ছবিটি প্রতীকী © সংগৃহীত
সময়টা ১৯৮৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর; প্রায় দেড় লাখেরও বেশি দর্শক-সমর্থকে কানায় কানায় পূর্ণ ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়াম। সাম্বার ছন্দে গমগম করা পরিবেশে চরম উত্তেজনা। এর নেপথ্য কারণ এই ম্যাচের ফলই ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও চিলির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
ব্রাজিলের সামনে সহজ সমীকরণ, ড্র করলেই বিশ্বকাপ নিশ্চিত। অন্যদিকে চিলির অবস্থা একেবারে ‘ডু অর ডাই’; জিততেই হবে, না হলে নিশ্চিত বিদায়।
এমন সমীকরণের মুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই যোজন-যোজন এগিয়ে ছিল ব্রাজিল। সেবাস্তিয়াও লাজারোনির দলটি সে সময়ে কেবলই শিল্পনির্ভর ফুটবলে সীমাবদ্ধ ছিল না; রবং শক্তি ও পরিকল্পনার মিশেলে ভয়ঙ্কর এক দল হয়ে উঠেছিল। কেয়ারেকা, রোমারিও, বেবেতোর মতো তারকারা সেই স্কোয়াডে ছিলেন।
অন্যদিকে চিলির সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন গোলরক্ষক রবার্তো রোজাস। অসাধারণ রিফ্লেক্স আর সেভ করার ক্ষমতার জন্য ‘কনদোর’ নামে পরিচিত ছিলেন তিনি, আকাশে ভেসে বেড়ানো সেই বিশাল পাখির মতোই যেন গোল বাঁচাতেন তিনি। ম্যাচের শুরু থেকেই তার একের পর এক সেভে কিছুটা থমকে যায় ব্রাজিলও।
প্রথমার্ধে বল দখলে আধিপত্য ছিল সেলেসাওদের, কিন্তু প্রত্যাশিত গোল আসছিল না। পক্ষান্তরে সুসংগঠিত ও দৃঢ় ছিল চিলির রক্ষণভাগ। তবে দ্বিতীয়ার্ধের ৪৯তম মিনিটেই ভেঙে যায় সেই বাধা। ব্রাঙ্কোর ক্রস থেকে দারুণ হেডে গোল করেন কেয়ারেকা। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। সমর্থকরাও আনন্দের জোয়ারে ভাসেন। তবে এরপরই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত নাটকগুলোর একটি শুরু হয়।
ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে হঠাৎ গ্যালারি থেকে একটি রংমশাল গোলরক্ষক রোজাসের কাছাকাছি এসে পড়ে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি, মুখ চেপে ধরে যন্ত্রণার ভানও করতে থাকেন। ক্ষোভে রেফারির দিকে এগিয়ে যান চিলির খেলোয়াড় ও কর্মকর্তারা। মাঠেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। রক্তাক্ত দেখিয়ে স্ট্রেচারে করে রোজাসকেও মাঠের বাইরে নেওয়া হয়। প্রতিবাদ জানিয়ে চিলি দলও মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। আর্জেন্টাইন রেফারি হুয়ান কার্লোস লসাও ম্যাচ স্থগিত করেন।
চিলির দাবি ছিল, স্বাগতিক সমর্থকদের আক্রমণে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে তারা, তাই ব্রাজিলকে শাস্তি দিয়ে তাদেরকেই বিশ্বকাপে পাঠানো হোক। সেই সময় ম্যাচ বন্ধ করে দিলেও তদন্ত চলতে থাকে। কিন্তু তদন্তে বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি।
ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ফিফা দেখতে পায়, রংমশালটি রোজাসের গায়ে লাগেনি, বরং তার থেকে প্রায় এক মিটার দূরে পড়েছিল। এরপর আরও চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছিল। জানা যায়, রোজাস নিজেই গ্লাভসের ভেতরে লুকানো ব্লেড দিয়ে নিজের ভ্রু কেটে রক্তাক্ত অবস্থার ভান করেছিলেন।
পরে রোজাস নিজেও স্বীকার করেন, এটি পূর্বপরিকল্পিত নাটক ছিল। ম্যাচের দুই দিন আগেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ধারণা ছিল, গ্যালারি থেকে কিছু ঘটলে তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাবেন। কিন্তু পরিকল্পনা ধরা পড়ে যাওয়ায় পুরো ঘটনা উল্টো ফল বয়ে আনে।
ফিফা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে চিলিকে ২-০ গোলে পরাজিত ঘোষণা করে এবং ১৯৯০ বিশ্বকাপ থেকে তো বটেই, ১৯৯৪ বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব থেকেও তাদের নিষিদ্ধ করা হয়। রোজাসকে ফুটবল থেকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। দলের কোচ ও চিকিৎসককেও দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০০১ সালে রোজাসের আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তবে ততদিনে তার ক্যারিয়ার প্রায় শেষ। সেই বছর সান্তিয়াগোতে ইভান জামোরানোর বিদায়ী ম্যাচে তিনি শেষবার মাঠে নামেন, তাকে দাঁড়িয়ে করতালিতে বিদায় জানান দর্শকরা।
আর যে রংমশালটি গ্যালারি থেকে ছুড়েছিলেন রোজমেরি মেলো, তাকে পুলিশ কিছু সময়ের জন্য আটক করলেও পরে ছেড়ে দেয়। ঘটনাটি তাকে সাময়িকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে, এমনকি পরবর্তীতে মডেলিংয়েও যুক্ত হন তিনি।