রোনালদো © সংগৃহীত
২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে পর্তুগাল। তবে ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পারফরম্যান্স। রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নামা এই কিংবদন্তির অফ-ফর্ম নিয়ে ফুটবল বিশ্বে এখন চলছে তীব্র বিতর্ক। স্কাই স্পোর্টসের ফুটবল বিশ্লেষক ক্যালাম বিশপের এক প্রতিবেদনে রোনালদোর বর্তমান ফর্ম এবং দলের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের এক চুলচেরা বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।
চলতি বিশ্বকাপের শুরুটা যেখানে কিলিয়ান এমবাপ্পে জোড়া গোল দিয়ে এবং এরলিং হালান্ড গোল করে রাঙিয়েছেন, সেখানে রোনালদোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে করেছেন দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক। যেখানে শেষ ১০ ম্যাচে মেসির গোলসংখ্যা ৯টি, সেখানে বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে (বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে) রোনালদোর গোলখরা এখন টানা ১০ ম্যাচের, যা গত ৪ বছর ধরে চলছে।
কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিটে রোনালদো বল ছুঁয়েছেন মাত্র ২৯ বার, যা শুরুর একাদশে থাকা পর্তুগিজ খেলোয়াড়দের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। পুরো ম্যাচে তিনি গোলপোস্টে মাত্র ৩টি শট নিতে পেরেছিলেন, যা মেসির করা হ্যাটট্রিক গোলের সমান। মাঠজুড়ে তাঁর এমন নিস্পৃহ উপস্থিতি পর্তুগালের আক্রমণভাগকে পুরোপুরি স্থবির করে দিয়েছিল।
ম্যাচ শেষে তীব্র সমালোচনা ধেয়ে এলেও দলের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ কিন্তু তাঁর অধিনায়কের পাশেই দাঁড়িয়েছেন। তিনি উল্টো দায় চাপিয়েছেন দলের বাকি কুশলীদের ওপর। মার্তিনেজ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যে ম্যাচে গোল প্রয়োজন, সেখানে বিশ্ব ফুটবলের সেরা গোলদাতাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার কোনো মানে হয় না। বক্সের ভেতর ক্রিশ্চিয়ানোর অভিজ্ঞতা দলের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং সে যেভাবে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের নিজের দিকে টেনে রাখে, তাতে দলের অন্য খেলোয়াড়দের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। তাই যখনই দলের গোল দরকার, তখন ক্রিশ্চিয়ানোকে মাঠেই রাখতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
পর্তুগাল দলে ব্রুনো ফার্নান্দেজ, বার্নার্দো সিলভা, পেড্রো নেতো বা ভিতিনহার মতো বিশ্বমানের ক্রিয়েটর থাকা সত্ত্বেও মার্তিনেজের এমন দাবি বেশ সাহসী। তবে পরিসংখ্যান বলছে, রোনালদো মাঠে থাকাকালীন পর্তুগাল দলগতভাবে সুযোগ তৈরি করতে যেমন ব্যর্থ হচ্ছে, তেমনি রোনালদো নিজেও তাঁর চিরচেনা ‘ক্লিনিকাল এজ’ বা গোল করার সুনিশ্চিত সামর্থ্য হারিয়েছেন।
গোল করার সহজ সুযোগ হাতছাড়া করার ক্ষেত্রে রোনালদোর পরিসংখ্যান এখন মাইনাস ২.৮ (-২.৮)। এর মানে হলো, তাঁর নেওয়া শটগুলোর মান অনুযায়ী যেখানে অন্তত ৩টি গোল হওয়া উচিত ছিল, সেখানে তিনি একটিও পাননি। অন্যদিকে হ্যারি কেইন বা এমবাপ্পের মতো স্ট্রাইকাররা এই ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি গোল করে অনেক এগিয়ে আছেন।
তাছাড়া কঙ্গোর বিপক্ষে রোনালদোর ‘টাচম্যাপ’ ও ‘হিটম্যাপ’ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি মূলত মাঠের বাম প্রান্তে একাকী পজিশনে বন্দি ছিলেন। হ্যারি কেইন বা মেসির মতো নিচে নেমে এসে খেলা তৈরিতে তাঁর কোনো ভূমিকা ছিল না, যা দলের তরুণ উইঙ্গার পেড্রো নেতো বা নুনো মেন্দেসের স্বাভাবিক খেলাকেও ব্যাহত করেছে।
কোচ মার্তিনেজ হয়তো এক রোনালদোর জন্য তাঁর পুরো ক্রিয়েটিভ ইউনিটকে বদলে ফেলতে পারবেন না, আবার রোনালদোকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সাহসও দেখাচ্ছেন না। ফুটবল বোদ্ধাদের আশঙ্কা, পর্তুগালের এই সোনালী প্রজন্মের ফুটবলারদের আরও একটি বড় টুর্নামেন্ট কেবল আক্ষেপের গল্প হয়েই শেষ হতে যাচ্ছে।