ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো: এক অপূর্ণ স্বপ্নের মহাকাব্যিক বিদায়

০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৬ AM
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো © সংগৃহীত

কিছু গল্প হয়তো ঐতিহাসিক, কিছু কিছু আবার ‘না’ পাওয়ার বেদনার, তবে এমন গল্পও আছে; যা কেবলই অশ্রুসিক্ত অধ্যায়েই পরিসমাপ্তি ঘটে। আর কিছু কিছু গল্পের সমাপ্তি এমনভাবেও ঘটে, যেখানে হাজারও প্রাপ্তির মাঝে বড় কোনো অপ্রাপ্তির হতাশা থেকে যায়। কেননা, হাজারও সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর কোনো ‘এক’ না পাওয়ার বেদনাতেই রচিত হয় সেই গল্পের পটভূমি। এমনই এক গল্পের নাম ‘ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’। নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারজুড়ে হাজারও রেকর্ড-অর্জনের ভিড়ে একমাত্র অপ্রাপ্তি স্বপ্নের বিশ্বকাপ শিরোপা ছুঁয়ে না দেখা। 

দুই যুগেরও বেশি সময় ফুটবল বিশ্বমঞ্চে রাজত্ব করেছেন। তার নাম উচ্চারিত হলেই চোখে সামনে অবিশ্বাস্য গোল, দুর্দান্ত ফিটনেস, অসম্ভব পরিশ্রম আর জয়ের অদম্য ক্ষুধার অধ্যায়ই ভেসে ওঠে। সময়ের প্রয়োজনে নিজের সীমানাকে বারবার ভেঙেছেন তিনি, বয়সকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভব বলে কিছুই নেই।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এমন কোনো ব্যক্তিগত মাইলফলক নেই, যা তিনি লুফে নেননি। পাঁচ পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, একাধিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লিগ শিরোপা, ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব—সবকিছুই তার হাত ধরে এসেছে। কিন্তু একটি ট্রফিই বারবার অধরা থেকে গেছে, সেটাই ফিফা বিশ্বকাপ।

সেই সোনালি ট্রফি জয়ের স্বপ্ন নিয়েই ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে নেমেছিলেন ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা। অবশ্য তিনি এ-ও জানতেন, এটাই হতে পারে শেষ সুযোগ। তাই হয়তো বয়স বাড়লেও তার চোখের জয়ের প্রতীক্ষার সেই আগুন তখনও দাও দাও করে জ্বলেছে। দেশের জার্সি গায়ে শেষবারের মতো বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। কিন্তু ফুটবল মাঝে মাঝেই সবচেয়ে নিষ্ঠুর চিত্রনাট্যই লিখে। এবারও বিধির লিখনের ব্যত্যয় ঘটল না।

স্পেনের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে দীর্ঘ ৯০ মিনিট জুড়েই লড়াই করেছে পর্তুগাল। প্রতিটি মুহূর্তজুড়ে টানটান উত্তেজনা, অপেক্ষা, আর শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার চেষ্টা। ইনজুরি টাইমের আগ পর্যন্তও মনে হচ্ছিল, হয়তো অতিরিক্ত সময়েই গড়াবে এই মহারণ। কিন্তু যোগ করা সময়েই মিকেল মেরিনোর একমাত্র গোল ভেঙে যায় রোনালদো আর পর্তুগালের স্বপ্ন।

আর রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর যে দৃশ্যের দেখা মিলল, তা হয়তো দীর্ঘদিন ভুলতে পারবেন না অনেক ফুটবলপ্রেমী। মাঠের মাঝখানেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন সিআর’সেভেন। তার চোখ-জোড়া তখন অশ্রুসিক্ত। সেই অশ্রু যেন ভিন্ন কিছুই বলছে, নিজের অসহায়ত্বের বার্তাই ফুটবলমঞ্চে দিচ্ছে। হয়তো এও বলছে, এটাই তো প্রিয়তমার অসমাপ্ত স্বপ্নের বিদায়ের অশ্রু। এ যেন নিঃশব্দ কষ্টের সঙ্গে লড়াইও।

