পাঠ্যবইয়ে শহীদ জিয়ার ১৯৮০’র নিবন্ধ

‘সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেডিও স্টেশনে এলাম, টুকরো কাগজে দ্রুত স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণা লিখলাম...’

২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৩ PM , আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩০ PM
শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান ও পাঠ্যবই

শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান ও পাঠ্যবই © টিডিসি সম্পাদিত

‘কালুরঘাটে চট্টগ্রাম রেডিওর কেন্দ্র। সেখানে একদল ছাত্র এবং বেতারশিল্পী দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করছিলেন। দিনটি ছিল ২৭শে মার্চ। শহরের চারদিকে তখন বিক্ষিপ্ত লড়াই চলছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেডিও স্টেশনে এলাম। এক টুকরো কাগজ খুঁজছিলাম। হাতের কাছে একটি এক্সারসাইজ খাতা পাওয়া গেল। তার একটি পৃষ্ঠায় দ্রুতহাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লিখলাম। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বভার নিয়েছি, সে কথাও লেখা হলো সেই প্রথম ঘোষণায়।’ এইভাবেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ উঠে এসেছে শহীদ রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমানের লেখায়।

মুক্তিযুদ্ধের সেই স্মৃতিচারণ এবার ঠাঁই পেয়েছে নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা সাহিত্য বইয়ে পড়বে তার লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক রচনা। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, জিয়াউর রহমানের নিজস্ব ডায়েরি থেকে লেখাটি সংকলন করা হয়েছে। এর আগে ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল রচনাটি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সেই লেখার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ ও যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।

পাঠ্যবইয়ে প্রকাশিত লেখাটি হুবুহু তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য—

বইয়ে লেখক সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘[জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। যিনি ছিলেন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, মুক্তিযুদ্ধকালীন জেড ফোর্সের অধিনায়ক এবং ১নং সেক্টরের কমান্ডার। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৯ শে জানুয়ারি বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মনসুর রহমান এবং মাতা জাহানারা বেগম রানী। মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ সাহস ও নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। তিনি দেশের এক অস্থির সময়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার স্বল্পকালীন শাসনামলে বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠে। এসময় বাংলাদেশের অর্থনীতি তলাবিহীন ঝুড়ির অবস্থা থেকে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়। তার লেখা উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ হচ্ছে, ‘একটি জাতির জন্ম’, ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’, ‘আমাদের অর্থনীতি’, ‘স্বাধীন জাতির, স্বাধীন উপলব্ধি’, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি’ ইত্যাদি। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে কিছু বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে চট্টগ্রামে তিনি শাহাদতবরণ করেন।]’

নিবন্ধের শুরুতে লেখা হয়েছে, ‘[১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের মানুষের প্রতি বছরের পর বছর ধরে চলা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, বঞ্চনা, ষড়যন্ত্র আর প্রতিশ্রুতিভঙ্গের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী মানুষের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ১৯৫৭ সালে প্রথমবারের মতো মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি শোষণ-বৈষম্য বন্ধ না হলে পশ্চিম পাকিস্তানকে আস-সালামু-আলাইকুম।’ এটিই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম রাজনৈতিক আওয়াজ। 

এরপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের পথ ধরে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা তথা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন, ৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানিদের টালবাহানা এবং সবশেষে ২৫শে মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের উপর নির্বিচার গণহত্যা- এভাবেই অনিবার্য হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। ২৫শে মার্চ রাতে গ্রেফতার হয়ে যান আন্দোলনের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। পাক হানাদারদের নির্বিচার আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ। এমন এক পরিস্থিতিতে দিশেহারা মুক্তিকামী মানুষের সামনে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে আসেন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। 

সেই সময় স্বাধীনতাকামী মানুষের সামনে মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল তুর্যধ্বনির মতো। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত ক্রোড়পত্রে জিয়াউর রহমানের নিজের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক লেখাটি অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকায় ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এই দুটি নিবন্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার ঘোষণার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা চিত্রিত হয়েছে, যা আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল। জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ এবং বিভিন্ন সময়ে তার বিভিন্ন আলাপচারিতা এবং কথোপকথনে প্রমাণিত হয়, তিনি হঠাৎ করেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেননি।

