ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি: রূপান্তরের এই মুহূর্তে আমাদের দূরদৃষ্টি কতটা প্রস্তুত?

০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৯ PM
ড. জি. এম. রাবিউল ইসলাম

ড. জি. এম. রাবিউল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকে আমি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করি। ২০১৭ সালে রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছিল একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে—শিক্ষার মানোন্নয়ন, সেশনজট নিরসন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রায় এক দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে, কাঠামোগত অসামঞ্জস্য ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ একটি ভালো উদ্দেশ্যকেও জটিল বাস্তবতায় পরিণত করতে পারে। দেড় লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী, সীমিত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সমন্বয়ের ঘাটতি—এসব মিলিয়ে ফল প্রকাশে বিলম্ব ও একাডেমিক অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে। আন্দোলন, মানববন্ধন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—উচ্চশিক্ষা কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়; এটি সময়নিষ্ঠ, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ অনুমোদন একটি কাঠামোগত স্বীকৃতি—যে আগের ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা প্রশাসন, কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা, সমন্বিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার—এসবের মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আশা করা হচ্ছে। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু প্রশাসনিক কাঠামো নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির রূপান্তরই আসল চ্যালেঞ্জ।

বিশ্ব অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা তুলে ধরে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন একটি ফেডারেল মডেলে পরিচালিত, যেখানে বহু কলেজ নিজেদের ঐতিহ্য ও একাডেমিক স্বাধীনতা বজায় রেখে কেন্দ্রীয়ভাবে মান নিয়ন্ত্রণে অংশ নেয়। এই কাঠামোর সাফল্যের মূল কারণ হলো পরিষ্কার দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহিতা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সিস্টেমে প্রতিটি ক্যাম্পাসের স্বায়ত্তশাসন থাকলেও বাজেট ও নীতিগত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় বোর্ড দ্বারা সমন্বিত হয়। ফলে বহুক্যাম্পাস হওয়া সত্ত্বেও মান বজায় থাকে। ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় বহু কলেজ নিয়ে পরিচালিত হলেও কেন্দ্রীয় পরীক্ষা ও নির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এই উদাহরণগুলো আমাদের শেখায়—বহুকলেজ কাঠামো সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই, যখন সমন্বয় দুর্বল এবং প্রযুক্তিগত ভিত্তি অনিশ্চিত।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি হবে সাফল্যের প্রধান ভিত্তি। ভর্তি থেকে ফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ যদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সমন্বিত না হয়, তবে সেশনজট ফিরে আসতে পারে। এস্তোনিয়া ও ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পূর্ণ অনলাইন একাডেমিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি ট্র্যাক করে এবং নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ নিশ্চিত করে। আমাদেরও সেই মানসিকতা গ্রহণ করতে হবে—প্রযুক্তি বিলাসিতা নয়, এটি প্রশাসনিক অপরিহার্যতা।

শিক্ষক সমাজের আস্থা অর্জন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সাত কলেজের অধিকাংশ শিক্ষক বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ফলে তাঁদের চাকরির ধরন, পদোন্নতি কাঠামো, বেতন-ভাতা ও পেনশন সুবিধা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এটি নিশ্চিত করতে হবে স্পষ্ট আইনি গ্যারান্টির মাধ্যমে। একটি রূপান্তরকালীন ট্রানজিশন নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি, যেখানে শিক্ষকরা চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোতে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন অথবা নির্দিষ্ট শর্তে ক্যাডার কাঠামো বজায় রাখতে পারবেন। অনিশ্চয়তা দূর না হলে একাডেমিক স্থিতিশীলতা আসবে না।

জার্মানির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণাভিত্তিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের স্বাধীনতা ও তহবিল নিশ্চিত করেছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও গবেষণা বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত উন্নতি করেছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিও যদি গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের স্বচ্ছ পদ্ধতি গ্রহণ করে, তবে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে থাকবে না; এটি জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্র হতে পারবে।

এখানে ঐতিহ্যের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা কলেজ ও ইডেন কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান শতবর্ষের ইতিহাস বহন করে। ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের মডেলে যেমন কলেজগুলোর স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে, তেমনি ডিসিইউকেও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। রূপান্তর মানে অতীতকে মুছে ফেলা নয়; বরং বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে সেই ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করা।

আমাদের আরেকটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—উচ্চশিক্ষা কেবল স্নাতক ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা নয়; এটি একটি গবেষণা-নির্ভর, উদ্ভাবনমুখী এবং সামাজিক দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান। শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম—এসব ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিল্প-গবেষণা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আমাদেরও সেই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে।

সবশেষে, এই রূপান্তর একটি নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন। দেড় লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী তাদের সময়, পরিশ্রম ও স্বপ্ন নিয়ে এই কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ নিশ্চিত করা, স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একাডেমিক পরিবেশ সৃষ্টি করা—এই তিনটি শর্ত পূরণ না হলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ও পুরানো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এখন একটি সম্ভাবনার প্রতীক। বিশ্ব আমাদের দেখিয়েছে—সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের মাধ্যমে বহুক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয় সফল হতে পারে। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে প্রস্তুত? যদি প্রস্তুত থাকি, তবে এই রূপান্তর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে। আর যদি ব্যর্থ হই, তবে এটি কেবল একটি নাম পরিবর্তনের ইতিহাস হয়ে থাকবে।

পরিবর্তনের এই মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন দূরদর্শিতা, সংলাপ এবং একাডেমিক সততা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই এই রূপান্তরকে সফল করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস মেসির
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
মেসি-আর্জেন্টিনার সামনে নতুন ইতিহাসের হাতছানি
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
ইংল্যান্ডকে বিদায় করে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
মার্তিনেজের গোলে এগিয়ে আর্জেন্টিনা
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
ফার্নান্দেজের দুর্দান্ত গোলে সমতায় আর্জেন্টিনা
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস মেসির
  • ১৬ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence