ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো © সংগৃহীত
পাঁচবারের ব্যালন ডি'অর জয়ী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অর্জনের খাতা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সমৃদ্ধতম। ক্যারিয়ারে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সম্ভাব্য প্রায় সব শিরোপাই ছুঁয়ে দেখেছেন এই পর্তুগিজ মহাতারকা। সুদীর্ঘ পথচলায় তার মোট গোলসংখ্যা এখন ৯৭০টি। পর্তুগালের জার্সিতে ২২৯ ম্যাচে ১৪৩ গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটি তিনি অনেক আগেই নিজের করে নিয়েছেন।
ক্লাব ফুটবলেও তার সাফল্য আকাশচুম্বী, যেখানে ১৮৩ ম্যাচে ১৪০ গোল নিয়ে তিনি চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালি মাতিয়ে বর্তমানে সৌদি আরবের লিগে খেলছেন এবং প্রতিটি লিগেই মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতার কীর্তি গড়েছেন। তার ঝুলিতে রয়েছে ৪টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু। ২০১৬ সালে পর্তুগালকে ইউরো জেতাতেও রেখেছিলেন অগ্রণী ভূমিকা। অথচ তারকায় ঠাসা বর্তমান পর্তুগাল দলের হয়ে এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপেও নিজের চেনা ছন্দ খুঁজে পাচ্ছেন না ৪১ বছর বয়সি এই স্ট্রাইকার।
কঙ্গো ম্যাচে ব্যর্থতা ও অঁরির কড়া সমালোচনা
কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে মাঠে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন সিআরসেভেন। কঙ্গোর রক্ষণভাগের কড়া পাহারায় পুরো ম্যাচে মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করতে পেরেছিলেন তিনি, যা তাঁর দীর্ঘ বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন টাচের অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড। ম্যাচজুড়ে ৩টি শট নিলেও তার একটিও প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের সীমানা খুঁজে পায়নি।
ম্যাচ শেষে ফক্স স্টুডিওতে পর্তুগিজ অধিনায়কের তীব্র সমালোচনা করেছেন ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি। অঁরি স্পষ্ট জানিয়েছেন, গোল করার জন্য রোনালদোর অতিরিক্ত মরিয়া ভাব ও স্বার্থপর মানসিকতার কারণেই ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওয়ের পাস থেকে ব্রুনো ফার্নান্দেজের নিশ্চিত গোলের সুযোগটি হাতছাড়া হয়েছে।
বড় টুর্নামেন্টে টানা ১০ ম্যাচের গোলখরা
এই নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের পর বড় টুর্নামেন্টে রোনালদোর আন্তর্জাতিক গোল খরা আরও দীর্ঘায়িত হলো, যা ফিফা বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে টানা ১০ ম্যাচে গিয়ে ঠেকল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ঘানার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের উদ্বোধনী ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করার পর বড় টুর্নামেন্টে পর্তুগালের হয়ে তাঁর গোল করা যেন এক অবিশ্বাস্য ধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
কাতার বিশ্বকাপের শেষ ৪টি ম্যাচ এবং ২০২৪ সালের ইউরো কাপের ৫টি ম্যাচে গোল করতে ব্যর্থ হন তিনি। পরিসংখ্যান বলছে, এই টানা ১০টি ম্যাচে ক্রিশ্চিয়ানো গোলমুখে মোট ৩৩টি শট নিয়েছেন, যার মধ্যে ১১টি শটই ছিল অন-টার্গেট, অথচ একটি বলও প্রতিপক্ষের জালের সীমানা খুঁজে পায়নি।
নকআউটের গেরো ও ভক্তদের প্রার্থনা
বিশ্বমঞ্চে রোনালদোর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ও লজ্জার রেকর্ডটি হলো, ক্যারিয়ারে এখনো তাঁর কোনো নকআউট গোল নেই। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপগুলোতে অংশ নিয়ে নকআউট পর্বে গেলেও কখনোই কোনো গোল দিতে পারেননি তিনি।
ফিফার নতুন নিয়মে দল বেড়ে যাওয়ায় এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের পরেই দলগুলোকে লড়তে হবে রাউন্ড অব ৩২ বা সেরা বত্রিশের নকআউট পর্বে। শক্তির সমীকরণে পর্তুগালের এই পর্বে জায়গা করে নেওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল, আর তাই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি রোনালদো ভক্তের একটাই প্রার্থনা—নকআউট পর্বের এই বিশাল অপবাদ ঘুচিয়ে অন্তত একটি গোল যেন পান তাদের প্রিয় তারকা।
মেসি বনাম রোনালদো: দুই মহাতারকার বিপরীত চিত্র
চলতি ২০২৬ সালের এই বিশেষ বিশ্বকাপে রোনালদো ছাড়াও আরও দুজন খেলোয়াড় নিজেদের ৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ আসরে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে মেক্সিকান গোলরক্ষক গুইলার্মো ওচোয়া এখনো এই আসরে মাঠে নামেননি।
অন্যজন হলেন রোনালদোর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি, যিনি নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ আসরে যেন রূপকথার ডানায় ভর করে উড়ছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে চোখ ধাঁধানো এক হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছেন ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি। এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা ১৬-তে নিয়ে গিয়ে তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বকালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন।
যেখানে রোনালদোর নকআউট গোল শূন্য, সেখানে বিশ্বকাপে মেসির নকআউট গোল সংখ্যা ৫টি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এত এত রেকর্ডের মালিক রোনালদোকে তাই বিশ্বকাপের নকআউটের এই গোল খরা ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক বড় আক্ষেপের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।