কুয়েটের খান জাহান আলী হল পুকুর © টিডিসি ফটো
খান জাহান আলী হল পুকুর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) এক অপরূপ সুন্দর জলাধার, যা সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত গাছপালা ও কম বৃষ্টিপাতপ্রবণ এই এলাকার মানুষের জন্য এই বৃহৎ জলাশয় এক আশীর্বাদ হয়ে আছে। তবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও স্থানীয় আবহাওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব রাখলেও, এই পুকুরে একাধিক প্রাণহানির ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গরমের দিনে পুকুরের চারপাশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২–৩ ডিগ্রি কম থাকে, যা মানুষের জন্য এক স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া তৈরি করে। একই সঙ্গে পুকুরের শীতল পানি তীব্র গরমে মানুষকে শান্তি ও আরাম দেয়। গরমের দিনে এই পুকুরের স্নিগ্ধ, শীতল রূপ যে কাউকে আকর্ষিত করতে বাধ্য করে।
এদিকে, কুয়েটের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সংলগ্ন হওয়ায় খেলাধুলা শেষে শরীরের ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই সরাসরি পুকুরে নেমে যান। কিন্তু শান্ত, নিরিবিলি এই সুন্দর পুকুরের আরেকটি বীভৎস রূপও রয়েছে। প্রায় ৩০ ফুট গভীর, ৩৬০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ২৬০ ফুট প্রস্থের এই পুকুর এখন পর্যন্ত অনেক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, এই পুকুরে সাঁতার কাটা স্বাভাবিকের তুলনায় কষ্টসাধ্য। অত্যধিক গভীরতার কারণে পুকুরের পানি সবসময় ঠান্ডা থাকে। এই শীতল পানি শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে ফেলে। অনেকের ধারণা, পুকুরের পানি তুলনামূলক বেশি ঘন হওয়ায় এটি শরীরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা শ্বাসপ্রশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষার্থীদের মতে, যত দক্ষ সাঁতারুই হোক না কেন, আগে থেকে এই পুকুরে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা না থাকলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
আরও পড়ুন: র্যাগিংয়ের ভিডিও করায় প্রক্টরের সামনে সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের ওপর হামলা
এ কারণে দেখা যায়, ডুবে যাওয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই প্রথম বর্ষের, যারা সাঁতারে দক্ষ হলেও এই পুকুরে সাঁতার কাটার অভ্যাস না থাকায় সহজেই বিপদের সম্মুখীন হন। এছাড়া অনেকের মতে, পুকুরের চারপাশের আগাছা পচে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে, যা দ্রুত ক্লান্তি সৃষ্টি করে।
গত এক বছরে এই পুকুরে ডুবে দুইজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২৫ সালের ৬ মে কুয়েটের ২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী শান্তনু কর্মকার এবং ২০২৬ সালের ১৭ মে সায়েম ফেরদৌস নামে আরেকজন শিক্ষার্থী মারা যান। ফারুক মুসতাহিদ সবুজ নামের এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী জানান, ‘আমি বিআইটির শিক্ষার্থী থাকাকালীন ১৯৯৬ সালে একজন এই পুকুরে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন।’ ২০০৮ সালে জুনায়েদ রহমান পিয়াল নামে আরেক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। একইভাবে ২০১২ সালেও একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ব্যাপারে গুঞ্জন রয়েছে।
স্থানীয়দের কাছে খান জাহান আলী হলের পুকুর ‘খাঁজার পুকুর’ নামেই বেশি পরিচিত। তাদের ভাষ্যমতে, এই পুকুরে ডুবে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তাদের কেউ কেউ ধারণা করেন, পুকুরটিতে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাব থাকতে পারে। স্থানীয়দের অনেকে বিশ্বাস করেন, ‘প্রতি ১০–১২ বছর পরপর এই পুকুরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং নিহতরা পরিবারের একমাত্র ছেলে হয়ে থাকেন।’ যদিও এই বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও ২০২৫ ও ২০২৬ সালে মারা যাওয়া শান্তনু কর্মকার ও সায়েম ফেরদৌস উভয়েই তাদের পরিবারের একমাত্র পুত্রসন্তান ছিলেন।
অনেকে মনে করেন, এই পুকুর অভিশপ্ত তাই এটি ভরাট করে ফেলা উচিত। তবে একটি বৃহৎ অংশের মতে, পুকুরটি ভরাট করলে পরিবেশের ইকোসিস্টেম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খুলনার ভ্যাপসা গরম ও উচ্চ তাপমাত্রার আবহাওয়ায় কোনো জলাশয় না থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাই তারা পুকুরে সাঁতার সীমিত করা, জরুরি প্রতিক্রিয়া দল (ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম) গঠন, পুকুরপাড়ে লাইফ জ্যাকেট ও টায়ারসহ নিরাপত্তা সরঞ্জাম মজুত রাখা এবং পানিতে নামার ক্ষেত্রে লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া পুকুরের সাঁতার এলাকা সংকুচিত করা, যাতে শিক্ষার্থীরা পুকুর পাড়ি দিতে না পারেন, এবং অতীতের দুর্ঘটনাগুলো উল্লেখ করে পুকুর সংলগ্ন এলাকায় সচেতনতামূলক বিলবোর্ড স্থাপনের দাবিও উঠেছে।
কুয়েট প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যেই সচেতনতামূলক বিলবোর্ড টাঙানো হয়েছে। এছাড়াও এ বিষয়ে শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা চলছে। আলোচনায় যেসব কার্যকর প্রস্তাব উঠে আসবে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসন কাজ করছে।