কলেজের ব্যবহারিক ক্লাস © এআই সৃষ্ট ছবি
শিক্ষার্থীদের উন্মুক্ত ও বিজ্ঞানমনস্ক করতে তত্ত্বীয় জ্ঞানের চেয়ে ব্যবহারিক শিক্ষার গুরুত্ব বেশি। কিন্তু দেশের উচ্চ মাধ্যমিক বা কলেজ শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহারিকের হালচাল সম্পূর্ণ বিপরীত। তত্ত্বীয় শিক্ষাকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় তার সিকি পরিমাণ গুরুত্বও পাচ্ছে না ব্যবহারিক শিক্ষা। কেবল খাতা লেখাতেই সীমাবদ্ধ কলেজের ব্যবহারিক শিক্ষা। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিখতে পারছে না। এ করুণ অবস্থার কারণ কলেজগুলোতে প্রদর্শক না থাকা। দীর্ঘদিন ধরে প্রদর্শক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক না শিখেই শেষ করছেন উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, সারা দেশে সরকারি কলেজের সংখ্যা ৭০৮টি। এসব কলেজের রসায়ন, পদার্থ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, কৃষি, জীববিজ্ঞান, গনিত, ভুগোল, মৃত্তিকাবিজ্ঞান এবং গার্হস্থ্য বিষয়ে ব্যবহারিক ক্লাস নেন প্রদর্শকরা। তবে অধিকাংশ কলেজেই প্রদর্শকের পদ ফাঁকা রয়েছে। ব্যবহারিক ক্লাস নিচ্ছেন প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক কিংবা সহযোগী অধ্যাপকরা। নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়ার কারণে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন পরিপূর্ণ ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের দাবি, কলেজগুলোতে ব্যবহারিক যথাযথভাবেই শেখানো হচ্ছে। সংকট নিরসনে প্রদর্শক নিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও দীর্ঘ ছয় বছর ধরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ৬১০টি পদের নিয়োগ কার্যক্রম ঝুলে রয়েছে।
দেশের ৯টি বিভাগের কলেজেই প্রদর্শক সংকট রয়েছে, তবে খুলনা, সিলেট এবং রাজশাহী অঞ্চলের কলেজগুলোতে প্রদর্শকের সংকট তীব্র। কলেজগুলোতে গড়ে চার থেকে পাঁচজন করে প্রদর্শক থাকার কথা থাকলেও রয়েছে এক অথবা দুইজন। ফলে আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণ ব্যবহারিক না শিখেই বসবেন পরীক্ষায়। খাতায় লিখে ভালো নম্বর পেলেও ব্যবহারিকে কম নম্বর পাওয়ার শঙ্কায় রয়েছন শিক্ষার্থীরা। এর ফলে তাদের সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ওটা (প্রদর্শকের ফল) আমরা দেখিনি। বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলব।’
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের ৯টি বিভাগের কলেজেই প্রদর্শক সংকট রয়েছে, তবে খুলনা, সিলেট এবং রাজশাহী অঞ্চলের কলেজগুলোতে প্রদর্শকের সংকট তীব্র। কলেজগুলোতে গড়ে চার থেকে পাঁচজন করে প্রদর্শক থাকার কথা থাকলেও রয়েছে এক অথবা দুইজন। ফলে আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণ ব্যবহারিক না শিখেই বসবেন পরীক্ষায়। খাতায় লিখে ভালো নম্বর পেলেও ব্যবহারিকে কম নম্বর পাওয়ার শঙ্কায় রয়েছন শিক্ষার্থীরা। এর ফলে তাদের সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কলেজগুলোতে প্রায় দুই হাজার প্রদর্শকের পদ ফাঁকা রয়েছে। সর্বশেষ কলেজে প্রদর্শক নিয়োগ হয়েছিল ২০১৭ সালে। তাদের ইতোমধ্যে পদোন্নতি হয়েছে। তবে পদায়ন হয়নি। পদায়ন হলে ৯৫ শতাংশ কলেজে একজন করে প্রদর্শকও থাকবে না বলে মত সংশ্লিষ্টদের। ফলে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত আটকে থাকা প্রদর্শক পদের ফল প্রকাশ করে সংকট নিরসের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সিলেট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রাবেয়া পারভীন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমাদের কলেজে কেবল বোটানিতে প্রদর্শক রয়েছে। পদার্থ এবং রসায়নে এই পদ ফাঁকা। দীর্ঘদিন প্রদর্শক না থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শেখাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কলেজের প্রভাষক এবং সহযোগি অধ্যাপকদের দিয়ে ব্যবহারিক করানো হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।’
