এনসিটিবি © ফাইল ছবি
শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যের বই ছাপানো, শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নসহ নানা কাজের দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। প্রতিষ্ঠানটিতে পাহাড়সম অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের অডিট প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনসিটিবিতে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৫টি খাত বিশ্লেষণ করে এসব অনিয়ম পেয়েছে অডিট অধিদপ্তর।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এনসিটিবিতে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে হওয়া টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদের পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বই ছাপা কাজের অনেক লটে একমাত্র দরদাতাও পেয়েছেন কাজ। চাহিদা না থাকলেও ৫১৬ কোটি টাকার বই ছাপিয়েছে সংস্থাটি। শুধু তাই নয়, কাগজের মান যাচাই না করেই ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি বই শিক্ষার্থীদের দিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিটিবি সচিব প্রফেসর শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রতিবেদনটি পাইনি। প্রতিবেদন পেলে সংশ্লিষ্ট শাখায় সেটি পাঠানো হবে। এরপর বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে পারব।’
পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহের কাজে মাত্র ১ জন দরদাতা অংশগ্রহণ করা সত্ত্বেও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধি অনুযায়ী দরপত্র বাতিল না করে কার্যাদেশ দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে এনসিটিবি। এর ফলে সরকারের ৬১ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহ কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। বইয়ের মান নিশ্চিত না করেই ব্যয় দেখানো, চাহিদার অতিরিক্ত বই মুদ্রণ, দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে উচ্চ দরদাতাদের কার্যাদেশ প্রদান, উন্মুক্ত দরপত্র এড়িয়ে সরাসরি ক্রয় এবং অতিরিক্ত দরে কার্যাদেশ দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উৎসাহ উদ্দীপনা ভাতা বাবদ ১ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৯৭ টাকা দেওয়া হয়েছে। এই টাকা আদায় করে বোর্ডে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়; বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো ধরনের প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত হারে প্রশিক্ষণ এবং কর্মশালা বাবদ সম্মানি প্রদান করা হয়েছে। এতে বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩ টাকা।
অডিট অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত কাজের জন্য সম্মানি হিসেবে ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৫০ টাকা দেওয়া হয়েছে। যার পুরোটাই সরকারের আর্থিক ক্ষতি বলে অবহিত করা হয়েছে।
পাঠ্যপুস্তকের মান যাচাই করার জন্য আলাদা ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠান রয়েছে এনসিটিবি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বছরে ৫৭ লাখ টাকা চুক্তিতে নেওয়া ইন্সপেকশন এজেন্ট থাকলেও প্রেসের কাজ দেখাশোনার জন্য বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রেস মনিটরিংয়ের নামে অতিরিক্ত বিল গ্রহণ করেছেন। এতে বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ১০০ টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরপত্র সংক্রান্ত কমিটির সদস্যদের প্রাপ্যতা বহির্ভূতভাবে সম্মানি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বোর্ডের ৩৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। লেখক ও স্বত্বাধিকারীদের রয়্যালটি বিল হতে নির্ধারিত হারে ভ্যাট আদায় করেনি এনসিটিবি। এর ফলে সরকারের ১২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৬ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
অডিট অধিদপ্তর জানিয়েছে, রয়্যালটি বিল হতে নির্ধারিত হারে আয়কর কর্তন না করায় সরকারের ৯ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার ৩৬৫ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এনসিটিবি যাদের সম্মানী দিয়েছে, তাদের বিল হতে আয়কর কর্তন না করারয় সরকারের ২৪ লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বোর্ডের ইনসিটু আওতাধীন সেসিপ (SESIP) প্রকল্পের কর্মকর্তাদের সম্মানী ভাতা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বোর্ডের ২১ লাখ ৪০ হাজার ৯১৭ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
যে কোনো টেন্ডারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সেটি মানেনি এনসিটিবি। বই মুদ্রণে ১ম সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ না দিয়ে ২য় থেকে ১১তম স্থানাধিকারী দরদাতাদের কার্যাদেশ দিয়েছে সংস্থাটি। এর ফলে সরকারের ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৩ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে অডিট অধিদপ্তর।
