ফেসবুকে সমালোচনা

শিল্পকলার সামনে পশ্চিমবঙ্গের লেখক-চলচ্চিত্রকারদের ছবি, উপেক্ষিত দেশের শিল্পী-নারী ব্যক্তিত্বরা

০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪২ AM , আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৮ AM
শিল্পকলা সংলগ্ন দেয়ালে ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে

শিল্পকলা সংলগ্ন দেয়ালে ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে © সংগৃহীত

শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন দেয়ালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১০ জন লেখক-সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ছবি আঁকা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের গুণী ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ পশ্চিমবঙ্গের ৩ সাহিত্যিক-চলচ্চিত্রকার ঠাঁই পেয়েছেন এই দেয়ালিকায়। নেটিজেনরা বলছেন, দেশীয় ব্যক্তিত্বদের আরও অনেককেই তালিকায় রাখা যেত। এ ছাড়া একই রকম অঙ্কন পশ্চিমবঙ্গের কোথাও হলে সেখানে বাংলাদেশি গুণী ব্যক্তিদের রাখা হতো কিনা—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। একই সাথে প্রশ্ন উঠেছে নারী ব্যক্তিত্বদের অনুপস্থিতি নিয়েও।

সম্প্রতি রাজধানীর সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করে নতুন রূপে সাজিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাত পুনরায় দখল করলে হকারদের মালামাল বাজেয়াপ্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংস্থাটি।

সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে এলাকাটিতে মৎস্য ভবনের দিকে যেতে শিল্পকলা একাডেমির সীমানা প্রাচীরের উল্টো পাশে দখলমুক্ত ফুটপাতে নতুন ডাস্টবিন ও বিশ্রামের বেঞ্চও বসানো হয়েছে। ফুটপাতের পাশের দেয়ালে আঁকা হয়েছে এসব গুণী ব্যক্তিত্বের গ্রাফিতি। গত সোমবার সকালে উদ্ধার করা ফুটপাতের সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম।

দেয়ালে আঁকা গুণী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ফকির লালন শাহ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও এসএম সুলতান, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম এবং অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদী। একই সাথে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ পশ্চিমবঙ্গের ঔপন্যাসিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ছবিও আঁকা হয়েছে দেয়ালটিতে।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কঠোর সমালোচনা করেছেন লেখক ও চিন্তক ব্রাত্য রাইসু। ভারতীয় শিল্পী-সাহিত্যিকদের ছবি অঙ্কনকে সাংস্কৃতিক অপরাজনীতির অংশ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

ব্রাত্য রাইসু তার পোস্টে লিখেছেন, ‘শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন দেওয়ালে শিক্ষিত সংস্কৃতিজীবীদের সাধের সৌন্দর্য চর্চা শুরু হইছে, ফুটপাতের খাবারের দোকান ওঠাইয়া দিয়া। দুইটারে এক করার দরকার নাই। আপাতত এই সৌন্দর্য চর্চার রাজনীতি নিয়া বলি। দেওয়ালে ১০ জন গুণী ব্যক্তির মুখ আঁকা হইছে। কীসের ভিত্তিতে? কারা ঠিক করছেন কোন গুণী ব্যক্তিদের ছবি লাগানো হবে? কই, গুণী হুমায়ূন আহমেদের ছবি তো দেখলাম না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস—নাই। হাসান আজিজুল হক—নাই। আজম খান—নাই। কামরুল হাসান—নাই!’

তিনি বলেন, ‘তারা বলবেন জায়গা তো অল্প! তো যদি জায়গা এত অল্পই থাকে তাইলে তো গুণের তুলনামূলক বিচার করতে হবে। তাছাড়া দেশের লোকের গুণ প্রচার তো আগে। ভারতীয় গুণী ব্যক্তিদ্বয়ের ছবি সম্প্রচারের কারণ কী? দেখলাম কৌশলগতভাবে দুই ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর ছবিও টাঙানো হইছে। বিদ্যাসাগর ও সত্যজিৎ। এইটা ভারতের লগে আবারও আওয়ামী আমলের মত সাংস্কৃতিক নির্ভরশীলতা শো করার ঘোষণা কি? কারা এই কাজ শুরু করলেন?’

ব্রাত্য রাইসু আরও লিখেছেন, ‘অবশ্যই আমাদের এইখানকার ২ মৃত গুণী ব্যক্তির ছবি না টাঙাইয়াই ভারতীয় ২ মৃত গুণীর ছবি টাঙানো হইছে। তাই না? আমার পছন্দের মানুষ এই দুই ভারতীয় ব্যক্তিত্ব। আমি তাদেরকে ভালবাসি। কিন্তু পছন্দের মানুষ তো পশ্চিমবাংলায় আরো অনেকেই ছিলেন। সুনীল, সমরেশ, মৃণাল, ঋতিক তাদের ছবিও নিশ্চয়ই বাংলাদেশের অথর্ব নাগরিকদের সহনশীলতা বাড়লে আপনারা টাঙাইবেন।’

এটিকে সাংস্কৃতিক অপরাজনীতির অংশ উল্লেখ করে এই চিন্তক লিখেছেন, ‘আমি সচেতন সংস্কৃতিজীবীদের এই ব্যাপারে সাবধান হইতে বলব। বাংলার সংস্কৃতিরে পশ্চিমবাংলার এক্সটেনশন হিসাবে দেখানোর কুরাজনীতি এখনও চলমান। একই শয়তানিতে দেশব্যাপী আয়োজন করা হইছে ‘কবীর-লালন ভাবসংগীত উৎসব’-এর। এগুলি বন্ধ করা দরকার।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম দীর্ঘ পোস্টে লিখেছেন, ‘শিল্পকলা একাডেমির সামনে বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ছবি আঁকা হয়েছে। এটা নিয়ে প্রশংসা হয়েছে, আবার কিছু প্রশ্নও এসেছে। এবং যে প্রশ্নগুলো এসেছে, সেগুলো খুবই যৌক্তিক। প্রথম প্রশ্ন এসেছে যে এখানে জেন্ডার ব্যালান্স নাই। খুবই সত্য কথা। এখানে ভাস্কর নভেরা আহমেদ থাকতে পারতেন। এখানে ফিল্ম অ্যাকট্রেস থাকতে পারতেন, আমাদের লেজেন্ডারি ববিতা। এখানে আমাদের বেগম রোকেয়া থাকতে পারতেন।’