বরং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিমাতাসুলভ এবং বৈষম্যমূলক আচরণ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এতে মেজর জিয়া পাকিস্তানিদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। জিয়াউর রহমান ছিলেন সুযোগের অপেক্ষায়। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরটি ছিল তার দীর্ঘদিনের লালিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২৬শে মার্চ রাত ২টা বেজে ১৫ মিনিট। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দল বা ব্যক্তির কৃতিত্ব নয় এবং একজন ব্যক্তি কিংবা একটি দলের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। বাংলাদেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাসের অনিবার্য নাম।]

সবাই আমরা যুদ্ধ করেছি। সৈনিক, জনগণ সবাই। জাতির চরম সংকটের মুহূর্তে কাউকে না কাউকে সামনে এগিয়ে আসতে হয়। নিতে হয় দায়িত্ব। আমি কেবল সেই দায়িত্ব পালন করেছি। নেতারা যখন উধাও হয়ে গেল-সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো কেউ যখন থাকল না, তখন জাতির পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড়ো সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হলো। কারণ, জাতিকে তো আর অসহায়, নিরস্ত্র অবস্থায় একটা সর্বাত্মক ধ্বংসের মুখে ফেলে রাখা যায় না। এবং আমি জানতাম, যুদ্ধের জন্যে জাতি প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। শুধু বাকি ছিল সেই যুদ্ধের জন্যে একটি সঠিক সময় বেছে নেওয়া। ছাব্বিশে মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে সেই চূড়ান্ত সময়টি এলো। যার জন্য গোটা মাস আমরা রুদ্ধশ্বাস হয়ে প্রতীক্ষা করছিলাম। 

এবং সময় আসবার সঙ্গে সঙ্গে আমি সে ঘোষণা অষ্টম ব্যাটালিয়নের আমার সহযোদ্ধাদের জানিয়ে দিলাম। মুহূর্তের মধ্যে তারা প্রস্তুত হলো এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পরদিন চট্টগ্রাম রেডিও থেকে জাতিকে আমি সে সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। জাতি সমস্বরে সাড়া দিল সেই ডাকে। বেতার তরঙ্গের সেই সন্ধ্যার ঘোষণা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রেডিওতে ধরা পড়ল। আর বিশ্ববাসী সেই প্রথম শুনলো:- বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঘোষণা নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে। বেতার থেকে বেতারে সেই ঘোষণা প্রতিধ্বনিত হলো। ২৭শে মার্চ, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ইথারে ঘোষণাটি উচ্চারিত হওয়ার পর মুহূর্তেই বিশ্বমানচিত্রে অঙ্কিত হয়ে গেল 'স্বাধীন বাংলাদেশ' কথাটি। ‘সে ছিল সত্যি এক অলৌকিক ব্যাপার! মাত্র কয়েক কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন একটি বেতারের ঘোষণা কেমন করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ল, তা ভাবতে আজও আমার অবাক লাগে। নিশ্চয় এর মধ্যে ছিল বিশ্বস্রষ্টার কল্যাণময় সংকেত।’

পয়লা মার্চ থেকেই বাংলাদেশে হামলার পাকাপাকি প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল পাকিস্তানি শাসকচক্র। বিমানে এবং জাহাজে করে প্রচুর সমরাস্ত্র তারা পাঠায়। প্রতিদিন আসতে লাগল নতুন নতুন সেনাদল। চট্টগ্রামের ষোলশহরে ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দফতর। নতুন একটি ব্যাটালিয়ন গড়ে তুলবার কাজ চলছিল কিছুকাল আগে থেকে। এটি অষ্টম ব্যাটালিয়ন। নতুন এই ব্যাটালিয়নের দুশত জনের একটি দলকে আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানের খারিয়ান অঞ্চলে। এদিকে বেশির ভাগ জোয়ানই ছিল ছুটিতে। মাত্র দুশ কুড়িজন ছিল ডিউটিতে। অস্ত্রও ছিল সামান্য। অস্ত্র বলতে ছিল ৩০৩ মডেলের ‘শ’ তিনেক রাইফেল, চারটি এল-এম-জি, দুটি মর্টার, সার্ভিস ক্যাবল দুটি। আর সামান্য গোলাবারুদ। কোনো এন্টি ট্যাংক এবং ভারী মেশিনগান ছিল না।

