বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিল ছাত্রদল © টিডিসি সম্পাদিত
রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবিপ্রবি) আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রতিবাদে পূর্বঘোষণা ছাড়াই ক্যাম্পাসের ভিসি (উপাচার্য) কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। আজ মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে ভিসি ভবনের সামনে এক সংবাদ সম্মেলন শেষে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন অর্নব ও সদস্যসচিব জিশান আহম্মেদের নেতৃত্বে এই তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বর্তমানে আমি ক্যাম্পাসে নেই, ঢাকায় অবস্থান করছি। পূর্বঘোষণা ছাড়াই তারা ভিসি কার্যালয়ে তালা দিয়েছে শুনেছি। এভাবে ‘মব’ তৈরি করে ভিসি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া তো অপরাধ। তারা অন্তত আগে আমার কাছে এসে স্মারকলিপি কিংবা লিখিত দিতে পারত। কিন্তু তারা কিছুই করেনি। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দাবি-দাওয়া চাওয়ার বিষয়টি আমাদের কাছে কাঙ্খিত ছিল।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন অর্নব দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের প্রতিবাদে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি এ প্রশাসন নিয়োগে জামায়াতীকরণ করেছে। তারও প্রতিবাদে আজকের কর্মসূচি।
পূর্বঘোষণা ছাড়াই তালা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভিসিকে আগেই মৌখিকভাবে বলা হয়েছিল। তবে লিখিত বা কোনো স্মারকলিপি দেওয়া হয়নি। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমরা ভিসির পতদত্যাগের দাবি জানায়। নতুবা তাকে মন্ত্রণালয় থেকে অপসারণের করে নতুন ভিসির দেওয়ার আহ্বান জানায়।
জানা গেছে, নানা অনিয়মের কারণে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল গফুরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার (৪ মে) সাময়িকভাবে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ড. তৌহিদুল আলমকে পরিচালক ও ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. নিখিল চাকমাসহ তিনজনকে প্রকল্প পরিচালকের অন্তর্বর্তী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ড. নিখিল চাকমা বঙ্গবন্ধু পরিষদ রাঙামাটি জেলা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। শাখা ছাত্রদল বলছে, তাকে এই দায়িত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
জানতে চাইলে ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে যতদিন পরিচালন দেবে না, ততদিন তারা সাময়িক এই দায়িত্ব পালন করবেন। ড. নিখিল চাকমা বর্তমানে একটি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব আছেন। এর আগে আমি ভিসি হওয়ার আগে ৬ মাস তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক ছিলেন। তখন তো তারা এ অভিযোগ আনেনি।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাত্র অর্ধশত। এজন্য তাদেরকে শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। তারা যদি এখন আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলে তাহলে বিগত আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পাওয়া বেশির ভাগের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ থাকবে।
তবে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন অর্নব বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ড. নিখিল চাকমা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক ছিলেন, তখনও আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি। আগে আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়োগ হত, ৫ আগস্টের পর এখানে জামায়াতের লোকজন নিয়োগ হচ্ছে।
তাদের অভিযোগের বিষয়ে ড. মো. আতিয়ার রহমান বলেন, ইতিপূর্বে নিয়োগ সম্পর্কিত বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা তথ্য-উপাত্তসহ শিক্ষার্থীদের সামনে আমরা উপস্থাপন করেছি। প্রতিটি নিয়োগই আমরা সম্পন্ন করেছি ইউজিসি নীতিমালা ও বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা মেনে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের অনুমোদনক্রমে। তারপরও যদি কারও কোনো তথ্য জানার থাকে, প্রশ্ন থাকে সরাসরি আমার থেকে জানার সুযোগ রয়েছে।
আওয়ামী পুনর্বাসনের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, এ বিষয়ে আমরা জানি না। গতকালকে যে তিনজনের কমিটি হয়েছে, সেখানে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ইন্টেরিম সরকারের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব করা একজনকে অভিজ্ঞতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে টিমের সদস্য হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রাবিপ্রবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন অর্নব বলেন, বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ‘পারিবারিক ও রাজনৈতিক আখড়ায়’ পরিণত করেছেন। মেধা ও যোগ্যতাকে উপেক্ষা করে নিয়োগ জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম এবং পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট করা হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, শিক্ষক নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। এক প্রার্থী গবেষণায় কম নম্বর পেয়েও বাদ পড়েছেন, অন্যদিকে শূন্য নম্বর পাওয়া এক প্রার্থীকে ভাইভা বোর্ডে অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া বয়সসীমা অতিক্রম করে নিয়োগ, বিজ্ঞপ্তির অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং একক প্রার্থীকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মতো অনিয়মের কথাও উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া মেধাবী প্রার্থীদের বঞ্চিত করে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত ভঙ্গ করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে ছাত্রদল। ডেপুটি ডিরেক্টর ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে অনিয়ম, রিজেন্ট বোর্ডে অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্তি এবং উপাচার্যের নিজে একাধিক দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন তোলে তারা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, উপাচার্য বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে অবমাননা করেছেন। শহীদদের প্রতি দেওয়া পুষ্পস্তবক অপসারণ এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘটনাও তুলে ধরা হয়।
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উপাচার্যের অপসারণের দাবি তুলে আলটিমেটাম দিয়ে, উপাচার্য কার্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে ছাত্রদলের নেতারা। তবে তারা জানিয়েছে, আন্দোলনের মধ্যেও ক্লাস, পরীক্ষা ও ফলাফল কার্যক্রম চালু থাকবে, শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে এতে তারা বাধার কারণ হবে না।