যায়। টাঙ্গাইলে ১৪শ ৫৩ জন কৃষক-কৃষানীরা এই অর্থ পান।
প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে ১৫জন কৃষক-কৃষানীর হাতে কৃষক কার্ড এবং গাছের চারা তুলে দেন। তিনি কৃষক-কৃষানীদের উদ্দেশ্যে বলেন, এই যে গাছের চারা দিচ্ছি, তা বড় হলে ফল কিন্তু আমার জন্য পাঠাবেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে কৃষক ও কৃষি ক্ষেত্রে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন যার মাধ্যমে আমরা দেখেছিলাম এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষিতে মোটামুটিভাবে ফসলে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল এবং যেই বাংলাদেশে আমরা দেখেছিলাম ১৯৭৪ সালে দেশের মানুষ না খেয়ে অসংখ্য মারা গেছিল দুর্ভিক্ষে… সেই বাংলাদেশে আমরা দেখেছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় শুধুমাত্র খাল খনন করার ফলে কৃষক সেচ সুবিধা পাওয়ার ফলে কৃষির উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছিল এবং এই বাংলাদেশ থেকে অল্প পরিমাণে হলেও বিদেশি খাদ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার যতবার এই দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে বিএনপি সরকার চেষ্টা করেছে কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। আপনারা বিএনপির উপরে বিগত নির্বাচনে আস্থা রেখেছেন ইনশাল্লাহ এই সরকার আপনাদের সেই আস্থার পূর্ণ মর্যাদা দিবে। আমি বলতে চাই, এখন আমাদেরকে দেশ গড়ার সময়। কৃষক ভাইদের পাশে আমরা যেমন দাঁড়াবো, একই সাথে আমরা আমাদের দেশের কৃষানীবোনসহ আমাদের দেশের যে নারী সমাজ আছে.. এই নারীরা দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা এই নারী সমাজকে যদি আমরা স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে না পারি তাহলে এই দেশকে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব। সেই কারণেই আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে আমরা যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হই তাহলে আমরা বাংলাদেশের মা-বোনদের জন্য, নারীদের জন্য,পরিবারের নারী প্রধানের জন্য আমরা ফ্যামিলি কাজ চালু করবো আল্লাহর রহমতে সেই কাজটি পাইলট প্রজেক্ট আমরা শুরু করতে সক্ষম হয়েছি এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে আগামী পাঁচ বছরের ভিতরে আমরা বাংলাদেশের চেষ্টা করব সকল নারী প্রধান পরিবারের কাছে এই কার্ডের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থাৎ এই সরকার জনগণের সরকার। এই সরকার কৃষক বলুন, এই সরকার দেশের মা বোনদের কথা বলুন, মসজিদের ইমাম-খতিব সাহেব সহ অন্যান্য ধর্মীয় গুরু যারা আছেন তাদের কথা বলুন, ছাত্রদের কথা বলুন, দল-শ্রেণি- পেশা নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের উন্নয়ন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। সেজন্যই আমরা বলে থাকি, ‘ করব কাজ, গড়ব দেশ সবার আগে বাংলাদেশ’।
দেশবাসীর উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন আমরা এই দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক আমরা রাজনীতি করি বা না করি, আমরা কৃষক হই বা না হই, আমরা ছাত্র হই না হই,আমরা ব্যবসায়ী হই বা না হই। যে মানুষই হয়ে থাকি না কেন, যে পেশার মানুষ হয়ে থাকি না কেন, প্রত্যেকের আমাদের একটি আকাঙ্ক্ষা আছে… নিজের দেশটিকে আমরা ভালো দেখতে চাই। নিজের দেশটিকে আমরা সুন্দর দেখতে চাই। আমরা দেখতে চাই এই দেশের মানুষ নিরাপদে এই দেশে বসবাস করছে। এই দেশের মানুষ এই দেশের সন্তানেরা এদেশেই বড়ো হচ্ছে ,স্বাচ্ছন্দে বড় হচ্ছে, খেয়ে পড়ে, ব্যবসা বাণিজ্য, চাকরি বাকরি করে নিরাপদের সাথে, নিরাপত্তার সাথে বড় হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য সেটাই। আমরা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে চাই কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব একমাত্র যদি জনগণের সহযোগিতা থাকে। সেজন্যই আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে চলতে চাই, জনগণকে পাশে রেখে চলতে চাই, জনগণকে