চট্টগ্রামে ১লা মার্চ থেকে ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের রহস্যজনক গতিবিধি থেকে আমরা সুস্পষ্ট আচ করতে পারছিলাম, কী ঘটতে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারে তারা শহরের মহল্লায় গিয়ে নিধনযজ্ঞে মেতে উঠত। আমাদের জোয়ানকে গোপনে মোতায়েন করলাম তাদের দিকে নজর রাখার জন্যে। আমি তখন ব্যাটালিয়নের দ্বিতীয় কমান্ডিং অফিসার। পাকিস্তানি অফিসার লে. কর্নেল জানজুয়া ছিলেন ব্যাটালিয়ন প্রধান। তিনি প্রথম থেকেই আমাকে সন্দেহের চোখে দেখছিলেন। আমার বাসার কাছে ঘোরাঘুরি করছিল তাঁর নিয়োজিত গোয়েন্দারা। এদিকে ক্রমেই ওদের পরিকল্পনার নীলনকশা স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল আমাদের কাছে। দেশের নানা জায়গা থেকে ওদের নৃশংস বর্বরতা আর লুটতরাজের খবরও পৌঁছতে লাগল। খবর পাওয়া গেল ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করা হবে। ব্যাটালিয়নের তরুণ অফিসার দল আর জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারদের মধ্যে তখন এক চরম উত্তেজনা। তাঁরা আমার কাছ থেকে সিদ্ধান্ত জানার জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন।

আরও পড়ুন: পাঠ্যবই থেকে দাঁড়িপাল্লার ছবি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত

বোধকরি তারিখটা ছিল ৪ঠা মার্চ। কোয়ার্টার মাস্টার ক্যা. ওয়ালীকে (অলি আহমদ) ডেকে পাঠালাম। ষোলশহর মার্কেট-এর ছাদের ওপর আমরা বসলাম। এটি আমাদের প্রথম বৈঠক। আমি আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, কী সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হবে। সোজাসুজি তাকে বললাম, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। আমাদের এখন থেকে সর্বক্ষণ প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে। সেই বৈঠকে একটি অ্যাকশন-প্ল্যানের রূপরেখা তৈরি করা হলো। তার ভিত্তিতে রোজ একই জায়গায় আমরা বৈঠকে মিলিত হচ্ছিলাম। নিঃশব্দে একইভাবে চলল আমাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতির কাজ।

১৩ই মার্চ নেতাদের সঙ্গে ইয়াহিয়া খানের গোলটেবিল বৈঠক শুরু হলো। এর মধ্যেই পাকিস্তানি জেনারেলরা একের পর এক বিমানে করে আসতে লাগলেন। সব গ্যারিসন অফিসে শুরু হলো তাদের আনাগোনা। এ ছিল সর্বাত্মক হামলার এক ভীতিকর পূর্বাভাস। নৌবাহিনীর শক্তি বাড়ানো হলো চট্টগ্রামে। রণতরী পিএনএস ‘বাবর’-এর সঙ্গে এলো অনেক ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট আর গানশিপ।

২১শে মার্চ জেনারেল হামিদ এলেন চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে। এই জেনারেলই পাকিস্তানের সামরিক হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন। চট্টগ্রামে তখন জনগণের তীব্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। রাস্তায় রাস্তায় ছিল ব্যারিকেড। ‘সোয়াত’ জাহাজের অস্ত্র খালাস করার জন্য পাকিস্তানি সৈন্যরা ২৪শে মার্চ ব্যারিকেড সরিয়ে কোনোমতে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছল। পথে জনগণ তাদের বাধা দিয়েছিল। খণ্ডযুদ্ধে প্রাণ হারালেন বহু লোক। এটি ছিল চরম মুহূর্তের সংকেত। আমরা প্রস্তুত হয়ে থাকলাম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।

দ্রুত ঘনিয়ে এলো পচিশ-ছাব্বিশের সে রাতটি। রাত তখন ১১টা। চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করার জন্য ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার আমার কাছে নির্দেশ পাঠালেন। নৌবাহিনীর একটি ট্রাক পাঠানো হলো আমাকে এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য। দুজন পাকিস্তানি অফিসারকে আমার সাথে দেওয়া হলো। ট্রাকের চালক ছিলেন একজন পাঞ্জাবি। আমার সাথে ছিল আমার ব্যাটালিয়নের মাত্র তিনজন জোয়ান। এত রাতে কেন তারা আমাকে বন্দরে রিপোর্ট করতে পাঠাচ্ছে? একটা সংশয় আমার মধ্যে দানা বেঁধে উঠছিল। আসলে তারা আগেই টের পেয়েছিল, আমি চরম একটা পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি। সুতরাং তারা চাইছিল আমাকে শেষ করে ফেলতে। তাই সে রাতেই তারা ষড়যন্ত্র এঁটে রেখেছিল।

