এলডিসি থেকে উত্তরণে আরও ৩ বছর সময় পেল বাংলাদেশ

৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৫ AM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিতে আরও তিন বছর সময়ে পেয়েছে বাংলাদেশ। ফলে চলতি বছরের নভেম্বরে পূর্বনির্ধারিত এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চাপ থেকে আপাতত মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে এই উত্তরণ ঘটবে। ফলে এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা, ভর্তুকি, নগদ সহায়তা এবং নমনীয় শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়ার সুযোগসহ বিভিন্ন সুবিধা আরও তিন বছর বহাল থাকবে।

অর্থনীতিতে নানা ধরনের চাপের মধ্যে এই বাড়তি সময়কে নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এ সময়কে কাজে লাগিয়ে রাজস্ব ও আর্থিক খাত, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর মতো প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। ছয়-সাত মাস ধরে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ ও নেপালের জন্য বাড়তি সময়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেয় জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্লেনারি মিটিংয়ে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান। ইউএনওয়েব টিভি বৈঠকটি সরাসরি সম্প্রচার করে। বৈঠকের শুরুতে জি-৭৭-এর পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

প্রস্তাবে বলা হয়, করোনা মহামারি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক সংঘাত ও বৈশ্বিক অভিঘাতের কারণে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া কোনো দেশের প্রতিনিধি এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেননি।

ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বক্তব্য দেন। তবে তাঁদের সবাই বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও নেপালের জন্য সময় বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। এ ছাড়া ২০২৭ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশ কী ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তার অগ্রগতি নিয়ে মধ্যবর্তী মূল্যায়ন করবে জাতিসংঘ।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি সরকার ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির খবর। এ বছর এলডিসি উত্তরণ হয়ে গেলে শুধু শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা ছাড়া অন্য সব সুবিধা উঠে যেত। এই তিন বছরকে কাজে লাগাতে হবে। ভালো ছাত্ররা যেমন সারা বছর পড়াশোনা করে, তেমনি প্রস্তুতি হিসেবে আগামী তিন বছরজুড়েই প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করতে হবে। তিন বছর সময় দিয়েছে বলে এক বছর বসে থাকলে চলবে না।’

ফজলুল হক আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি যেন শুধু পোশাক খাতকেন্দ্রিক না হয়। ইদানীং ওষুধশিল্প নিয়ে কিছু আলোচনা হচ্ছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়েও ভাবতে হবে। এসব নিয়ে নভেম্বর মাস থেকেই কাজ শুরু করবে এফবিসিসিআই।


এখন এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ত। কারণ, উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা হারানোর আশঙ্কা ছিল। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক এ সুবিধার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা উঠে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ বা বছরে প্রায় ৬৩৮ কোটি ডলার কমতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) হিসাবের ভিত্তিতে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।

এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাওয়ার কথা। উত্তরণের পরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মতো বড় বাজারে আরও তিন বছর পর্যন্ত এ সুবিধা পাওয়া যাবে।

এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা ছিল ওষুধশিল্পেরও। উত্তরণের পর ওষুধশিল্পের ওপর মেধাস্বত্বসংক্রান্ত বিধিবিধান আরও কঠোর হওয়ার কথা। তবে সময় বাড়ায় আপাতত আরও তিন বছর স্বস্তি পাওয়া গেল। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশের কিছু ওষুধ উৎপাদনে এ সময় মেধাস্বত্বের বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে না। মূল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পেটেন্ট লাইসেন্সও নিতে হবে না। এতে উৎপাদন খরচ কম রাখা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত প্রায় ২০ শতাংশ ওষুধ এ সুবিধা পায়।

এলডিসিভুক্ত দেশগুলো নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বা সেবায় নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে কৃষি ও শিল্প খাতের বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় ভর্তুকি দিয়ে থাকে। এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ায় এসব ভর্তুকি ও নগদ সহায়তা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।

এ ছাড়া এলডিসি হিসেবে নমনীয় শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়ার সুযোগও বহাল থাকবে। উত্তরণের পর বৈশ্বিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশের শিক্ষার্থীদের যেসব বৃত্তি দিয়ে থাকে, উত্তরণের পর সেসব বৃত্তির সংখ্যাও কমে যেতে পারে।


গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার যখন এলডিসি উত্তরণ পেছানোর আবেদন করে, তখন জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) বাংলাদেশ নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে। এটি সংকট মূল্যায়ন প্রতিবেদন হিসেবে পরিচিত। এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কোন দেশ উত্তরণের যোগ্য, তা মূল্যায়নের দায়িত্ব সিডিপির।

বাংলাদেশ নিয়ে তৈরি সিডিপির সংকট মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় এর প্রভাব, বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা বাংলাদেশের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক খাত স্থিতিশীল করা, কর রাজস্ব বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দ্রুত করা এবং অর্থনীতির টেকসই রূপান্তরে ভূমিকা রাখে—এমন ব্যয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এ বছরই এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে অনড় অবস্থান নিয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘের কাছে অনুরোধ করে। সেই অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গত ২১ জুলাই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছিল ইকোসক।

জাতিসংঘের কাছে পাঠানো চিঠিতে সরকারের যুক্তি ছিল, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কার সংহত করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, এলডিসি উত্তরণের জন্য আগের পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকালে একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে প্রস্তুতি গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে।

বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে ছিল করোনা মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা।

অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে ছিল আর্থিক খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন সমস্যার সমাধান না হওয়া।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বিভিন্ন সুযোগ পেয়ে আসছে দেশটি। জাতিসংঘ সদস্যদেশগুলোকে উন্নত ও উন্নয়নশীল—এই দুই ভাগে ভাগ করে। এলডিসিভুক্ত দেশগুলোও উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভুক্ত। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা এবং অন্য দেশের সহায়তা প্রয়োজন—এমন দেশগুলোকে এলডিসি তালিকায় রাখা হয়। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে পূর্ণাঙ্গভাবে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাবে।

প্রতি তিন বছর অন্তর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে কোনো দেশ উত্তরণের যোগ্য কি না, তা নির্ধারণ করা হয়। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয় অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। সময়ের সঙ্গে এসব মানদণ্ড পরিবর্তিত হয়।

বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। সূচকগুলো হলো মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। পরে সেটার মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়।

এবারও কমতে পারে এইচএসসির পাসের হার ও জিপিএ-৫?
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
জিপিএ-৫ দুই লাখ ছুঁই ছুঁই ২০২১ সালে, ২৫-এ নামে ধস—জেনে নিন …
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
এইচএসসিতে ২০২০ সালে শতভাগ অটোপাস, ২৫-এ ৪৩ শতাংশই ফেল—১০ বছর…
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
আলিম পরীক্ষার্থীরা ফল দেখবেন যেভাবে
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
মধুমতি ব্যাংকে জনবল নিয়োগ, আবেদন অনলাইনে
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬
এলডিসি থেকে উত্তরণে আরও ৩ বছর সময় পেল বাংলাদেশ
  • ৩১ অক্টোবর ২০২৬