প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে কাগজ-কলমের পরিবর্তে এবার চালু হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি ই-মনিটরিং সিস্টেম। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজমিনে গিয়ে ক্লাসে পাঠদান, শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, স্কুলের কর্মপরিকল্পনা, সহপাঠ কার্যক্রমসহ ১৭টি দিক পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন। তারপর স্কুলে বসেই প্রতিবেদন ফরম পূরণ করতে হবে অনলাইনে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের সহায়তায় সনাতনী পদ্ধতিতে বিদ্যালয় পরিদর্শনের পরিবর্তে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে চালনো পাইলট প্রকল্প সফল হয়েছে। ফলে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এ পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন করা হবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ই-মনিটরিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে সারাদেশে কাগজবিহীন স্কুল পরিদর্শন ব্যবস্থা ই-মনিটরিং বাস্তবায়নে ৩৭২০ টি ট্যাবলেট কিনেছে অধিদপ্তর। ই-মনিটরিং কাজে ব্যবহারের জন্য আক্টোবর-নভেম্বর মাসে দেশব্যাপী মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে তা বিতরণ করা হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে সারাদেশে ই-মনিটরিং কার্যক্রম সম্প্রসারিত ও বাধ্যতামূলক করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন এ ডিজিটাল পরিদর্শন ও তদারকি ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে- সরেজমিনে স্কুল পরিদর্শন কার্যক্রমকে আরও সহজ এবং স্বচ্ছ করা। এর অধীনে ক্লাস কার্যক্রম তদারকি, শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীর বাড়ি-ভিজিটসহ অন্যান্য দিক উঠে আসবে। প্রত্যেক সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (এইউইও) তার দায়িত্বে থাকা স্কুলগুলোতে গিয়ে ১৭টি মূল দিকসহ অন্যান্য দিক দেখবেন। এরপর স্কুলে বসেই ৫ পৃষ্ঠার একটি তথ্য ফরম পূরণ করবেন অনলাইনে। তিনি তা ডিপিই’র কেন্দ্রীয় সার্ভারে আপলোড করবেন। সঙ্গে সঙ্গে তা ডিপিই’র ওয়েবসাইটেও চলে আসবে।
এইউইওরা যে ১৭টি দিক দেখবেন তা হচ্ছে- কর্মরত ও অনুপস্থিত শিক্ষক, ছুটির ধরন, শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীর বাড়ি-ভিজিট, শ্রেণী কার্যক্রম বা পাঠদান কেমন (৫টি দিক), ক্লাসে শিক্ষার্থীকে বোর্ডে অনুশীলন করানো হয় কিনা, পাঠদানে মানোন্নয়নে পরামর্শ। আরও আছে বার্ষিক সার্বিক পরিকল্পনা (৫টি), বিদ্যালয় কার্যক্রম কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রগতি (৮টি দিক), ব্যবস্থাপনা কমিটি (৮টি দিক), সমাপনী পরীক্ষা, বিদ্যালয়ে সহপাঠ কার্যক্রম (শারীরিক কসরত, ক্রীড়া, সাহিত্য-সংস্কৃতি, চারু ও কারুকলা ইত্যাদি), অভিভাবক সমাবেশ, স্কুলের পারিপার্শ্বিক দিক (৯টি), শিক্ষার্থীর ইউনিফর্ম সংক্রান্ত তথ্য, বিদ্যালয়ের উন্নয়নমূলক কাজের মান ও আগের পরিদর্শনকারীর পরামর্শ। বিদ্যালয়ের তথ্য, পরিদর্শনকারীর তথ্য এবং পরিদর্শনকারীর মতে প্রধান শিক্ষকের যোগ্যতাসহ সার্বিক মন্তব্য ও সুপারিশও থাকছে এই ডিজিটাল পরিদর্শন ব্যবস্থায়।
সেভ দ্যা চিলড্রেনের আইসিটি ইন এডুকেশন বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার রুকসানা হোসেন জানান, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা যে তথ্য ছক ব্যবহার করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যবেক্ষণ করেন তার উপর ভিত্তি করেই অ্যান্ড্রয়েড ভিত্তিক ই-মনিটরিং সিস্টেম চালু করেছে সেভ দ্যা চিলড্রেনের আইসিটি টিম। স্কুল পর্যবেক্ষণের সারসংক্ষেপ এবং পর্যবেক্ষণের গুণগত ও পরিমানগত তথ্য ওয়েবভিত্তিক ড্যাশবোর্ডে আপলোড করা হবে। ই-মনিটরিং সিস্টেমে মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারা স্মার্টফোন বা ট্যাব ব্যবহার করে বিদ্যালয় পর্যবেক্ষণের তাৎক্ষনিক তথ্য (রিয়েল টাইম ডাটা) সংগ্রহ করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, সার্ভারে তথ্য আপলোড করার সাথে সাথে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন বিভাগ তা পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবে। ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম থেকে শিক্ষা কর্মকর্তারা দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহের সুযোগ পাবেন।
মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তারা জানান, এই কার্যক্রমটি তাদের সময় ও পেপার ওয়ার্ক কমিয়েছে। এই সিস্টেমে শিক্ষার নীতি নির্ধারকরা আরো সহজে অগ্রাধিকার সনাক্ত করতে পারবেন। শিক্ষা বিভাগের কর্মক্ষমতা, নিরীক্ষণ এবং কার্যকরভাবে কোন নির্দিষ্ট কাজের ফলাফল মূল্যায়ণে সাহায্য করবে ই-মনিটরিং।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে গাজীপুর ও মানিকগঞ্জের ৫টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ই-মনিটরিং সিস্টেম চালু হয়। এরপর ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আরো ৮০টি উপজেলায় ই-মনিটরিং ছড়িয়ে দেয়া হয়। মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য ৬৪ জেলা থেকে তৈরি করা হয়েছে মাস্টার ট্রেইনার। এছাড়া ২০১৭ সালের আক্টোবরে ঢাকা মেট্রোপলিটনের ১২টি থানার শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ঘোষণার মাধ্যমে ২০১৮ সালের মে মাসে এসব থানা পেপারলেস মনিটরিং এলাকায় পরিণত হয়।