আগ্রাবাদের একটি বড়ো ব্যারিকেডের সামনে ট্রাক থেমে গেল। আমি নেমে পায়চারি করছিলাম রাস্তায়। ভাবছিলাম কখন সবাইকে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেব। ঠিক সে সময়ে মেজর খালিকুজ্জামান সেখানে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। অনুচ্চস্বরে বললেন, ওরা ক্যান্টনমেন্টে হামলা শুরু করেছে। শহরেও অভিযান চালিয়েছে। হতাহত হয়েছে শহরের বহু নিরীহ মানুষ। বুঝতে পারলাম, যে সময়ের জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিলাম, সে সময় এসে গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলাম, ‘উই রিভোল্ট’। নির্দেশ দিলাম, যোলশহরে ছুটে যাও। পাকিস্তানি অফিসারদের আটক করো। যুদ্ধের জন্য তৈরি করে রাখো ব্যাটালিয়নের সবাইকে। ট্রাকে উঠে পাঞ্জাবি ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলাম, ‘ট্রাক ফিরিয়ে নিয়ে চলো ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টারের দিকে।’ সৌভাগ্য বলতে হবে। সে নিঃশব্দে আমার নির্দেশ পালন করল।

যোলশহরে এসে দ্রুত নেমে পড়লাম ট্রাক থেকে। নৌবাহিনীর আটজন এসকর্ট ছিল সঙ্গে। মুহূর্তে একটি রাইফেল কেড়ে নিলাম তাদের একজনের কাছ থেকে। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি নেভাল অফিসারটির দিকে রাইফেল তাক করে বললাম, ‘হ্যান্ডস আপ’। তোমাকে গ্রেফতার করা হলো। ঘটনার আকস্মিকতায় সে হকচকিত হয়ে আত্মসমর্পণ করল। অন্যদের দিকে রাইফেল উঁচিয়ে বলতেই তারা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে অস্ত্র নামিয়ে রাখল। ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে ঘুম থেকে তুলে এনে পাকড়াও করা হলো। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেন্টারে এলাম। লে. কর্নেল চৌধুরী এবং ক্যাপ্টেন রফিকের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। সিভিল টেলিফোন সার্ভিসের একজন অপারেটরকে টেলিফোনে পেলাম। তাকে বললাম, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে—এ সংবাদটি যেন সে চট্টগ্রামের ডিসি, কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি আর রাজনৈতিক নেতাদের জানিয়ে দেয়। কারণ টেলিফোনে আমি তাঁদের কাউকে পাচ্ছিলাম না। টেলিফোন অপারেটর আনন্দ প্রকাশ করল আমার কথায়। এবং গভীর রাতে সবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল সে।

সেই মুহূর্তটি ছিল জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ব্যাটালিয়নের সব অফিসার আর জোয়ানদের এক জায়গায় একত্র করে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলাম। বললাম, আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে নেমেছি। তারা এই ঘোষণাটির জন্যই উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে সঙ্গে সবাই উল্লাসধ্বনি করে সাড়া দিল। পর মুহূর্তেই সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। রাত তখন ২টা ১৫ মিনিট। ২৬শে মার্চ ১৯৭১। জাতির জন্যে অবিস্মরণীয় সেই মুহূর্তটি।

রাত ৪টায় রেল লাইন ধরে পটিয়ার পাহাড়ের দিকে আমরা যাত্রা করলাম। পথে ইপিআর-এর একশজন আমাদের সাথে যোগ দিল। দুপুরে পটিয়া পাহাড়ে পৌঁছে গেলাম। জাতির সেই প্রথম স্বাধীনতা যোদ্ধাদের পথে পথে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাল জনগণ। তারা খাবার নিয়ে আসল ক্ষুধার্ত সৈনিকদের জন্যে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘাঁটি হলো পটিয়ার পাহাড়। ২৬শে মার্চের মধ্যেই তিনশ সদস্যের একটি বাহিনীকে চট্টগ্রাম পাঠানো হলো হানাদারদের মোকাবিলার জন্যে। প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সেই প্রথম সম্মুখসমর। বহু দেশপ্রেমিক প্রাণ দিলেন দেশের মাটিকে মুক্ত করবার জন্যে। পাকিস্তানি শিবিরে তখন আতংক। তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো।