তিনি লিখেছেন, ‘আমার কাছে যে দিকটা অ্যালার্মিং লেগেছে, সেটা হচ্ছে এর সাংস্কৃতিক রাজনীতিটা। সেটা হচ্ছে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সাথে এখানে সুকৌশলে সত্যজিৎ রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সত্যজিৎ রায় আমার খুব প্রিয় ফিল্মমেকার। বিদ্যাসাগরও একজন বড় রকমের বুদ্ধিজীবী ছিলেন। এখন প্রশ্ন আসে যে সত্যজিৎ রায় এবং বিদ্যাসাগর কি আসলে বাংলাদেশের?
মানে সত্যজিৎ রায়, উনার জন্ম হতে পারে কিশোরগঞ্জে। কিন্তু সত্যজিৎ রায় তো, উনাকে যদি প্রশ্ন করা হতো, উনি তো পরিচয় দিতেন উনি ভারতীয় ফিল্মমেকার। উনি তো বাংলাদেশি ফিল্মমেকার না।’

প্রশ্ন রেখে শফিকুল আলম লিখেছেন, ‘এই ভারতীয় ফিল্মমেকারকে আমরা জোর করে, উনি আমার মামাতো ভাই বলে যেভাবে নিজের দাবী করছি, সেটা ওই গরিব আত্মীয়ের সাইকোলজি মনে হচ্ছে। এই হীনমন্যতার সংস্কৃতিতে কেন ঢুকতে হচ্ছে আমাদেরকে আবার?’

তিনি লিখেছেন, ‘একটা প্রশ্ন করি। কলকাতা সিটি কর্পোরেশন রাষ্ট্রের টাকায় যদি এরকম ইনিশিয়েটিভ করত, তারা কি সেখানে বাংলাদেশের হুমায়ূন আহমেদ, তারেক মাসুদ, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, তাদেরকে রাখতেন? জীবনেও রাখতেন না। কেন রাখবেন? যতই আমরা বাঙালি হই, তারাও বাঙালি হোক, দুইটা দেশতো আলাদা। তো আমাদের এখানে এই দুইজনকে ঢোকানো হয়েছে সুকৌশলে আবার ‘আমরা দুই বাংলা এক’ বলার জন্য। দুই বাংলা এক তো না আসলে। দুই বাংলা এক হলে তো ১৯৪৭-এ বেঙ্গল লেজিসলেটিভে বাংলা ভাগ করার পক্ষে পশ্চিমবঙ্গের এলিটরা ভোট দিতেন না। সেই দুই বাংলা একের প্রসঙ্গ তো ওখানেই চুকে গেছে। এরপরে আর এই ফ্যান্টাসির মধ্যে থাকার কী অর্থ আছে? এইটা আবারও এক ধরনের হেজিমনিক কালচারের মধ্যে আমাদের ঢোকানোর চেষ্টা। আমি মনে করি এটা এখনই একটা শক্ত বার্তা দেওয়া উচিত যে ভবিষ্যতে যেন এগুলো না করা হয়।’

শফিকুল আলম লিখেছেন, ‘ধরা যাক যে একটা ওয়াল করল, যেখানে পৃথিবীর সেরা ফিল্মমেকারদের ছবি রাখছে। সেখানে সত্যজিৎ রায় থাকতে পারে, আব্বাস কিয়ারোস্তামি থাকতে পারে, স্পিলবার্গ থাকতে পারে, বাংলাদেশেরও কেউ থাকতে পারে। দ্যাটস ফাইন। কিন্তু হঠাৎ করে শুধুমাত্র ওই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি আর আমরা, এটা সেই পুরোনো হেজিমনির কথা মনে করিয়ে দেয়।’

‘ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়, মনে রাখবেন’—উল্লেখ করে তিনি আরও লিখেছেন, ‘জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে যখন নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্যকে সেলিব্রেট করার একটা সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে, যেটা বিএনপি সরকারের আমলেও কন্টিনিউ হয়েছে, সেই সাংস্কৃতিক ল্যান্ডস্কেপে হঠাৎ করে দুইজন ভারতীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে এই দেয়ালের যে মুরাল, তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়াটা আমার কাছে মনে হয়েছে খুবই রহস্যজনক।’

আজ টানা ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায় 
  • ০৯ অক্টোবর ২০২৬
৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার্থীদের জন্য পিএসসির বিশেষ নির্দ…
  • ০৯ অক্টোবর ২০২৬
শিল্পকলার সামনে পশ্চিমবঙ্গের লেখক-চলচ্চিত্রকারদের ছবি, উপেক…
  • ০৯ অক্টোবর ২০২৬
সনদ জাল: এক প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকের সনদ যাচাই করবে এনটিআরস…
  • ০৯ অক্টোবর ২০২৬
বান্ধবীর সাথে কক্সবাজার ভ্রমণ, ফেরার পথে নিখোঁজ স্কুলছাত্রী…
  • ০৯ অক্টোবর ২০২৬
প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্সের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন শুরু ১১…
  • ০৯ অক্টোবর ২০২৬