বেনাপোল কাস্টমস হাউস © সংগৃহীত
দেশের সর্ববৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমস হাউসে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ১৩ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। আমদানি কার্যক্রম কমে যাওয়া, বিভিন্ন পণ্যের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে শুল্কফাঁকি বৃদ্ধিকে এই ঘাটতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জন্য মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৮ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম ছয় মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। তবে এই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ হাজার ১২০ দশমিক ০৫ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা কম।
ব্যবসায়ী নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সীমান্ত বাণিজ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে কিছু অসাধু চক্র আমদানি পণ্য পাচারের মাধ্যমে শুল্কফাঁকিতে জড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে একাধিক পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা থাকায় বেনাপোল বন্দর দিয়ে বৈধ আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা রাজস্ব আদায়ে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আরও পড়ুন: শাকসু নির্বাচন স্থগিত : কঠোর কর্মসূচির হুশিয়ারি শিক্ষার্থীদের
আমদানিকারক হাবিবুর রহমান বলেন, বেনাপোল বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য নিরাপত্তা দুর্বল হওয়ায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী শুল্কফাঁকিতে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈধ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, বৈধ সুযোগ-সুবিধার অভাবে অনেক ব্যবসায়ী বেনাপোল বন্দর ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, দ্রুত পণ্য খালাস এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আমদানি ও রাজস্ব আয় উভয়ই বাড়বে।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, নিরাপত্তার নামে দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাক আটকে রেখে তল্লাশি চালানোয় ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ভারতের মতো বেনাপোলে প্রবেশদ্বারে আধুনিক স্ক্যানিং মেশিন স্থাপন করা হলে হয়রানি কমবে এবং বাণিজ্য গতিশীল হবে।
বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন যেখানে ৬০০ থেকে ৭০০ ট্রাক পণ্য আমদানি হতো, বর্তমানে তা কমে প্রায় ২৫০ ট্রাকে নেমে এসেছে। আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি শ্রমিক ও পরিবহন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামিম হোসেন জানান, সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে ২৫৬ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং ৮০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, জুলাই মাসে ৫০৮ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৪৪ দশমিক ০৪ কোটি টাকা। আগস্টে ৪৯৩ কোটির বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪৪৭ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে ৬০১ কোটির বিপরীতে ৫১৩ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা, অক্টোবরে ৬৪৫ কোটির বিপরীতে ৪৪৯ দশমিক ২৮ কোটি টাকা, নভেম্বরে ৭৫৫ কোটির বিপরীতে ৫৬৪ দশমিক ৪১ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বর মাসে ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬০০ দশমিক ৮১ কোটি টাকা।
তিনি আরও জানান, শুল্কফাঁকির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে জরিমানাসহ কাস্টমস আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব ঘাটতি থাকলেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে অর্থবছর শেষে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।