সাথে নিয়ে সামনে এর দিকে বাড়তে চাই …দেশ গঠন করতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে এই কৃষক কার্ড উদ্বোধন করার মাধ্যমে আবারো আমি বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশা সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে আবারো দেশ গঠনের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, এই যে পহেলা বৈশাখ আজকের এই অনুষ্ঠানটি, পহেলা বৈশাখ কীভাবে আসল নিশ্চয়ই অনেকেরই আপনাদের ধারণা আছে। যদিও বর্তমানে এটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। কিন্তু পহেলা বৈশাখটি আসলে আমাদের এই বাংলাদেশের কৃষকদের সাথে সম্পর্কিত। এই কৃষির ক্ষেত্রে হোক, ব্যাবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হোক, কৃষকরা তাদের যে হিসাবের খাতা এই খাতাটি নতুন করে সেখান থেকে এই পহেলা বৈশাখ এসেছে, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানটি এসেছে এবং সে কারণেই যেহেতু পহেলা বৈশাখের মূল বিষয় যেটি আমাদের কৃষক ভাইদের সাথে জড়িত, কৃষানী বোনদের সাথে জড়িত সেজন্যই আমরা কৃষক কার্ড প্রদানের এই অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন ঘোষণা করলাম।
প্রধানমন্ত্রী জানান, কৃষকদের জন্য ইতিমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণ ও কৃষকদের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে যে সকল অঞ্চল উত্তর অঞ্চল সহ বাংলাদেশের যেসব অঞ্চল কৃষি নির্ভরশীল এলাকা সেই সকল অঞ্চলে আমরা যখন কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব, কৃষণ বোনদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব, আমরা যেরকম কৃষিকে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করব। একই সাথে আমাদের চেষ্টা থাকবে যে শুধু কৃষি পণ্য উৎপাদন করলেই হলো না, সেই সকল অঞ্চলে কীভাবে কৃষি পণ্যের সাথে সম্পর্কিত যে সকল ফল কারখানা আছে সেগুলিও যাতে প্রতিষ্ঠিত করা যায় তার ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে কৃষক তার পণ্যের মূল্য আরো বেশি পেতে পারে যাতে করে আমাদের কৃষি জাত পণ্য এগুলো যাতে বিদেশেও আমরা রপ্তানি করতে পারি সেই জন্য আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
তিনি বলেন, গতকাল খবরে আপনারা দেখেছেন, আমি গতকাল বাংলাদেশের যে সকল ব্যবসায়ী এই কৃষিজাত পণ্যের ব্যাবসার সাথে সম্পর্কিত, যাদের কৃষি জাত পণ্যের কলকারখানা আছে তাদের সাথে প্রায় চার ঘণ্টা বসেছি, তাদের সমস্যার কথা শুনেছি এবং অনেকগুলো সমাধানের চেষ্টা আমরা করেছি। যাতে করে তারা আরো বেশি বিনিয়োগ করতে পারে, আরো বেশি মানুষকে সম্পর্কিত করতে পারে, আরো বেশি কৃষি পণ্য কৃষক ভাইদের কাছ থেকে কিনতে পারে এবং সেই সকল পণ্যকে ফিনিশ করার মাধ্যমে তারা বিদেশে রাজধানী করতে পারে। তাতে করে একদিকে যেমন কৃষক ভাইদের সুবিধা হবে একইভাবে দেশের জন্য আমরা মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা পর্যন্ত আমরা অর্জন করতে সক্ষম হব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষক ভাইদের অনেক সমস্যা আছে। যেমন, টাঙ্গাইলের আনারস বিখ্যাত। এই আনারসের প্রচুর ফলন। কিন্তু এই আনারসকে আমরা আমরা প্রিজার্ভ করে রাখতে পারি না। আনারস সিজনের পরেও যাতে আমরা রাখতে পারি সেটা যেন কোল্ড স্টোরেজ বা সেরকম প্রক্রিয়াজাত কিছু নাই। এরকম অনেক পণ্য আছে বাংলাদেশে যেগুলোকে আমরা যদি প্রক্রিয়াজাত করে রাখতে পারি, কোল্ড স্টোরেজ করে রাখতে পারি তাহলে কৃষক ভাইয়েরা যে কম ফসলটা যখন বেশি হয় তখন অনেক সময় দাম পায় না। কিন্তু আমরা যদি গোল্ড স্টোরেজ রাখতে পারি তাহলে কৃষক ভাইয়েরা পরবর্তীতে দাম পায়। শুধু কৃষক ভাইয়েরা দাম পায় না। একই সাথে মানুষও সিজনের পরেও সেই ফসলটি সুবিধা পায়। সেই ফল ফলাদি বলেন সেটি মানুষ খেতে পারে।
এ ব্যাপারে বিদেশি সহযোগিতার পাওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে ও অতিরিক্ত সচিব সেলিম খানের সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি, কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বক্তব্য রাখেন।