অডিট অধিদপ্তর জানিয়েছে, এনসিটিবির নিজস্ব রুটিনভুক্ত কাজের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিকভাবে টাকা দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বোর্ডের ৩২ লাখ ৬২ হাজার ৯৭০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময় দেওয়া অগ্রিম অর্থ সমন্বয় করেনি এনসিটিবি। এর ফলে ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৬০ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, কোনো ধরনের নিয়মনীতি বা বিধির তোয়াক্কা না করে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ৫ কোটি ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৪০ টাকা অগ্রিম উত্তোলন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ৭ লাখ কিংবা তার চেয়েছে টাকা উত্তোলন করতে হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। তবে অনুমতি ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৭ লাখ থেকে শুরু করে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের মাঠ পর্যায়ের চাহিদার অতিরিক্ত পাঠ্যবই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত কার্যাদেশ প্রদান করায় বোর্ডের ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। শুধু তাই নয়; পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহ কাজে প্রাক্কলিত ব্যয় অপেক্ষা অতিরিক্ত ও চড়া দরে কার্যাদেশ দিয়েছে এনসিটিবি। এর ফলে সরকারের ২১৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৪ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
অডিট অধিদপ্তর জানিয়েছে, জেলা বা উপজেলা থেকে বিদ্যালয় পর্যায়ে বই পৌঁছানোর কথা বলে তার আড়ালে বিদেশে বই পাঠানো হয়েছে। এক্ষেত্রে পরিবহন বাবদ ৪২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৩২ টাকা আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে।
প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ছাপানো বইয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব এনসিটিবির। এ মান নিশ্চিত করতে এনসিটিবির নিয়োগকৃত ইন্সপেকশন এজেন্ট, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) ল্যাবে বইয়ের কাগজের মান পরীক্ষার কথা ছিল। তবে সে কাজ না করেই ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বই মুদ্রণ ও বাঁধাই করে সেগুলো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে গেছে। এ অর্থ অনিয়মিতভাবে ব্যয় করা হয়েছে বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যে কোনো টেন্ডারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সেটি মানেনি এনসিটিবি। বই মুদ্রণে ১ম সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ না দিয়ে ২য় থেকে ১১তম স্থানাধিকারী দরদাতাদের কার্যাদেশ দিয়েছে সংস্থাটি। এর ফলে সরকারের ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৩ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে অডিট অধিদপ্তর।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহের কাজে মাত্র ১ জন দরদাতা অংশগ্রহণ করা সত্ত্বেও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধি অনুযায়ী দরপত্র বাতিল না করে কার্যাদেশ দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে এনসিটিবি। এর ফলে সরকারের ৬১ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
টেন্ডারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা থাকলেও তা পরিহার করে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহ করেছে এনসিটিবি। এর ফলে ৮৯ কোটি ৫৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৯৭ টাকা অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে অডিট অধিদপ্তর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনসিটিবির নিজস্ব তহবিল হতে পিইডিপি-৪ প্রোগ্রামের কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ ধার দেওয়ায় বোর্ডের ৩ কোটি ৬৭ লাখ ৯ হাজার ২৭০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। শুধু তাই নয়; উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ি ব্যক্তিগত বা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করে জ্বালানি সরবরাহ করায় বোর্ডের ৭ লাখ ২১ হাজার ৩০১ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ টাকা আদায় করে বোর্ডের তহবিলে জমা দিতে সুপারিশ করা হয়েছে।
অডিট অধিদপ্তর জানিয়েছে, বোর্ডের নিজস্ব গাড়ি অনিয়মিতভাবে মন্ত্রণালয়ে ব্যবহার করা এবং বোর্ড কর্তৃক তার জ্বালানি বাবদ ব্যয় বহন করায় ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৪১৮ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সরাসরি গবেষণা কর্মকর্তা নিয়োগের বিধান থাকলেও তা না করে, প্রবিধানমালা লঙ্ঘনপূর্বক প্রেষণে গবেষণা কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে এনসিটিবি। এর ফলে বোর্ডের ১ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার ২৫৮ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমাপ্ত হওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের যানবাহন সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের অধীন কেন্দ্রীয় পুলে নির্দিষ্ট সময়ে জমা না দেওয়ায় বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়েছে। এছাড়া নির্ধারিত সিলিং বা আর্থিক সীমা লঙ্ঘন করে গাড়ি মেরামত বাবদ অতিরিক্ত ব্যয় করায় প্রতিষ্ঠানের ২ লাখ ৮১ হাজার ৩২০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বিগত সময়ে এনসিটিবিতে হওয়া অনিয়মের বিষয়ে মন্তব্য জানতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন সিরিভ করেননি।