নেপথ্যে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব!
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড © সংগৃহীত
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করতে কাজ করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ইতোমধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বেশ কিছু পাঠ্যবইয়ের ছাপার কাজ শুরু হয়েছে। এসব পাঠ্যবইয়ের কাগজের মান ও ছাপার মান যাচাই-বাছাইয়ে থার্ড পার্টি হিসেবে মাধ্যমিক বইয়ের কাজ পেয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি। তবে এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সঠিক যাচাই ছাড়াই কাগজ ছাড়ের বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে তদন্ত করে এনসিটিবি। পরে ল্যাব টেস্টে শর্তানুযায়ী কাগজ যাচাই করা হচ্ছে বলে জানান এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, মাধ্যমিকের পিডিআইয়ের ল্যাব টেস্ট নিয়ে যখন বিভিন্ন মাধ্যমে প্রশ্ন উঠছে, তখন আমরা বিসিএসআইআরের ল্যাবে কাগজ টেস্টের জন্য পাঠায়, এতে তার করা টেস্টগুলোতে কোনো ধরনের ত্রুটি পায়নি। এখন পর্যন্ত ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি সঠিকভাবে কাজ করছে। ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা হবে। যেহেতু এখন কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি, তাতে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নই উঠেই না।
তিনি আরও জানান, যেসব কাগজ নিয়ে অভিযোগ ছিল, সেসব কাগজ টেস্ট করলে কাগজের ব্রাইটনেস ৮৫(+-২) পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রাথমিকে জন্য জিএসএম ৮০(+-২) ও মাধ্যমিকে ৭০(+-২), ব্রাস্টিং ফেক্টর ১৮+ ও অপাসিটি ৮৫(+-২) পাওয়া গেছে। অতএব ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির ল্যাব টেস্ট নিয়ে আপাতত কোনো প্রশ্ন নেই।
জানা গেছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বইয়ের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) ও পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশনের (পিএলআই) জন্য দুটি করে প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পিডিআই তদারককারী প্রতিষ্ঠান দুটি হলো— ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন বিডি (প্রাথমিক) ও ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি (মাধ্যমিক)। ইনডিপেনডেন্ট মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ির বই ছাপা ও কাগজের মান যাচাইয়ের কাজ পেয়েছে।
এ ল্যাবটি শুধু পাঠ্যবইয়ের কাগজের জিএসএম (গ্রামস পার স্কয়ার মিটার), ব্রাস্টিং ফেক্টর (বিএফ) ও ব্রাইটনেস চেক করে থাকে। জানা গেছে, ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিস বিডির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসেন এবং তার সহোদর দুই ভাই বিপ্লব ও বদরুল। তাদের নামে ভিন্ন দুটি ল্যাব প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
এনসিবিরি কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বেশ কয়েক বছরের হিসাব কষলে দেখা যাবে, অধিকাংশ শিক্ষাবর্ষেই পাঠ্যবইয়ের পিডিআইয়ের (প্রি ডেলিভারি ইন্সপেকশন) বা কাগজের মান যাচাইয়ের কাজ পেয়েছেন এই তিন ভাই। ওই কর্মকর্তারা জানান, এই তিন ভাইয়ের মধ্যে যিনিই কাজ পান, বাকি দুজন মিলেই তা সম্পন্ন করে থাকে। কিন্তু বিপত্তি বাধে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে পিডিআইয়ের কাজ নিয়ে। শিক্ষাবর্ষটিতে কাজ পান শেখ বেলাল হোসেন। কিন্তু তিনি কাজটি অন্য ভাইদের সঙ্গে ভাগাভাগি না করায় কোন্দলে জড়ান তারা। এরই মধ্যে মেঝ ভাই গণমাধ্যমে কাগজের মান নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি আরও তীব্রতর হয়। যদিও এনসিটিবির একজন কর্মকর্তার দাবি, ‘বিপ্লবের যোগসাজস ও অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে কয়েকটি গণমাধ্যমে ওই সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর কোনো ভিত্তি নেই। এমন সংবাদে এনসিটিবি বিব্রতকর পরিস্থিতেতে পড়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।’
এনসিটিবি জানায়, মূলত গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ভিত্তিতেই সরকারি সংস্থাটি কাগজের মান যাচাই করতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পাঠায়। ১৪ সেপ্টেম্বর এনসিটিবিকে এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট পাঠায় বিসিএসআইআর; যে রিপোর্টে অভিযোগটির সত্যতা পায়নি বলে জানায় এনসিটিবি। ইনডিপেনডেন্টের করা টেস্টের কাগজগুলো যাচাইয়ে ৯টি প্রেস থেকে ৯টি কাগজ নিয়ে বিসিএসআইআর টেস্ট করা হয় বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পাঠ্যপুস্তকের মান যাচাইয়ের কাজের সঙ্গে আমি ২০১০ সাল থেকে সম্পৃক্ত। আমরা পাঁচ ভাই। আমি সবার বড়। আমার ছোট দুই ভাই বিপ্লব ও বদরুলকে সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এনসিটিবির বিভিন্ন কাজ করে আসছি। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমার ছোট ভাই বিপ্লবের প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির কাজ পেলেও আমার অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি আমাকে কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখত। এ বছর আমার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মাধ্যমে আমরা কাজ পেয়েছি। এমনকি ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের কাজেও আমি বিপ্লবকে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে থাকার জন্য বলেছিলাম। কিন্তু সে ওই পদে কাজ করতে রাজি হয়নি।
স্বাভাবিকভাবেই, পিডিআই প্রতিষ্ঠানকে পাঠ্যবইয়ের কাগজের মান পরীক্ষা করার পাশাপাশি ছাপাখানাগুলোতেও নিয়মিত মনিটরিংয়ের জন্য লোকবল নিয়োজিত রাখতে হয়। কারণ আমরা যে কাগজগুলো পরীক্ষা করে অনুমোদন দিই, সেগুলো দিয়েই পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রেসগুলোতে লোকবল রাখা প্রয়োজন।
শেখ বেলাল আরও বলেন, আমার ভাই নজরদারির দায়িত্ব চাইলেও তাকে আমি দেইনি। যদি কোনো কারণে এ সেক্টরে প্রশ্ন উঠে। এ আশঙ্কা থেকেই ছোট ভাইকে সেখানে রাখিনি। এতেই আমার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠানো হচ্ছে। যদিও এ অভিযোগের পর মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি আমার প্রতিষ্ঠানে থাকা ল্যাবগুলো টেস্ট করে গেছে। আশা করছি নতুন শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ের কাজ অনেকটা মানসম্পন্ন হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি পরিবারের সবার বড়। সবাইকে ছোট থেকে বড় করে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করেছি। কিন্তু ছোট্ট একটা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে আজ এমন একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হলো। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা সঠিকভাবে যাচাই করা হোক, অযথা অপবাদ না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’
জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপা হচ্ছে। এবার ১০১টি প্রেস ছাপার কাজ করছে। প্রতিটি প্রেসেই পিডিআই প্রতিষ্ঠানের একজন করে প্রতিনিধি নিয়োজিত রয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের সব উপজেলায় পাঠ্যবই পাঠানো হবে বলে এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে।