লিওনেল স্কালোনি © সংগৃহীত
বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার মিশনে এবার কৌশলেই বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। কাতার বিশ্বকাপে বল দখল ও মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করা দলটিকে এবার আরও দ্রুত, সরাসরি ও আক্রমণাত্মক 'ভ্যার্টিকেল' ফুটবলে রূপ দিতে চান তিনি। সেই লক্ষ্যেই বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেতে পারেন এমন কিছু তরুণ ফুটবলার, যারা এতদিন আলোচনার বাইরে ছিলেন।
বিশ্বকাপের দল ঘোষণার আগে ডিএসপোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্কালোনি বলেন, ‘নির্বাচনের মানদণ্ড আগের মতোই—খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স। আমরা চাই না চূড়ান্ত তালিকায় পরে খুব বেশি পরিবর্তন আনতে হোক, তাই আরও কিছু সময় নিচ্ছি।’
এরপরই আর্জেন্টিনা কোচ তার নতুন পরিকল্পনার কথা স্পষ্ট করেন। স্কালোনি বলেন, ‘আমরা এমন কিছু খেলোয়াড় চাই, যারা প্রয়োজন হলে আমাদের ভিন্নভাবে খেলতে সাহায্য করবে—আরও বেশি গতি, আরও বেশি ভার্টিক্যাল ফুটবল নিয়ে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এটি হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সফলতার মূল ভিত্তি ছিল মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য। এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও হুলিয়ান আলভারেজ সেই কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। পরে থিয়াগো আলমাদা ও অ্যাঞ্জেল কোরেয়ার মতো ফুটবলাররাও প্রয়োজনের সময়ে দলে অবদান রাখেন। তবে আধুনিক ফুটবলে দ্রুত ট্রানজিশন, উইঙ্গারদের গতি ও সরাসরি আক্রমণের গুরুত্ব বাড়ায় এবার কৌশল বদলাচ্ছেন স্কালোনি।
এই নতুন পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে নিকো পাজ ও জুলিয়ানো সিমিওনের নাম। তাদের গতি, পরিশ্রম ও আক্রমণাত্মক মানসিকতা স্কালোনির নতুন ফুটবল দর্শনের সঙ্গে মানানসই বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শুধু এই দুজনই নন, শেষ মুহূর্তে আরও কয়েকটি চমক দেখা যেতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ভ্যালেন্তিন বারকোও স্কালোনির পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছেন। সাম্প্রতিক প্রীতি ম্যাচগুলোতে তাকে দলে ডাকা হয়েছে। আগামী মৌসুমে চেলসিতে খেলার সম্ভাবনায় থাকা এই তরুণকে নিয়ে আশাবাদী কোচিং স্টাফ।
অন্যদিকে এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার পারফরম্যান্সও নতুন করে ভাবাচ্ছে স্কালোনিকে। ২৯ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার ধারাবাহিক ভালো খেলায় জাতীয় দলে ফেরার লড়াইয়ে আছেন। তবে তাকে জায়গা দিতে হলে জিওভানি লো সেলসোর মতো অভিজ্ঞ ফুটবলারের জায়গা নিয়ে ভাবতে হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে মাতিয়াস সুলের নাম। আর্জেন্টাইন গণমাধ্যম ক্লারিন জানিয়েছে, স্কালোনির বাছাই প্রক্রিয়া পেরিয়ে এখন ৬-৭ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড। সেখান থেকেই চূড়ান্ত তিনটি জায়গা পূরণ করা হবে।
কোচিং স্টাফের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র ক্লারিনকে জানিয়েছে, ‘সে প্রথম ধাপ পেরিয়েছে এবং এখন শেষ কয়েকজনের তালিকায় আছে। তবে তার বিপক্ষে গেছে বিষয়টি হলো, ইনজুরির কারণে শেষ ক্যাম্পে থাকতে পারেনি। আর নিকো পাজের সঙ্গে তার খেলার ধরনও অনেকটা একই রকম।’
স্কালোনির কাঙ্ক্ষিত ‘ভার্টিক্যাল’ ফুটবলের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে ধরা হচ্ছে সুলেকে। রোমার হয়ে মৌসুমের প্রথম অংশে দুর্দান্ত খেলেছেন তিনি। যদিও পরে চোটের কারণে কিছু ম্যাচ মিস করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ৪২ ম্যাচে ৭ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করেছেন এই তরুণ ফুটবলার।
