আটক হওয়া যুবক © সংগৃহীত
নাটোরে বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার ও সংসদের হুইপের অনুষ্ঠানে পিস্তলসহ আটক হয়েছেন এক মেডিকেল শিক্ষার্থী। আটক যুবক শামস আল আমিন তামিম (২৯) নাটোরের প্রয়াত বিএনপি নেতা শামসুল আলমের ছেলে। তিনি বগুড়া টিএমএসএস মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ঘটনার পর আটক যুবকের কাছে থাকা পিস্তলটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। শুরুতে ওই যুবকের বরাত দিয়ে বস্তুটিকে তার প্রয়াত বাবার লাইসেন্স করা পিস্তল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে আটকের পর পুলিশ বলছে, সেটি খেলনা পিস্তল। তামিমের বাবা ছিলেন প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সার ডিলার শামসুল আলম। তবে তার সঙ্গে থাকা বস্তুটি কীভাবে তিনি সংগ্রহ করেছেন এবং কেন মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা তদন্ত করছে পুলিশ। জেলা প্রশাসনও বলছে, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) বিকেলে নাটোরের উত্তরা গণভবনের সামনে মন্ত্রীর পথসভা চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটের দিকে ওই পথসভায় জাতীয় সংসদের হুইপ অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, জেলা পরিষদের প্রশাসক রহিম নেওয়াজসহ জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের প্রায় সব নেতা উপস্থিত ছিলেন।
নাটোরে মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে আটক হওয়া যুবকের বিষয়ে পুলিশ প্রাথমিকভাবে আমাকে জানিয়েছে, এটি খেলনা পিস্তল। এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। পুলিশের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।—আসমা শাহীন, জেলা প্রশাসক, নাটোর
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পথসভা চলার সময় খয়েরি রঙের পোশাক পরা এক যুবককে পিস্তলসহ আটক করা হয়। তামিম নাটোর পৌরসভার কানাইখালী এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। তার বাবা শামসুল আলম নাটোরের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি সার ডিলার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর তামিম পারিবারিক সার ডিলারির ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তামিম পকেটে পিস্তল নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছিলেন। এ সময় তাকে আটক করা হয়।
এদিকে শুরুতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনসুর আলমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, মন্ত্রী মঞ্চ থেকে নামার সময় ওই যুবকের সঙ্গে দুইবার ধাক্কা লাগে। এতে সন্দেহ হলে পুলিশ তাকে পাশে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে তার কাছে একটি পিস্তল পাওয়া যায়। পরে পিস্তলসহ তাকে নাটোর সদর থানার হেফাজতে নেওয়া হয়।
এ সময় তামিম পুলিশকে বলেন, পিস্তলটি তার বাবার নামে লাইসেন্স করা। নিজের আত্মরক্ষার জন্য তিনি সেটি সঙ্গে এনেছেন। তিনি নিজেকে একজন শিক্ষার্থী বলেও পরিচয় দেন।
তবে পরে ওসি মো. মনসুর আলম এ বক্তব্যের বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এমন বক্তব্য আমি গণমাধ্যমে দিইনি। আমার বক্তব্য মিসকোট করা হয়েছে। আমি এখনো বলছি, শতভাগ সত্য এটি খেলনা পিস্তল। সে কেন অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে গিয়েছে, সেটিই আমরা এখন তদন্ত করছি।’
প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আটক যুবকের কাছ থেকে উদ্ধার করা পিস্তলটি খেলনা পিস্তল। তবে তিনি কেন খেলনা পিস্তলটি সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।—মোহাম্মদ ইফতে খায়ের আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, নাটোর
এদিকে অন্য একাধিক সূত্রের দাবি, তামিম দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত নেশাগ্রস্ত। তবে পুলিশ এই দাবি নাকচ করেছে। এসব সূত্র আরও দাবি করেছে, পিস্তলটি তার বাবার লাইসেন্স করা অস্ত্র হতে পারে। কারণ তার বাবার একটি লাইসেন্স পিস্তল ছিল। এছাড়াও এটির ওজন ও রংও অনেকটা আসল পিস্তলের মতো।
যদিও স্থানীয় কয়েকজন বলছে ‘এটি দারাজ থেকে কেনা খেলনা পিস্তল।’
আটকের পর অভিযুক্ত যুবক নিজেও পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে এটি একটি পিস্তল এবং এটির তার নিজেরই।
তবে গুলির চেষ্টাকে প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচার বলে দাবি করেছেন হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় হুইপের মুঠোফোনে যোগাযোগ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে এই তথ্য জানান তিনি।
নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) মোহাম্মদ ইফতে খায়ের আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, আটক যুবকের কাছ থেকে উদ্ধার করা পিস্তলটি খেলনা পিস্তল। তবে তিনি কেন খেলনা পিস্তলটি সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।
তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে ওই যুবককে আটক করার সময় সেখানে অনেক লোকজন ছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে থানায় নিয়ে আসা হয়। পরে থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং উদ্ধার করা পিস্তলটি পরীক্ষা করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, সেটি খেলনা পিস্তল।
ওই যুবকের পিস্তলটি তার বাবা শামসুল আলমের লাইসেন্স করা অস্ত্র—এমন তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, এটি তার বাবার অস্ত্র নয়। পিস্তলটি কীভাবে ওই যুবক সংগ্রহ করেছেন, সে বিষয়েও প্রাথমিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি মাদকাসক্ত নন। তিনি বগুড়ার টিএমএস মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ওই যুবক কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কি না জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, তার বাবা শামসুল আলম বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রায় দুই বছর আগে মারা গেছেন। তবে ওই যুবক বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক পদে আছেন বা কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত কি না এমন তথ্য পুলিশ এখনো পায়নি।
নাটোর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসমা শাহীন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নাটোরে মন্ত্রীর অনুষ্ঠানে আটক হওয়া যুবকের বিষয়ে পুলিশ প্রাথমিকভাবে আমাকে জানিয়েছে, এটি খেলনা পিস্তল। এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। পুলিশের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তিনি বলেন, পিস্তলটি আসল নাকি খেলনা, বিষয়টি তদন্তাধীন। পুলিশই এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে। পিস্তলটি যদি প্রকৃতপক্ষে লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র হয়, তখন লাইসেন্সের বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এটি খেলনা পিস্তল হলে লাইসেন্সের প্রশ্নই আসে না।’
আসমা শাহীন বলেন, ‘এ বিষয়ে আলাদাভাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কমিটি গঠন করা হবে না। বিষয়টি পুলিশ তদন্ত করছে। তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’