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো: সামছুল ইসলাম বলেন, ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য প্রদর্শক পদটি খুবই জরুরি। প্রদর্শক না থাকায় অনেক কলেজে শিক্ষকদের দিয়ে ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়ানো হচ্ছে। অনেক কলেজে এমনিতেই শিক্ষক সংকট রয়েছে, তার ওপর যারা আছেন, তাদের দিয়ে ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়ায় দুই দিকেই সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া প্রদর্শক সংকটের কারণে বিজ্ঞান শিক্ষার মানও কমে যাচ্ছে। এ সংকট নিরসে সরকারের দ্রুত পদক্ষে নেওয়া দরকার।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রদর্শকটি পদের নিয়োগের বিষয়টি মাউশি মহাপরিচালক ভালো বলতে পারবেন। আপনি তার সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন।’
ছয় বছর ধরে ঝুলে আছে প্রদর্শক নিয়োগ
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ২০২০ সালের প্রদর্শক পদের নিয়োগ গত ছয় বছরেও পূর্ণাঙ্গ আলোর মুখ দেখেনি। মাউশির এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ২৮টি ক্যাটাগরির মধ্যে অধিকাংশ পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া ২০২৩ সালে শেষ হলেও প্রদর্শক, গবেষণা সহকারী, সহকারী গ্রন্থাগারিক কাম- ক্যাটালগার এবং ল্যাবরেটরি সহকারীর ফলাফল আটকে দেয় কর্তৃপক্ষ। ২০২৪ সালের জুনে মৌখিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও ফলাফল প্রকাশে গড়িমসি শুরু হলে চাকরিপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন।
প্রার্থীরা জানান, কোটা-সংক্রান্ত জটিলতা নিষ্পত্তি এবং গত বছরের এপ্রিলে বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির (ডিপিসি) সভা হওয়ার পরও যখন চূড়ান্ত ফল আসেনি, তখন তারা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কোনো প্রশাসনিক সুরাহা না পেয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে ১০ জন প্রার্থীর একটি প্রতিনিধিদল হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মাউশিকে বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় দিতে হবে ফি, কোন ক্লাসে কত—জানালেন সচিব
আদালতের নির্দেশনার জবাবে গত ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মাউশি এক চিঠিতে প্রার্থীদের জানায়, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ থাকায় বর্তমানে দুদকের তদন্ত কার্যক্রম চলছে। দুদকের এই তদন্ত চলায় মাউশি ফলাফল প্রকাশে আইনগতভাবে অপারগতা প্রকাশ করে। মূলত নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার কারণেই বিষয়টি দুদক পর্যন্ত গড়ায়। তবে প্রার্থীরা বলছেন, হাতে গোনা কয়েকজনের অনিয়মের জন্য হাজার হাজার সাধারণ প্রার্থীর ক্যারিয়ার নষ্ট করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক আদেশে দুদককে ৯০ দিনের সময় বেঁধে দেন তদন্ত প্রতিবেদন মাউশিতে দাখিল করার জন্য। গত ২৮ ডিসেম্বর দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আদেশের কপি গ্রহণ করে। তবে নিয়মিত মহাপরিচালক না থাকায় তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি দুদক বলে জানা গেছে।
লিটন নামে এক ফল প্রত্যাশী বলেন, ‘প্রদর্শক পদের ফলপ্রত্যাশীরা নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে কিনা সেটি জানতে দুদকে আবেদন করেছিল। দুদক আমাদের লিখিত দিয়ে জানিয়েছে, দুর্নীতির কোনো আলামত জমা পড়েনি। বিষয়টি থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মাউশি ইচ্ছা করলেই ফল প্রকাশ করতে পারে। তবে তারা ফল প্রকাশে গড়িমসি করছে।’
জাকারিয়া নামে আরেক ফল প্রত্যাশী বলেন, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে যেন আর কোনো যোগ্য প্রার্থীর স্বপ্ন শেষ না হয়। অনিয়ম যারা করেছেন, তাদের শনাক্ত করা হোক; কিন্তু পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া যেন আর একদিনও আটকে না থাকে। দ্রুত ফল প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘প্রদর্শক পদের ফলাফল নিয়ে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। আদালতে মামলা এবং দুদকে তদন্ত চলছে। বিষয়গুলো সমাধান হওয়ার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।’