দেশে ফিরে সুলে বলেন, ‘মৌসুমের প্রথম অংশটা খুব ভালো কেটেছে। পরে পিউবালজিয়ার কারণে কিছু ম্যাচে সমস্যা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত খেলতে পেরেছি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। জানি বিশ্বকাপের দলে জায়গা পাওয়া কঠিন। আর্জেন্টিনায় অনেক ভালো খেলোয়াড় আছে, প্রতিযোগিতাও অনেক বেশি। তারপরও আশা তো থাকেই। যদি এবার না হয়, তাহলে আরও পরিশ্রম করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বকাপে থাকা স্বপ্নের মতো হবে। আর যদি সুযোগ না পাই, তাহলে সব সময়ের মতোই দলকে সমর্থন করব। ভীষণ উত্তেজনা কাজ করছে।’
গতি ও সরাসরি আক্রমণাত্মক ফুটবলে অবদান রাখতে পারেন জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ান্নি, আলেহান্দ্রো গার্নাচো ও ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়োনোর মতো ফুটবলাররাও। তবে আপাতত স্কালোনির পরিকল্পনায় তারা কিছুটা পিছিয়ে আছেন। প্রেস্টিয়ান্নির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গার্নাচো এখনো পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি। আর তরুণ মাস্তান্তুয়োনোকেও জায়গা পেতে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। স্বাভাবিকভাবেই অধিনায়ক হিসেবে থাকছেন লিওনেল মেসি। এর মাধ্যমে রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছেন এই কিংবদন্তি ফুটবলার।
কাতারের বিশ্বজয়ী দলের মূল কাঠামো ধরে রাখলেও এবারের স্কোয়াডে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন স্কালোনি। বড় চমক হিসেবে জায়গা হয়নি ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়োনোর। একই সঙ্গে বাদ পড়েছেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার মার্কোস আকুনিয়াও। তবে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজদের মতো পরীক্ষিতদের পাশে জুলিয়ানো সিমিওনের মতো নতুন মুখদের রেখে ভারসাম্যপূর্ণ দল গড়েছেন কোচ।
গোলপোস্টে দিবু মার্টিনেজ, রক্ষণে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং আক্রমণে লাউতারো মার্টিনেজ, হুলিয়ান আলভারেজ ও মেসিদের উপস্থিতিতে আবারও শক্তিশালী দল হিসেবেই বিশ্বকাপে নামছে আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিকার ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড:
গোলরক্ষক: এমিলিয়ানো মার্টিনেজ (অ্যাস্টন ভিলা), হেরোনিমো রুলি (অলিম্পিক মার্সেই), হুয়ান মুসো (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ)।
ডিফেন্ডার: ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো (টটেনহ্যাম হটস্পার), লিসান্দ্রো মার্টিনেজ (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), নিকোলাস ওতামেন্দি (বেনফিকা), নিকোলাস তালিয়াফিকো (অলিম্পিক লিওঁ), নাহুয়েল মলিনা (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), গনজালো মন্তিয়েল (রিভার প্লেট), লিওনার্দো বালের্দি (অলিম্পিক মার্সেই), ফাকুন্দো মেদিনা (অলিম্পিক মার্সেই)।
মিডফিল্ডার: রদ্রিগো দে পল (ইন্টার মায়ামি), এনজো ফার্নান্দেজ (চেলসি), অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার (লিভারপুল), লেয়ান্দ্রো পারেদেস (বোকা জুনিয়র্স), জিওভানি লো সেলসো (রিয়াল বেটিস), এক্সেকিয়েল পালাসিওস (বায়ার লেভারকুজেন), ভ্যালেন্তিন বারকো (রেসিং স্ট্রাসবুর্গ)।
ফরোয়ার্ড: লিওনেল মেসি (ইন্টার মায়ামি), হুলিয়ান আলভারেজ (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), লাউতারো মার্টিনেজ (ইন্টার মিলান), নিকো গনজালেজ (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), থিয়াগো আলমাদা (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), জুলিয়ানো সিমিওনে (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), নিকো পাজ (কোমো), হুয়ান ম্যানুয়েল লোপেজ (পালমেইরাস)।