শিরোপা জেতার লড়াইয়ে তারকারা © এআই সম্পাদিত
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার আগেই নকআউট পর্বের সম্ভাব্য সমীকরণ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন দলগুলো শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে কোনো তৃতীয় স্থান পাওয়া দলের মুখোমুখি হতে পারে। অন্যদিকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা স্পেনের মতো দল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলেও তাদের খেলতে হতে পারে অন্য গ্রুপের রানার্স-আপ দলের বিপক্ষে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—ফিফার এই নিয়ম কি কোনো দলকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে?
এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে বিশ্বকাপের নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাট। এবার ১২টি গ্রুপে চারটি করে দল খেলছে। প্রতিটি গ্রুপের প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান পাওয়া দল সরাসরি নকআউট পর্বে উঠছে। এতে মোট ২৪টি দল যোগ্যতা অর্জন করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও আটটি দল, যারা নিজ নিজ গ্রুপে তৃতীয় হলেও অন্য তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর তুলনায় ভালো পারফরম্যান্স করেছে। অর্থাৎ ১২টি গ্রুপের তৃতীয় হওয়া দলগুলোর মধ্যে সেরা আটটি দলও নকআউটে জায়গা পাচ্ছে। এভাবেই ৩২ দলের নকআউট পর্ব পূর্ণ হচ্ছে।
এখান থেকেই শুরু হচ্ছে জটিলতা। কারণ ১২টি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন এবং ১২টি রানার্স-আপ থাকলেও নকআউটে রয়েছে অতিরিক্ত আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল। ফলে সব গ্রুপ চ্যাম্পিয়নকে রানার্স-আপের বিপক্ষে খেলানো সম্ভব নয়। কিছু গ্রুপ চ্যাম্পিয়নকে বাধ্যতামূলকভাবে তৃতীয় স্থান পাওয়া দলের বিপক্ষে খেলতে হবে।
এই সমস্যার সমাধানে ফিফা আগেই একটি নির্দিষ্ট নকআউট কাঠামো তৈরি করেছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে কোন কোন গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন সম্ভাব্যভাবে তৃতীয় স্থানধারী দলের মুখোমুখি হবে এবং কোন দল রানার্স-আপের বিপক্ষে খেলবে।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, জার্মানি যদি ‘ই’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়, তাহলে তারা ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ বা ‘এফ’ গ্রুপ থেকে উঠে আসা সেরা তৃতীয় কোনো দলের মুখোমুখি হবে। একইভাবে ফ্রান্স ‘আই’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হলে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ‘সি’, ‘ডি’, ‘এফ’, ‘জি’ বা ‘এইচ’ গ্রুপ থেকে আসা কোনো সেরা তৃতীয় দল। ইংল্যান্ড ‘এল’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হলে তাদের প্রতিপক্ষ আসবে ‘ই’, ‘এইচ’, ‘আই’, ‘জে’ বা ‘কে’ গ্রুপের সেরা তৃতীয় দলগুলোর মধ্য থেকে।
শুধু জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড নয়, মেক্সিকো, কানাডা, কলম্বিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং মিশরের মতো গ্রুপ চ্যাম্পিয়নদের জন্যও একই ধরনের সমীকরণ নির্ধারণ করে রেখেছে ফিফা।
অন্যদিকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস কিংবা স্পেনের মতো দলগুলো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে তাদের প্রতিপক্ষ হওয়ার কথা অন্য কোনো গ্রুপের রানার্স-আপ দল।
ফিফার এই নিয়মে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিপক্ষ নির্ধারণ করা হয় না কোনো দেশের নাম দেখে। বরং কোন গ্রুপ থেকে দলটি এসেছে, সেটির ভিত্তিতে প্রতিপক্ষ নির্ধারিত হয়।
ধরা যাক, সুইডেন ‘এফ’ গ্রুপ থেকে তৃতীয় হয়ে নকআউটে উঠল। সে ক্ষেত্রে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ হিসেবে সুইডেনকে পাওয়া সম্ভব। কারণ ‘এফ’ গ্রুপ ফ্রান্সের জন্য নির্ধারিত সম্ভাব্য গ্রুপগুলোর একটি।
