কোলাজ ছবি © এআই দিয়ে তৈরিকৃত ছবি
আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের লড়াইকে অনেকেই ক্রিকেটের ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথের সঙ্গে তুলনা করেন। কারণ, এই দুই দলের মুখোমুখি লড়াই শুধু ফুটবলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনৈতিক ইতিহাস, বিতর্ক, নাটকীয়তা এবং জাতীয় আবেগ। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই দল। প্রায় ২১ বছর পর এই ম্যাচ ঘিরে তাই নতুন করে ফিরে এসেছে বহু পুরোনো এক ফুটবল-শত্রুতার গল্প।
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সর্বশেষ মুখোমুখি হয়েছিল ২০০৫ সালের আগস্টে জেনেভায় একটি প্রীতি ম্যাচে। গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে সেটিই ছিল তাদের একমাত্র প্রীতি ম্যাচ। এর বাইরে দুই দলের বাকি পাঁচটি সাক্ষাৎ হয়েছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। ফলে বিশ্বকাপ ছাড়া এই দুই দলকে একে অপরের বিপক্ষে দেখা প্রায় বিরল ঘটনা।
বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী বুধবার রাতে আবারও মাঠে নামবে দুই দল। ফলে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, ইতিহাস আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
লিওনেল মেসির জাতীয় দলে অভিষেকের পরও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খুব বেশি খেলার সুযোগ হয়নি। ২০০৫ সালে ফিফা ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে জাতীয় দলে ডাক পান তিনি। তবে জেনেভার সেই প্রীতি ম্যাচে খেলতে পারেননি। কারণ, জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখে নিষিদ্ধ ছিলেন মেসি।
হাঙ্গেরির বিপক্ষে বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন তিনি। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার ভিলমোস ভানজাকের একটি ফাউলের পর কনুই দিয়ে আঘাত করায় রেফারি মার্কাস মার্ক তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ফলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি তাকে দর্শক হিসেবেই দেখতে হয়।
মেসিকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত সেই রোমাঞ্চকর ম্যাচে আর্জেন্টিনা দুইবার এগিয়ে গিয়েছিল। তবে শেষ দিকে মাইকেল ওভেনের জোড়া গোলে সোভেন-গোরান এরিকসনের ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের প্রথম সাক্ষাৎ ১৯৬২ সালে। এরপর প্রতিবারই তাদের লড়াইয়ে দেখা গেছে বিতর্ক, উত্তেজনা, দৃষ্টিনন্দন গোল এবং নানা নাটকীয় মুহূর্ত। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার পেছনে শুধু ফুটবল নয়, রয়েছে রাজনৈতিক ইতিহাসও।
১৯৮০-এর দশকের ফকল্যান্ড যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই যুদ্ধের রেশ আজও ফুটবলের গ্যালারি ও মাঠে অনুভূত হয়। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা এখনও বিভিন্ন ফুটবলীয় গানে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। অনেকের মতে, ফুটবল মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় আর্জেন্টিনার কাছে জাতীয় গৌরব ও ঐতিহাসিক ক্ষোভের প্রতীক।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করে ইংল্যান্ডকে হারান। ইতিহাসে সেটিই ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে অমর হয়ে আছে। একই ম্যাচে তিনি মাঝমাঠ থেকে একক প্রচেষ্টায় যে গোলটি করেন, সেটিকে এখনও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। রাউন্ড অব ১৬-এর সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে লাল কার্ড দেখেন ইংল্যান্ডের তারকা ডেভিড বেকহাম। ঘটনাটি ইংল্যান্ডজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং দীর্ঘদিন সমালোচনার মুখে পড়তে হয় বেকহামকে।
এরও আগে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে লাল কার্ড দেখানো হয়। সিদ্ধান্তটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে কিছু সময়ের জন্য বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সেই ম্যাচের পর ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ আলফ রামসে নিজের খেলোয়াড়দের আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের সঙ্গে জার্সি বদল করতে নিষেধ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি প্রকাশ্যে আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলেও মন্তব্য করেন। আর্জেন্টিনায় এই মন্তব্যকে চরম অপমানজনক ও বর্ণবাদী হিসেবে দেখা হয়। অনেকের মতে, এই ঘটনাই দুই দেশের ফুটবলীয় বৈরিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
এরপর থেকে বিশ্বকাপ ছাড়া আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ খুব কমই আয়োজন করা হয়েছে। ফলে যখনই এই দুই দল একই মাঠে নামে, সেটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ থাকে না; ইতিহাস, আবেগ, রাজনৈতিক স্মৃতি এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে। সেই কারণেই অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথকে ক্রিকেটের ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের সমতুল্য বলে মনে করা হয়।