লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে, © এআই জেনারেটেড
গোল্ডেন বুটের লড়াই সবসময়ই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ২০২৬ আসরেও শুরু থেকেই জমে উঠেছিল সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেইন—চার তারকা ছিলেন মাত্র দুই গোলের ব্যবধানে, প্রত্যেকেই ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে। তবে শনিবার মায়ামির নাটকীয় এক কোয়ার্টার ফাইনাল বদলে দিয়েছে পুরো চিত্র। সেই লড়াই থেকে ছিটকে গেছেন আর্লিং হালান্ড।
অতিরিক্ত সময়ে ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়েছে নরওয়ের। দেশের হয়ে খেলা প্রতিটি ম্যাচে গোল করা হালান্ডকে এবার থামিয়ে দিয়েছে ইংল্যান্ডের রক্ষণ। সাত গোল করে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক যাত্রা শেষে বিদায় নিতে হয়েছে তাকে।
তবে হালান্ডকে বিদায় করা ইংল্যান্ডের হয়ে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন জুড বেলিংহাম। নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করেন তিনি, যার মধ্যে অতিরিক্ত সময়ের জয়সূচক গোলটিও ছিল। এতে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়ে। একই সংখ্যক গোল নিয়ে সতীর্থ হ্যারি কেইনের পাশে উঠে এসেছেন বেলিংহাম।
এখন গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ইংল্যান্ডের দুই তারকা থাকলেও শীর্ষে আছেন সেই দুই নাম, যাদের ঘিরেই শুরু থেকেই ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচনা লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময় ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের গোলে জয় নিশ্চিত করে লিওনেল মেসির দল।
তবে ওই ম্যাচে গোলের দেখা পাননি মেসি। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ গোল করলেও স্কোরশিটে নাম ওঠেনি আর্জেন্টাইন অধিনায়কের। এর ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে টানা নয় ম্যাচ পর গোলহীন থাকলেন তিনি।
যদিও গোলের দৌড়ে এখনো আটটি গোল নিয়ে শীর্ষে আছেন মেসি। একই সংখ্যক গোল নিয়ে তার পাশে রয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপেও দুজনের গোলসংখ্যা ছিল আট। সেবার ফাইনালে এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক তাকে এক গোলের ব্যবধানে এগিয়ে দিয়েছিল এবং মেসির অধরা থেকে যায় গোল্ডেন বুট।
মেসির ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ, ব্যালন ডি’অরসহ প্রায় সব ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জন থাকলেও গোল্ডেন বুট এখনো অধরা। চার বছর পর আবারও সেই পুরস্কারের দৌড়ে রয়েছেন তিনি, আর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে সেই একই নাম এমবাপ্পে।
২০২৬ বিশ্বকাপেও দুজনের গল্পে রয়েছে দারুণ মিল। দুজনই নকআউট পর্বে পেনাল্টি মিস করেছেন, আবার দ্রুতই গোল করে নিজেদের ফিরে পেয়েছেন। মেসি মিশরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পর ৮৩তম মিনিটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে ফেরান। অন্যদিকে মরক্কোর বিপক্ষে পেনাল্টি ব্যর্থ হওয়ার পরও দুর্দান্ত এক গোল করে নিজের অষ্টম গোল পূর্ণ করেন এমবাপ্পে।
গোল সমান হলে অবশ্য সামান্য এগিয়ে থাকবেন এমবাপ্পে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, গোল সমান হলে অ্যাসিস্ট বিবেচনা করা হয়। এমবাপ্পের অ্যাসিস্ট তিনটি, যেখানে মেসির রয়েছে দুটি। ফলে সমান গোল নিয়ে শেষ করলে গোল্ডেন বুট যাবে ফরাসি তারকার দখলে।
তবে বিশ্বকাপের গোলের ইতিহাসেও চলছে আরেক লড়াই। ৩৯ বছর বয়সী মেসি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা, তার গোলসংখ্যা ২১। অন্যদিকে ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পে আছেন ২০ গোলে, মাত্র এক গোল পিছিয়ে। ফলে তাদের প্রতিটি গোল একই সঙ্গে বদলে দিচ্ছে গোল্ডেন বুটের লড়াই এবং বিশ্বকাপের রেকর্ডবুক।
মেসির বিশ্বকাপ গোলের যাত্রাও এবার নতুন উচ্চতায় উঠেছে। কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এ তিনি অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি করে গোল করেন এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে করেন দুটি গোল। চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুই গোল এবং জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে একটি করে গোল করেছেন তিনি।
অন্যদিকে সামনে তৈরি হচ্ছে এক স্বপ্নের ফাইনালের সম্ভাবনা। সেমিফাইনালে ফ্রান্স খেলবে স্পেনের বিপক্ষে। আর্জেন্টিনা নিজেদের ম্যাচ জিতলে নিউইয়র্কে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালে আবারও মুখোমুখি হতে পারেন মেসি ও এমবাপ্পে কাতারের লুসাইলের সেই মহাকাব্যিক ফাইনালের চার বছর পর।
হালান্ড এনে দিয়েছিলেন গোলের ঝড়। বেলিংহাম ও কেইন এখনো লড়াইয়ে আছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের গল্প আবারও ফিরে আসতে পারে সেই দুই মহাতারকার কাছে মেসি ও এমবাপ্পে। একজনের সামনে অধরা গোল্ডেন বুট, অন্যজনের সামনে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির সুযোগ।