মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © ফাইল ফটো
পবিত্র ঈদুল ফিতর মুসলিম বিশ্বের জন্য আনন্দ, মিলন ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য উপলক্ষ্য। তবে এই উৎসবের আমেজের মধ্যেও অনেকের জীবনের কোথায় যেন থেকে যায় এক গভীর বিষাদ, শূণ্যতা ও প্রিয় কোনো স্বজনের অনুপস্থিতি। প্রতি বছর ঈদ ফিরে আসে, নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার আর পারিবারিক মিলনের বার্তা নিয়ে; কিন্তু কিছু মানুষ আর কোনোদিন সেই আনন্দের অংশ হয়ে ফেরে না।
ঈদের আনন্দের মাঝেই হঠাৎ করে ভেসে ওঠে তাদের সেই প্রিয় মুখখানি। নতুন জামার আনন্দ, ঘরের ব্যস্ততা কিংবা আত্মীয়দের কোলাহলের মাঝেও কোথায় যেন অপূর্ণতার এই অনুভূতি পেয়ে ওঠে প্রশ্রয়, হৃদয় ভারী হয় চোখের কোণে নিঃশব্দে জমে ওঠে অশ্রু। কারণ কিছু সম্পর্কের অভাব কোনোদিন কোন কিছুর মাধ্যমেই আর পূরণ করা সম্ভব হয় না।
যারা বাবা-মা, দাদা-দাদি কিংবা খুব কাছের কোনো প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন কেবল তারাই বুঝবেন অব্যক্ত এই যন্ত্রণা, স্মৃতি আর শূন্যতা ভরা মিশ্র এই অনুভূতি। একসময় যাদের সঙ্গে ঈদের সকাল শুরু হতো, সালামি বিনিময়, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া আর হাসি-আড্ডায় দিন কেটে যেত, আজ সেই মানুষগুলো আর নেই। তারা চলে গেছেন না চিরতরে, না ফেরার দেশে। কিন্তু তাদের জন্য আমাদের মনে যে জায়গা ছিল তা আজ নীরবে শূন্য হয়ে পরে আছে। আপনজন হারানো, সেই বেদনা, বিভিন্ন উৎসবে তাদেরকে ঘিরে থাকা সব স্মৃতি ও শূণ্যতা সব মিলিয়ে ঠিক কেমন অনুভব করছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা-
এনিভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের রিফাত শাহরিয়া উৎস হৃদয়বিদারক কণ্ঠে জানান, `ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই পাড়ায় এক হইচই পড়ে যেত। মনে পড়ে, বাবা তখন পাঞ্জাবির পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বলতেন, "যাও, বন্ধুদের সাথে একটু ঘুরে এসো।" সেই টাকা পাওয়ার আনন্দের চেয়েও বেশি আনন্দ ছিল বাবার সাথে ঈদের নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতিতে।ঈদের নামাজ শেষে যখন বাবা বুকে জড়িয়ে ধরতেন, সেই চওড়া বুকের ঘ্রাণে মিশে থাকত অদ্ভুত এক নির্ভরতা।
আজও ঈদ আসে। কিন্তু সেই আঙুলটা ধরার অভাবটা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি।
তিনি আরো বলেন, এখন ঈদের সকালে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, নিজের চেহারার ভাঁজে মাঝে মাঝে বাবার প্রতিচ্ছবি দেখি। এখন ঈদ মানে- নামাজ শেষে বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দুহাত তুলে বলা, "রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।"
বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী সানজানা কামাল রিয়া জানান- 'ঈদ মানে আনন্দ ,ঈদ মানে খুশি এই কথা টা পরিনত হয় ঈদ মানে বিষাদ, হাহাকার,যন্ত্রণা। কাছের কেউ হারানোর পর ঈদ আর ঈদ থাকে না। দিনটি হয়ে ওঠে স্বাভাবিক দিনের চেয়েও কঠিন। ঈদের দিনে আব্বুকে, কাকাকে, আপুকে একটু বেশি মনে পড়ে। আমার দিনের শুরু ই হয় কবর যিয়ারত এর মাধ্যমে। কবরের পাশে বসে দোয়া করি। চাপা একটা কন্ঠে ঈদ মোবার বলি। উওর আসে না। আকাশের দিকে তাকাই যদি একটা পাখি উড়ে আসতে দেখি ভাবি তারা পাঠিয়েছেন আমার কাছে। এটুক সান্ত্বনা নিয়ে বাসায় চলে আসি। বাসায় এসেও নিজের খালি হাত এর দিকে তাকাই। আপু চলে যাওয়ার এগারো বছর ধরে এই হাতে আর মেহেদি আর লাগে নি। আব্বু ,কাকা বিদেশে ছিলেন। ঈদ এর আগের দিন কল দিয়ে বলতেন আম্মু ঈদ মোবারক আমি বলতাম না,না আমার টা কাল। আজ বললে বাসি হয়ে যাবে। আব্বু বলত নতুন জামাটা পরেছো আম্মু,,?? সেই জামাও পড়া হয় না আজ বারো বছর হবে। এসব ভাবতে ভাবতে উদযাপনের সময়টুকুন আর মেলে না।'
শহীদ আবরার ফাহাদ হল শিক্ষার্থী মো. পিয়াসুর রহমান হিসাম জানান- `২০২৪ সালে আমার বাবা চলে যায় না ফেরার দেশে এর পর থেকে ঈদগুলো আর আগের মতো লাগেনা। ঈদের সকালে তাঁর ডাক, নতুন কাপড় দেখে তাঁর হাসি, একসাথে নামাজে যাওয়া এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই হঠাৎ করে সবচেয়ে বেশি মনে হয়। চারপাশে সবাই আনন্দে থাকলেও, মনে হয় কিছু একটা অসম্পূর্ণ, যেন উৎসবের রঙটাই ফিকে হয়ে গেছে। প্রিয়জন হারানোর পর উৎসবগুলো কাটানো যেনো বেশি কঠিন হয়। ঈদের দিনগুলো তখন শুধু আনন্দের নয়, স্মৃতিরও হয়ে যায়। ভালোবাসা, সময় আর না বলা কথাগুলোর স্মৃতি। বাবা হয়তো এখন শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু ভালোবাসা আর স্মৃতি সবসময় আছেন, থাকবেন।'
একই বিষয়ে ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন, 'অনেকগুলো ঈদই পার করে গেলাম আম্মু তোমাকে ছাড়া। হয়তো এটাও এমনেই চলে যাবে আনমনে তোমাকে জড়িয়ে না ধরেই, তোমার হাসি মুখটা না দেখেই। কখনো জড়িয়ে ধরে তোমাকে বলা হয়নি, আম্মু ঈদ মোবারক আর তুমি এক বিন্দু হেসে আমাকে বলতেও পারনি তোমাকেও ঈদ মোবারক। খুব মিস করি ঈদের দিন আগে উঠে সেমাই রান্না করে আমাদের খাইয়ে দেওয়া। শুধু এই চাওয়া আল্লাহ আপনাকে যেন জান্নাতের সেই সবুজ বাগানে চিরস্থায়ী করেন। আমিন।'
তবুও মানুষ থেমে থাকে না। প্রিয়জনদের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে, তাদের জন্য দোয়া করে এবং জীবনের চলমানতায় নিজেকে মানিয়ে নেয়। ঈদ তখন শুধু উপস্থিত মানুষদের নয়, বরং অনুপস্থিত প্রিয়জনদের স্মৃতি ও ভালোবাসাকেও ধারণ করে—যা স্থান কিংবা সময়ের সীমানা পেরিয়েও চিরকাল হৃদয়ে গেঁথে থাকে, স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।