৬ বিশ্বকাপ আর এক অবিস্মরণীয় যাত্রা

২০০৬ সালে জার্মানিতে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল রোনালদোর। সে সময়ে এক তরুণ প্রতিভা হিসেবে মাঠে নামলেও তার মাঝেই এক ভবিষ্যতের মহাতারকার ছায়া দেখা যাচ্ছিল। যদিও সেবারই সেমিফাইনালে উঠেছিল পর্তুগিজরা। এরপর ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৪ ব্রাজিল, ২০১৮ রাশিয়া, ২০২২ কাতার এবং সবশেষে ২০২৬! প্রতিটি বিশ্বকাপেই নতুন আশা নিয়ে, নতুন স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ৬টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম খেলোয়াড়ও তিনিই। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা, ম্যাচ সংখ্যা কিংবা রেকর্ডগুলো নিঃসন্দেহে অসাধারণ।

সংখ্যার বাইরে এক কিংবদন্তির গল্প

পর্তুগালের স্বপ্নের প্রতীকও রোনালদোই। যদিও তার ক্যারিয়ারকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কারণ, তিনি কেবল গোলই করেননি, বরং একটি প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করেছেন তিনি। যে শিশু তাকে দেখে ফুটবল শুরু করেছে, যে তরুণ তার মতো হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে, যে খেলোয়াড় তার পরিশ্রমের গল্প থেকে সাহস পেয়েছে; তাদের কাছে রোনালদো শুধুই একজন ফুটবলার নন। মানসিকতার অদম্য এক গল্প তিনি। এ যেন হার না মানার মানসিকতা। নিজেকে প্রতিদিন আগের দিনের চেয়ে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলার মানসিকতা।

অধরা কেবলই বিশ্বকাপ

ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তিই বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। ইয়োহান ক্রুইফ, ফেরেঞ্চ পুসকাস, পাওলো মালদিনিদের মতো কিংবদন্তিরাও এই অপূর্ণতা নিয়েই ক্যারিয়ার শেষ করেছেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নাম। তবে বিশ্বকাপ না জেতা কখনোই তার মহানত্বকে ছোট করতে পারেনি। বরং নিজের সেরাটা উড়াজ করেই দিয়েই প্রতিদিন লড়াই জিইয়ে রেখেছেন তিনি। আর শুধু ট্রফির সংখ্যা দিয়ে কারোর প্রাপ্তি-অর্জন বিচার হতে পারে না। তিনি তার প্রভাব দিয়ে, তার লড়াই দিয়েই মানুষের হৃদয়জুড়ে থাকবেন।

শেষ দৃশ্য, কিন্তু শেষ নয় গল্প

স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের পর রোনালদোর চোখের জল হয়তো কোটি মানুষের চোখেও জল এনে দিয়েছে। কিন্তু সেই কান্নার মধ্যেও ছিল গর্ব। কারণ, চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি তিনি। শেষ দিন পর্যন্ত লড়েছেন। দেশের হয়ে মাঠে নেমেছেন। নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন।

সবমিলিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি হয়তো কখনো তার হাতে উঠবে না। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে তার নাম লেখা থাকবে সোনালি অক্ষরে। কারণ, কিছু খেলোয়াড় ট্রফি জেতেন, আর কিছু খেলোয়াড় একটি যুগ তৈরি করেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো তো সেই দ্বিতীয় দলেরই একজন।

কান্নায় ভেঙে পড়া রোনালদোকে সান্ত্বনা দিলেন ইয়ামাল
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো: এক অপূর্ণ স্বপ্নের মহাকাব্যিক বিদায়
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
শেষ হলো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায়: সংখ্যায় সংখ্যায় পর্তুগিজ …
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
শেষ মুহূর্তের গোলে জয়, কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
যোগ করা সময়ের গোলে এগিয়ে স্পেন
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
ভুল প্রশ্নে এইচএসসি পরীক্ষা: গাইবান্ধায় ৯ কর্মকর্তাকে অব্যা…
  • ০৭ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence