নুরুদ্দিন রানা ও ফারদিন নূর পরশ © সংগৃহীত
সময়ের প্রবহমান স্রোতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশের কথাও মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে তার পরিবার ও সহপাঠীরা বিন্দুমাত্র ভুলতে পারেননি। বরং দিন যত যাচ্ছে তাদের কষ্টের পাহাড় দীর্ঘ হচ্ছে। এদিকে, ডিবির প্রতিবেদনের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ফারদিন হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত করছে।
ফারদিনের বাবা নুরুদ্দিন রানা বলছেন, দিনেদিনে তার ছেলে হত্যার বিচার পাওয়ার আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, খুনিদের বাঁচাতে র্যাব ও ডিবি বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই ফারদিনের হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে যাচ্ছে। সিআইডি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদনও দিচ্ছে না। এ প্রতিবেদন জমা দিতে এত বিলম্বের কারণও আমি বুঝতে পারছি না।
তবে মহামান্য আদালতের প্রতি আমার আস্থা আছে এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি ছেলে হত্যার বিচারের অপেক্ষায় থাকব। -নুরুদ্দিন রানা, ফারদিনের বাবা
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ফারদিন (২৪) বিতার্কিক ছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে স্পেনের এক অনুষ্ঠানে তার যাওয়ার কথা ছিল। তার এক মাস আগে অর্থাৎ গত বছরের ৪ নভেম্বর দুপুরে ঢাকার ডেমরার কোনাপাড়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন ফারদিন। বাবা-মার বড় ছেলে ফারদিন কোনাপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন।
ফারদিন বেরিয়ে যাওয়ার সময় মাকে বলে গিয়েছিলেন, পরদিন তার পরীক্ষা রয়েছে বলে রাতে বুয়েটের হলেই থাকবেন। পরীক্ষা দিয়ে বাসায় ফিরবেন। কিন্তু পরদিন পরীক্ষায় তার অনুপস্থিত থাকার খবর জেনে খোঁজাখুজি করেও ছেলেকে না পেয়ে থানায় জিডি করেন নূরউদ্দিন রানা। পরে তিন দিন পর ৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে ফারদিনের লাশ পাওয়া যায়।
ফারদিনের মরদেহ দাফনের সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা নুরুদ্দিন
পরে ৯ নভেম্বর তার বাবা নুরুদ্দিন বাদী হয়ে রামপুরা থানায় মামলা করেন। মামলায় নিহতের বান্ধবী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আমাতুল্লাহ বুশরাসহ অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়। এরপর গত ৬ ফেব্রুয়ারি ফারদিন হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মোহাম্মদ ইয়াসিন শিকদার। সেখানে বলা হয়, নানা কারণে হতাশা থেকে ফারদিন আত্মহত্যা করেন। তার বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরাকে এ মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশও করা হয় সেখানে।
এদিকে, এ মামলায় গোয়েন্দা পুলিশের দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আপত্তি জানান ফারদিনের বাবা কাজী নুরউদ্দিন রানা। পরে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. শান্ত ইসলাম মল্লিক তার ‘নারাজি’ আবেদন গ্রহণ করে মামলায় অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর গত ২৬ ডিসেম্বর এ মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। তবে তা পিছিয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে আগামী ২৮ জানুয়ারি নতুন দিন ধার্য করেছেন আদালত।
আরও পড়ুন: বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছিলেন ফারদিন
ইতিমধ্যে ফারদিনের মৃত্যুর ১ বছরপূর্ণ হয়েছে গত নভেম্বরে। তাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার দেউলপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। প্রায় কবরস্থানে ছুটে যান তার বাবা-মা। দূর থেকে দাঁড়িয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদেন। কারো পায়ের শব্দ পেলেই ফিরে দেখেন। পরক্ষণেই ছুটে আসেন বাড়িতে। মনোযোগী হতে পারেন না কোনো কাজেই। ভাবেন, এই বুঝি ফারদিন বাবা বলে ডাক দিলো।
ফারদিনের বাবা নুরুদ্দিন রানা বলেন, ফারদিনের আত্মহত্যার কোনো কারণ ছিল না। এটি ডিবি ও র্যাবের অসততা ও দায়িত্বহীনতার একটি বানোয়াট নাটকীয় গল্প। চনপাড়ার সঙ্গে ফারদিনের সম্পর্ক, মাদকের সম্পৃক্ততা, জঙ্গিদের সঙ্গে যোগসাজশ, মাদক ব্যবসায়ীদের পিটিয়ে হত্যা—এসব খবর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গণমাধ্যমে প্রচার করে আসল খুনিদের আড়াল করার চেষ্টায় রহস্য সৃষ্টি করে।
ফারদিনের লাশ উদ্ধারের পর তার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে আন্দোলনে নামেন তার সহপাঠীরা
তিনি বলেন, ‘তবে মহামান্য আদালতের প্রতি আমার আস্থা আছে এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি ছেলে হত্যার বিচারের অপেক্ষায় থাকব।’
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ফারদিনের সামনে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ ছিল। সে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিল। অভিজ্ঞ বিতার্কিক ফারদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করতো। স্পেনের মাদ্রিদে ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে’ বুয়েটের প্রতিনিধিত্ব করার কথা ছিল তার। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কীসের দুঃখে সে আত্মহত্যা করবে?
সহপাঠী হিসেবে আমরা তাকে সবসময়ই স্মরণ করি। তার মেধা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমগুলো অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এখন অনুপ্রেরণা। -মাশিয়াত জাহিন, ফারদিনের বন্ধু
ফারদিনকে স্মরণে রেখেছেন তার সহপাঠীরাও। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে সহপাঠীরা অনলাইনে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। সহপাঠী মাশিয়াত জাহিন বলেন, ফারদিনের মৃত্যুর পর থেকেই আমরা বিচার দাবি নিয়ে সোচ্চার ছিলাম। আমরা একাধিক কর্মসূচিও করেছি। শুরুর দিকে বুয়েট শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তার মৃত্যু রহস্য উদঘাটনসহ বিচার দাবিতে সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে ডিবির পক্ষ থেকে তো এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে একটা প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ডিবি অফিসে নিয়েও আমাদের এ প্রতিবেদন দেখানো হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ বললেও আমাদের সহপাঠীর মৃত্যু আমাদের কাছে অস্বাভাবিকই মনে হয়েছে। তবে ডিবির প্রতিবেদনের পর আমরা আর এটা নিয়ে আগানোর সুযোগ পাইনি। তার মৃত্যুর ঘটনা বুয়েট শিক্ষার্থীদের কাছে একটা ‘আনফিনিশড চ্যাপ্টার’ হিসেবেই থেকে গেল। সহপাঠী হিসেবে আমরা তাকে সবসময়ই স্মরণ করি। তার মেধা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমগুলো অনেক শিক্ষার্থীর জন্য এখন অনুপ্রেরণা।