কালুরঘাটে চট্টগ্রাম রেডিওর কেন্দ্র। সেখানে একদল ছাত্র এবং বেতারশিল্পী দেশাত্মবোধক সংগীত পরিবেশন করছিলেন। দিনটি ছিল ২৭শে মার্চ। শহরের চারদিকে তখন বিক্ষিপ্ত লড়াই চলছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেডিও স্টেশনে এলাম। এক টুকরো কাগজ খুঁজছিলাম। হাতের কাছে একটি এক্সারসাইজ খাতা পাওয়া গেল। তার একটি পৃষ্ঠায় দ্রুতহাতে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার কথা লিখলাম। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বভার নিয়েছি, সে কথাও লেখা হলো সেই প্রথম ঘোষণায়। জনগণ এবং পুলিশ, আনসার, ইপিআর, ছাত্র, যুবক, সবাইকে জাতীয় প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্যে আহ্বান জানালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘোষণা বেতারে প্রচার করলাম। ২৮শে মার্চ সকাল থেকে পনেরো মিনিট পর পর ঘোষণাটি প্রচার করা হলো কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে। সেই ঘোষণা বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ল সারাদেশে। আর দলে দলে তরুণরা এসে যোগ দিতে লাগল স্বাধীনতাযুদ্ধে। ৩০শে মার্চ দ্বিতীয় ঘোষণাটি প্রচার করা হলো রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে।

আরও পড়ুন: চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার পাঠ্যবই, চূড়ান্ত অনুমোদন

এপ্রিলের প্রথম থেকে শুরু হয়ে গেল সারাদেশ জুড়ে ব্যাপক যুদ্ধ। জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এলো। অস্ত্রের নিদারূণ অভাব। প্রশিক্ষণ দেওয়া গেরিলারা হানাদারদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে আনতে লাগল। সে অস্ত্র দিয়ে চলছিল যুদ্ধ। এপ্রিলেই স্বাধীনতা যুদ্ধের হেড কোয়ার্টার সরিয়ে নেওয়া হলো রামগড়ে। এরপর বিজয়ের পর বিজয়। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই উত্তর-পূর্ব সেক্টরের গোটা রৌমারী থানা, চিলমারী, উলিপুর, দেওয়ানগঞ্জ হানাদারমুক্ত হলো।

২৮শে আগস্ট এই অঞ্চলে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক প্রশাসন চালু হলো। চালু হলো অফিস-আদালত কোর্ট-কাছারি। তার আগে ৬ই সেপ্টেম্বর পৌনে এক লাখ টাকার ট্যাক্স জমা হলো স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে। বেসামরিক শাসন চালু হওয়ার দিন রৌমারীতে বিশাল জনসমাবেশ হলো। এখানে স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে আজ রচিত হলো এক যুগান্তকারী অধ্যায়। মুক্তাঙ্গনের এই অভিযাত্রা থেকে অচিরেই গোটা বাংলাদেশের দাসত্বের নিগড়মুক্তি ঘটতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণের অনিরুদ্ধ জাতীয় চেতনাই স্বাধীনতাযুদ্ধের চালিকাশক্তি। এর প্রচন্ড স্রোতের মুখে খড়কুটার মতো ভেসে যাবে দখলদাররা। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে বৈদেশিক আধিপত্যের সব কুটিল যড়যন্ত্র। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

২০২৭ সালে ভরি প্রতি ৩ লাখ টাকা ছাড়াতে পারে স্বর্ণের দাম 
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
অফিসার নিয়োগ দেবে ওয়ার্ল্ড ভিশন, আবেদন ১ নভেম্বর পর্যন্ত
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
ডিসকলেজিয়েট ছাত্রের ফর্ম পূরণ, রাজি না হওয়ায় নিজ বিভাগের সভ…
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
ভারতীয় গোয়েন্দার সঙ্গে পরওয়ারের ‘গোপন বৈঠকের’ ভিডিও প্রকাশ …
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
বসার জায়গা চেয়েও পাননি, স্ট্রোক করে মেট্রোরেলেই নিভল বিশ্বব…
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সাধারণ-ইংরেজি মাধ্যম ও কারিগরি শিক্ষায় কোরআন-হাদিস শিক্ষা …
  • ২৭ অক্টোবর ২০২৬