লিওনেল মেসি © সংগৃহীত
ওপেন প্লে-তে যার পায়ের জাদু বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তকে মোহিত করে, সেই লিওনেল মেসিই আবার পেনাল্টি স্পটে দাঁড়ালে কেন এত নড়বড়ে? ২০২৬ বিশ্বকাপে মিশরের বিপক্ষে পেনাল্টি হাতছাড়া করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এক লজ্জার রেকর্ড গড়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলারের পেনাল্টি স্পটের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা এখন ফুটবল বিশ্বে এক বড় রহস্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ওপেন প্লে-তে মেসির যে অতিমানবীয় সৃজনশীলতা তাঁকে সবার চেয়ে আলাদা করে, পেনাল্টি মারার ক্ষেত্রে সেটাই যেন তাঁর বিপক্ষে কাজ করে। যেমন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনের গোলরক্ষককে পরাস্ত করার একটি নির্দিষ্ট চাবুকের মতো শেষমুহূর্তে জোরালো ‘ট্রেডমার্ক’ শট রয়েছে। কিন্তু মেসির পেনাল্টি নেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট টেকনিক বা গোলপোস্টের চেনা কোনো কোণ নেই; তিনি একেক সময় পায়ের ভেতরের অংশ (ইনস্টেপ) এবং লেসের অংশ (লেসেস) ব্যবহার করে শটের ধরন পরিবর্তন করেন।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মেসি খুব ছোট এবং ধীরগতির রান-আপ নিয়ে পোস্টের কোণ দিয়ে নিচু শট নিতেন। এই পদ্ধতিতে পরপর একাধিক পেনাল্টি মিস হওয়ার পরও তিনি দীর্ঘদিন এই ধারা ধরে রেখেছিলেন। এছাড়া রেফারি বাঁশি দেওয়ার পরপরই মেসি সাধারণত খুব দ্রুত শট নিয়ে নেন। ফুটবল নিয়ে হওয়া বিভিন্ন গবেষণা বলছে, বাঁশি বাজার পর অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করে শট নেওয়া স্নায়ুচাপ বা নার্ভাসনেসের লক্ষণ, যা পেনাল্টি সফল হওয়ার হার অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
পরিসংখ্যানও মেসির এই দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দেয়। যে বছরই তিনি একাধিক পেনাল্টি নিয়েছেন, তার প্রতিটি বছরই অন্তত একটি করে পেনাল্টি মিস করেছেন। দুই বছর আগে কোপা আমেরিকায় ইকুয়েডরের বিপক্ষে 'পানেনকা' শট নিতে গিয়ে তিনি বল বারে মেরেছিলেন। এমনকি গত সেপ্টেম্বরে শার্লটের গোলরক্ষক ক্রিস্টিয়ান কালিনা স্রেফ গোললাইনে সোজা দাঁড়িয়ে থেকে মেসির একই রকম একটি চতুর শটকে অত্যন্ত হাস্যকর বানিয়ে দিয়েছিলেন।
অথচ গত বিশ্বকাপ আসরেই নিজের পেনাল্টি শটের ধরন বদলেছিলেন মেসি। কাতারের আসরে উদ্বোধনী ম্যাচে দুর্বল পেনাল্টি নিয়েও সৌদি আরবের বিপক্ষে গোল করেন মেসি, এরপর পোল্যান্ডের সাথে একটি গোল মিস করেন। তবে এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডস, সেমিতে ক্রোয়েশিয়া এবং ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে অসাধারণ শট নেন সর্বকালের সেরা এই ফুটবলার; একবারও সুযোগই দেননি গোলকিপারদের।
তবে পেনাল্টিতে তাঁর এই দৃশ্যমান দুর্বলতা থাকলেও, মাঠের অন্য সবকিছুতে তিনি তা বরাবরই পুষিয়ে দেন। যেমন চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের সেই একই ম্যাচে তিনি জোড়া গোল করেছিলেন, যা তাঁকে জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ পুরুষ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে। সব মহাতারকারই কোনো না কোনো দুর্বলতা থাকে, আর পেনাল্টি স্পটটিই হলো ফুটবল জাদুকর মেসির সেই একমাত্র দুর্বল জায়গা।