ফিফার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই নিয়মের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রুপ পর্বের ম্যাচের পুনরাবৃত্তি এড়ানো এবং পুরো নকআউট ছককে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা। অর্থাৎ কোনো দল যেন শেষ ৩২-এর ম্যাচেই নিজেদের গ্রুপের পরিচিত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি না হয়।
এই কারণে ফিফা তাদের প্রতিযোগিতা বিধির ‘অ্যানেক্স সি’-তে মোট ৪৯৫টি সম্ভাব্য সমন্বয় তৈরি করেছে। কোন আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল নকআউটে উঠবে, তার ওপর ভিত্তি করে এই শত শত সম্ভাবনার মধ্যে একটি চূড়ান্ত সমীকরণ কার্যকর হবে।
তবে নিয়মটি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। অনেক সমর্থকের মতে, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পুরস্কার হওয়া উচিত অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়া। কিন্তু বর্তমান কাঠামোয় কোনো কোনো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন তৃতীয় হওয়া দলের মুখোমুখি হলেও অন্য কোনো গ্রুপ চ্যাম্পিয়নকে রানার্স-আপ দলের বিপক্ষে খেলতে হচ্ছে।
আবার অনেকের মতে, তৃতীয় হওয়া দল মানেই দুর্বল দল নয়। কোনো কঠিন গ্রুপ থেকে তৃতীয় হয়ে ওঠা দল অনেক সময় অপেক্ষাকৃত সহজ গ্রুপের রানার্স-আপের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে। ফলে কাগজে-কলমে এটি সুবিধা মনে হলেও বাস্তবে সবসময় তা নাও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাট আরও বেশি দেশকে সুযোগ দিয়েছে এবং প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে। তবে এর ফলে নকআউট পর্বের সমীকরণও অনেক বেশি জটিল হয়ে গেছে, যা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ফিফা অবশ্য বলছে, এখানে কোনো দলকে আলাদা সুবিধা দেওয়া হয়নি। কারণ টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই সব নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে এবং একই নিয়ম সব দলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
তবু বর্তমান সমীকরণে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ যদি তৃতীয় স্থান পাওয়া দল হয় এবং ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা স্পেনকে রানার্স-আপ দলের বিপক্ষে খেলতে হয়, তাহলে এই নিয়ম কতটা ন্যায্য—সেই প্রশ্ন ও বিতর্ক বিশ্বকাপজুড়েই চলবে বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
ফিফার ম্যাচ ফিক্সার অনুযায়ীঃ
জার্মানি (‘ই’ গ্রুপের ১ম) × পরাগুয়ে (এ, বি, সি, ডি, এফ গ্রুপের মধ্যে থেকে আসা সেরা ৩য়)
ফ্রান্স (‘আই’ গ্রুপের ১ম) × সুইডেন (সি, ডি, এফ, জি, এইচ গ্রুপের মধ্যে থেকে আসা সেরা ৩য়)
দক্ষিণ কোরিয়া (‘এ’ গ্রুপের ২য়) × সুইজারল্যান্ড (‘বি’ গ্রুপের ২য়)
নেদারল্যান্ডস (‘এফ’ গ্রুপের ১ম) × মরক্কো (‘সি’ গ্রুপের ২য়)
পর্তুগাল (‘কে’ গ্রুপের ২য়) × ঘানা (‘এল’ গ্রুপের ২য়)
স্পেন (‘এইচ’ গ্রুপের ১ম) × অস্ট্রিয়া (‘জে’ গ্রুপের ২য়)
যুক্তরাষ্ট্র (‘ডি’ গ্রুপের ১ম) × আলজেরিয়া (বি, ই, এফ, আই, জে গ্রুপের মধ্যে থেকে আসা সেরা ৩য়)
মিশর (‘জি’ গ্রুপের ১ম) × চেক প্রজাতন্ত্র (এ, ই, এইচ, আই, জে গ্রুপের মধ্যে থেকে আসা সেরা ৩য়)
ব্রাজিল (‘সি’ গ্রুপের ১ম) × জাপান (‘এফ’ গ্রুপের ২য়)
আইভরি কোস্ট (‘ই’ গ্রুপের ২য়) × নরওয়ে (‘আই’ গ্রুপের ২য়)
মেক্সিকো (‘এ’ গ্রুপের ১ম) × স্কটল্যান্ড (সি, ই, এফ, এইচ, আই গ্রুপের মধ্যে থেকে আসা সেরা ৩য়)
ইংল্যান্ড (‘এল’ গ্রুপের ১ম) × কেপ ভার্দে (ই, এইচ, আই, জে, কে গ্রুপের মধ্যে থেকে আসা সেরা ৩য়)
আর্জেন্টিনা (‘জে’ গ্রুপের ১ম) × উরুগুয়ে (‘এইচ’ গ্রুপের ২য়)
অস্ট্রেলিয়া (‘ডি’ গ্রুপের ২য়) × ইরান (‘জি’ গ্রুপের ২য়)
কানাডা (‘বি’ গ্রুপের ১ম) × বেলজিয়াম (ই, এফ, জি, আই, জে গ্রুপের মধ্যে থেকে আসা সেরা ৩য়)
কলম্বিয়া (‘কে’ গ্রুপের ১ম) × ক্রোয়েশিয়া (ডি, ই, আই, জে, এল গ্রুপের মধ্যে থেকে আসা সেরা ৩য়)
তবে এগুলো এখনো চূড়ান্ত নয়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলোর ফলাফল বদলে দিতে পারে পুরো সমীকরণ। তাই শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত নকআউট পর্বের এই সম্ভাব্য ছকেও পরিবর্তন আসার সুযোগ রয়েছে।